মত-বিশ্লেষণ

কভিডকালে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার উদ্বেগজনক

মো. জিল্লুর রহমান: বাংলাদেশে প্রথম কভিড রোগী শনাক্ত হয় গত বছর ৮ মার্চ। এরপর ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কয়েক ধাপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়ানো হয়েছে। চলতি বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার উদ্যোগ নিলেও করোনাভাইরাসের তৃতীয় ঢেউয়ের কারণে তাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা নানাভাবে বিঘিœত হচ্ছে। সম্প্রতি একটি বেসরকারি গবেষণায় দেখা গেছে, করোনা ভাইরাসজনিত বন্ধে প্রাথমিকের ১৯ শতাংশ এবং মাধ্যমিকের ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী শিখতে না পারার বা শিক্ষণ ঘাটতির ঝুঁকিতে আছে। এমন অবস্থায় শিক্ষার এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তাগিদ দিচ্ছেন শিক্ষাবিদেরা। তাদের অনেকে যেসব এলাকায় সংক্রমণ নেই বা কম, সেসব এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ারও সুপারিশ করেছেন।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা অনেক শিক্ষার্থীকে ক্লাসে আগের মতো আর হয়তো দেখা যাবে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগের বছরগুলোর চেয়ে এবার ঝরে পড়ার হার নিশ্চিতভাবেই বাড়বে। কারণ কোমলমতি শিশুরা যদি একবার স্কুল ত্যাগ করে পেটের দায়ে শিশুশ্রমে যুক্ত হয়, তবে তাদের স্কুলগামী করা বিরাট চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। শিক্ষার্থীদের যারা কভিডকালে কাজে যুক্ত হয়েছে, তাদের অনেকেই হয়তো আর কোনোদিন স্কুলে ফিরবে না। আবার অনেকে স্কুলে ভর্তি হলেও ক্লাসে অনুপস্থিতির হারও বাড়বে। লাখ লাখ শিশুর পড়াশোনার ক্ষতি বিবেচনা করে সম্প্রতি ইউনিসেফ ও ইউনেস্কো সরকারের কাছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলছে, এখন পর্যন্ত বিশ্বের ১৯টি দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে। এর ফলে ১৫ কোটি ৬০ লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটা দীর্ঘদিন চলতে পারে না। বন্ধের ক্ষেত্রে স্কুলগুলো সবার শেষে এবং আবার খোলার ক্ষেত্রে সবার আগে থাকা উচিত। স্কুলগুলো আবার চালুর ক্ষেত্রে সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর টিকা দেয়ার জন্য অপেক্ষা করা যায় না। স্কুল খোলার জন্য করোনা শূন্যের কোঠায় যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা যায় না।

এক তথ্যে জানা যায়, ২০১৯ সালে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৭  দশমিক ৯ শতাংশ আর মাধ্যমিকে এই হার ছিল ৩৭  দশমিক ৬২ শতাংশ। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনুমান করছেন ২০২১ সালে এই ঝরে পড়ার হার অনেক বাড়বে। তারা বলছেন, ঝরে পড়ার পেছনে অন্যতম কারণ দারিদ্র্য ও বাল্যবিয়ে। বিশেষ করে শহরের বস্তিবাসী এবং চর ও হাওর অঞ্চলের শিশুরাই বেশি ঝরে পড়ে। করোনার কারণে এসব পরিবারে দারিদ্র্য আগের চেয়ে বেড়েছে। তারা অভাব ও পেটের দায়ে নানা কাজে যুক্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশে কভিড মহামারি শুরু হওয়ার আগে ২০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত। কিন্তু করোনার কারণে আরও ২০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে বলে বিভিন্ন জরিপের তথ্য বলছে। সম্প্রতি পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির প্রভাবে শহরের নি¤œ আয়ের মানুষের আয় কমেছে ৮২ শতাংশ। আর গ্রামাঞ্চলের নি¤œ আয়ের মানুষের আয় ৭৯ শতাংশ কমেছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা কোনো রকমে তিন বেলা খেতে পারলেও পুষ্টিমান রক্ষা করতে পারছেন না।

২০২১-২২ সালের প্রস্তাবিত বাজেটের তথ্য অনুসারে, গত ১৫ বছরে দারিদ্র্যের হার কমে অর্ধেক হয়েছে। ২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ৪১ দশমিক পাঁচ শতাংশ হলেও বর্তমানে এ হার ২০ দশমিক পাঁচ শতাংশে নেমে এসেছে। কিন্তু বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ২০২০ সালের মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দারিদ্র্যের ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করে, অর্থাৎ কভিড মহামারির আগের অবস্থার সঙ্গে পরের অবস্থা তুলনা করা হয়েছে। সানেম বলছে, করোনার প্রভাবে ২০২০ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক তিন শতাংশ। শহরাঞ্চলে সার্বিক দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে ছিল ১৬ দশমিক তিন শতাংশ আর করোনার সময়ে ২০২০ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক চার শতাংশ। এ নতুন দারিদ্র্যের হার নিশ্চিতভাবেই স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করবে।

গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত এডুকেশন ওয়াচের অন্তর্র্বর্তীকালীন প্রতিবেদনে ২০২১ সালে ঝরে পড়ার ব্যাপারে উদ্বেগজনক মতামত পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিকের ৩৮ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন বিদ্যালয় খুলে দেয়ার পরও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যেতে পারে। ২০ শতাংশ মনে করেন, ঝরে পড়ার হার বাড়বে এবং আট দশমিক সাত শতাংশ মনে করেন, শিক্ষার্থীরা শিশুশ্রমে নিযুক্ত হতে পারে। মাধ্যমিকের ৪১ দশমিক দুই শতাংশ শিক্ষক মনে করেন, বেশি শিক্ষার্থী ক্লাসে অনুপস্থিত থাকতে পারে। ২৯ শতাংশ মনে করেন, ঝরে পড়ার হার বাড়বে। ৪০ শতাংশ অভিভাবক মনে করেন, শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতির হার বাড়বে এবং ২৫ শতাংশ মনে করেন, ঝরে পড়ার হার বাড়বে। অন্যদিকে ৪৭ শতাংশ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মনে করেন, শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতের হার বাড়বে, ৩৩ দশমিক তিন শতাংশ মনে করেন ঝরে পড়া বাড়বে এবং ২০ শতাংশ মনে করেন, অনেকেই শিশুশ্রমে যুক্ত হতে পারে। ৬৪ শতাংশ এনজিও কর্মকর্তা মনে করেন, শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির হার ও ঝরে পড়া বাড়বে।

সরকার দাবি করছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর হাতে যথাসময়ে উপবৃত্তির টাকা পৌঁছে দেয়াতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে। এমনকি কভিড-১৯ পরিস্থিতিতেও ডিজিটাল পদ্ধতি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে উপবৃত্তির টাকা যথাসময়ে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের এনরোলমেন্ট হার বেশি। মেয়েদের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ আর ছেলেদের ক্ষেত্রে ৯৯ দশমিক সাত শতাংশ। কিন্তু শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারের এ ধারণা একেবারেই অমূলক। কত শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে, কিংবা ঝরে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে রয়েছে, তার প্রকৃত চিত্র এখন পাওয়া না গেলেও একটি বড় সংখ্যক শিক্ষার্থী যে ঝরে পড়বে তা সহজেই অনুমেয়।

তবে এটা সত্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সরাসরি শিক্ষার্থীদের যেমন ক্লাস নেয়া যাচ্ছে না, শিক্ষকরাও তেমনি সামনাসামনি ক্লাস নিতে পারছে না, বিকল্প হিসেবে সারাদেশে ভার্চুয়ালি অনলাইনের মাধ্যমে ক্লাস নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এটাতে অনেক জায়গায় যাওয়া যায়নি। যেমন দ্বীপ, হাওর বা পাহাড়ি অঞ্চলে নেটওয়ার্কে সমস্যা আছে। আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সব বাচ্চাদের হাতে অনলাইন ডিভাইস নেই। সরকার এখন পর্যন্ত অনলাইনের ওপর নির্ভর করছে এবং ওই ক্লাসগুলো ইউটিউবেও আপলোড করা হচ্ছে। কেউ ক্লাস মিস করলে পরবর্তী সময়ে যেখানে নেটওয়ার্ক আছে, সেখানে গিয়ে ইউটিউব থেকে ডাউনলোড করে নিতে পারছে। কিন্তু যাদের কোনো অনলাইন ডিভাইস নেই, তাদের জন্য এটা কোনো কাজেই আসছে না। মজার বিষয় হচ্ছে, যেসব শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হতে পারেনি, তাদেরই ঝরে পড়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি এবং তাদের হয়তো আর কোনো দিনই বিদ্যালয়গামী করা যাবে না।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা কভিডকালে বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়েছে, তাদের অনেকেই আর স্কুলে ফিরবে না। সেজন্য পরিবারগুলোকে প্রণোদনা দিয়ে হলেও স্কুলমুখী করার ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। ২০১৯ সালে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৭  দশমিক ৯ শতাংশ আর মাধ্যমিকে এই হার ছিল ৩৭  দশমিক ৬২ শতাংশ। করোনার কারণে পরিবারে অভাবের তাড়নায় শিশুরা শ্রমের দিকে ঝুঁকেছে। এসডিজি অর্জনে সরকার শিশুশ্রম নিরসনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম ও ২০২৫ সালের মধ্যে সব ধরনের শিশুশ্রম বন্ধের পরিকল্পনা সরকারের থাকলেও বাস্তবে কতটা সম্ভব, তা এখন প্রশ্নের উদ্রেক করেছে।

শিক্ষা নিয়ে কাজ করা গণসাক্ষরতা অভিযানের মতে, ‘করোনায় দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। অনেক পরিবারেই দারিদ্র্য বেড়েছে। অনেকেই শিশুশ্রমে যুক্ত হয়েছে। মেয়েদের জোর করে বাল্যবিয়ে দেয়া হচ্ছে। স্কুল খোলার পর সব শিশুদের ফিরিয়ে আনতে একটি অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সচেতন করার পাশাপাশি তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। এ ছাড়া সরকারের একটা প্রণোদনা দেয়া দরকার। সেটা হতে পারে মিড ডে মিল বা দুপুরের গরম খাবার। এ ছাড়া পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য এক্সট্রা ক্লাসেরও ব্যবস্থা করতে হবে। স্কুলগুলোয় সার্বিক তদারকিও বাড়াতে হবে।’

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে এবং শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার, সামাজিক অস্থিরতা, মাদকের ভয়াবহতা ও মানসিক স্বাস্থের অবনতি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা মোবাইল গেমে আসক্ত হচ্ছে। সুন্দর ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে না পারলে শুধু শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার আশঙ্কাই বাড়ছে না, একইসঙ্গে বাংলাদেশে নারী শিক্ষা, মাতৃমৃত্যু, শিশুশ্রম রোধ ও বাল্যবিয়ে রোধে যেসব অর্জন এরই মধ্যে সারাবিশ্বে সুনাম অর্জন করেছে, সেগুলোও নিমেষেই শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পর শিক্ষা ব্যবস্থার এমন ক্ষতি কখনও হয়নি। এখন প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ। কভিড-পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থায় ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী করাই হবে বিরাট চ্যালেঞ্জ।

ব্যাংকার ও ফ্রিল্যান্স লেখক

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..