দিনের খবর প্রথম পাতা

কভিডের টিকা নিয়ে পথহারা বাংলাদেশ!

ইসমাইল আলী: ১৮ বছরের বেশি বয়সের সবাইকে টিকা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। যদিও ৪০ বছর বয়সের নিচের কাউকে টিকা দেয়া হবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। এজন্য গত ফেব্রুয়ারি টিকা প্রদান শুরু হলেও এখন তা বন্ধ হওয়ার পথে। টিকার মজুত শেষ হয়ে আসায় এ শঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রথম ডোজ গ্রহীতাদের অন্তত ১৩ লাখ দ্বিতীয় ডোজ নিতে পারছে না। আর বাংলাদেশ চেয়ে আছে চীন ও রাশিয়ার টিকার দিকে।

যদিও উচ্চ দামে ভারত থেকে টিকা কিনে বাংলাদেশকে গচ্চা দিতে হচ্ছে ৩২৫ কোটি টাকার বেশি। আর শুধু টিকা সরবরাহ করেই মাঝখান থেকে ২৩০ কোটি মুনাফা তুলে নিচ্ছে বেক্সিমকো।

সূত্রমতে, সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে বেক্সিমকোর মাধ্যমে বাংলাদেশ তিন কোটি ডোজ অক্সফোর্ডের টিকা কেনার চুক্তি করে গত নভেম্বরে। এতে প্রতি ডোজের দাম পড়ছে ৪ ডলার। যদিও সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে ভারত প্রতি ডোজ টিকা কিনছে দুই ডলার ৭২ সেন্টে। এতে প্রতি ডোজে বাংলাদেশের অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে এক ডলার ২৮ সেন্ট বা ১০৮ টাকা ৫৩ পয়সা। ফলে তিন কোটি ডোজে গচ্চা যাচ্ছে তিন কোটি ৮৪ লাখ ডলার বা ৩২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

এদিকে সেরামের ৫০ লাখ করোনার টিকা বাংলাদেশ সরকারকে সরবরাহ করে ৩৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা মুনাফা করেছে বেক্সিমকো। সব খরচ বাদ দেয়ার পর এ মুনাফা করেছে কোম্পানিটি। তাতে প্রতি টিকায় মুনাফার পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৬ টাকা ৭৪ পয়সা। এতে তিন কোটি ডোজ টিকা সরবরাহের মাধ্যমে ২৩০ কোটি ২২ লাখ টাকা মুনাফা তুলে নেবে কোম্পানিটি।

যদিও চুক্তি অনুযায়ী অগ্রিম টাকা দিয়েও টিকা পাচ্ছে না বাংলাদেশ। চুক্তি অনুযায়ী প্রথম চালানের ৫০ লাখ টিকা আসে গত জানুয়ারি মাসে। আর ফেব্রুয়ারিতে আসে ২০ লাখ। এরপর সেরাম আর কোনো টিকা পাঠায়নি। অথচ কথা ছিল প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ টিকা পাঠাবে তারা। যদিও গত ৭ ফেব্রুয়ারি প্রথম ডোজ টিকা দেয়া শুরু করা হয়। এরপর দ্বিতীয় ডোজ দেয়া শুরু হয় ৮ এপ্রিল।

চুক্তির বাইরে ভারত সরকারের কাছ থেকে শুরুতে ২০ লাখ ডোজ টিকা উপহার হিসেবে পায় বাংলাদেশ। এছাড়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় উপহার হিসেবে আসে আরও ১২ লাখ ডোজ। এছাড়া ভারতের সেনাপ্রধান বাংলাদেশের সেনাপ্রধানকে উপহার দিয়েছেন এক লাখ ডোজ। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের তৈরি করা অক্সফোর্ডের টিকা হাতে পেয়েছে এক কোটি তিন লাখ ডোজ।

দুই ডোজ করে এই টিকা ৫১ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দেয়া সম্ভব। তবে গত রোববার পর্যন্ত টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন ৫৮ লাখ ১৯ হাজার ৭১৯ জন। আর দ্বিতীয় ডোজ টিকা নিয়েছেন ৩০ লাখ ২৩ হাজার ১৬৯ জন। সব মিলিয়ে ৮৮ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ ডোজ টিকা দেয়া হয়েছে। এখন বাংলাদেশের হাতে আছে ১৪ লাখ ৫৭ হাজার ১১২ ডোজ। কিন্তু যারা এখন পর্যন্ত প্রথম ডোজ নিয়েছেন, তাদের মধ্যে ২৭ লাখ ৯৬ হাজার ৫৫০ জন দ্বিতীয় ডোজ পাননি। ফলে প্রথম ডোজ নেয়া সবাইকে দ্বিতীয় ডোজ দিতে হলে বাংলাদেশের আরও ১৩ লাখ ৩৯ হাজার ৪৩৮ ডোজ অক্সফোর্ডের টিকা লাগবে।

সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় গত ২৬ এপ্রিল থেকে প্রথম ডোজ টিকা দেয়া স্থগিত করা হয়। যদিও নানা চাপের কারণে তা পুরোপুরি কার্যকর করতে পারছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ অবস্থা বাংলাদেশে যারা প্রথম ডোজ নিয়েছেন, তাদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখের জন্য দ্বিতীয় ডোজ টিকার ব্যবস্থা নেই। তাই তাদের জন্য দ্বিতীয় ডোজের টিকা সংগ্রহই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের সামনে।

তাই বাংলাদেশ অন্তত ২০ লাখ ডোজ অক্সফোর্ডের টিকার জন্য হন্যে হয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি মেলেনি কারোর থেকেই। অন্যদিকে দ্বিতীয় ডোজের জন্য অক্সফোর্ডের টিকাই লাগবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, দ্বিতীয় ডোজ হিসেবে অন্য ব্র্যান্ডের টিকা দেয়ার বিষয়টি এখনও অনুমোদিত বা পরীক্ষিত নয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ এখন চেষ্টা করছে যেসব দেশের কাছে অক্সফোর্ডের টিকা মজুদ আছে, সেসব দেশ থেকে কিনে আনতে। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক ও অস্ট্রেলিয়াসহ সাতটি দেশের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত আছে। আর বাংলাদেশ সেরাম থেকে চুক্তির বাকি দুই কোটি ৩০ লাখ ডোজ টিকা কবে পাবে তা এখন অনিশ্চিত। এছাড়া সেরামের টিকা রপ্তানির ওপর জুন পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ভারত সরকার। ফলে জুলাইয়ের আগে সেরামের টিকা পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই।

গতকাল এক ভার্চুয়াল বিফ্রিংয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের টিকার কিছুটা সংকট আছে। কারণ ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে যে পরিমাণ টিকার প্রত্যাশা ছিল যথাসময়ে পাওয়ার, সেটা এখনও পাইনি। সেটি পাওয়ার জন্য নানাভাবে যোগাযোগ চলছে। ভারতের বাইরেও যেসব দেশে অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা উৎপাদন করা হচ্ছে, সেখানেও যোগাযোগ হচ্ছে। আমরা যদি পেয়ে যাই, তাহলে প্রথম ডোজের ঘাটতি পূরণ করা খুবই সহজ হয়ে যাবে।’

এদিকে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে বাংলাদেশ রশিয়ার স্পুটনিক-ভি এবং চীনের সিনোফর্মের টিকার অনুমোদন দিয়েছে। এ দুটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ‘জি টু জি’ চুক্তি হয়েছে। আগামী ১০ মে’র মধ্যে চীন থেকে পাঁচ লাখ টিকা আসতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। আর জুন মাসের মধ্যে রাশিয়া থেকে পাওয়া যাবে ৪০ লাখ ডোজ। তবে চীন ও রাশিয়ার টিকা কেনার প্রক্রিয়া এখনও চূড়ান্ত হয়নি বলে জানান তিনি।

স্বাধীনতা চিকিৎসক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান সার্বিক প্রসঙ্গে শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আসলে তো এখন টিকাই পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার উম্মুক্তভাবে যেখান থেকে পারছে আনার চেষ্টা করছে। টিকা আনার প্রক্রিয়া উম্মুক্তভাবে করা তো হলো, তবে দেরি হয়ে গেল। এটি আগে করতে পারলে সুফল পাওয়া যেত বেশি।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..