সম্পাদকীয়

কভিডের টিকা সংগ্রহে গতি আনুন

টিকাদানে বাংলাদেশের সাফল্য বিস্ময়কর। জন্মের পর কিংবা শিশু বয়সে অজানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু কিংবা পঙ্গুত্ব বরণ ছিল বাংলাদেশের শিশুদের জন্য নিয়তি। কিন্তু এখন আর সে দৃশ্য দেখা যায় না। সত্তরের দশকের শেষ দিকের একটি সরকারি বিজ্ঞাপনের কথা অনেকের মনে থাকবে, ‘গুটি বসন্ত রোগীর সন্ধান দিলে পুরস্কার’। সবার জন্য টিকাদান নিশ্চিত করে গুটি বসন্তকে ঝেটিয়ে বিদায় করেছি আমরা। টাইফয়েড, পোলিও, যক্ষ্মা, হাম, ধনুষ্টংকার, ডিপথেরিয়া ও হুপিং কাশিসহ অনেক সংক্রামক রোগ এখন বিলুপ্তির পথে।

টিকাদান এত জনপ্রিয় যে, অজপাড়গাঁয়ের কম শিক্ষিত পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর মায়েরাও জানেন শিশুসন্তানকে কোন বয়সে কোন টিকা কোথায় দিতে হবে। তারা নিজের সন্তানকেই সব টিকা দেননি, পাড়া-প্রতিবেশীর শিশুসন্তানকে টিকা দিতে মায়েদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। সবাইকে সম্পৃক্ত করতে পারায় শিশুমৃত্যু কমেছে ব্যাপকহারে। কিছু টিকা বিনা মূল্যে পেলেও সব টিকা পাওয়া যায় না। সেগুলোও অনেকে ব্যবস্থা করেছেন। এ অর্জন এক দিনের নয়। ১৯৭৯ সালে  শুরু হওয়া টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য এখন প্রশ্নাতীত। টিকা না দেয়াই এখন অতি আশ্চর্যের। বয়স দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগে দেশের ৮২ শতাংশ শিশু জীবনরক্ষাকারী টিকা পায়। কিছু ক্ষেত্রে এ হার ৯৯ শতাংশ।

২০১৪ সালে বাংলাদেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছ থেকে পোলিও নির্মূল সনদ লাভ করে। টিকার ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৯ সালে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনের (গাভি) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ হিসেবে পুরস্কৃত করে। টিকাদানে বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল। এটি নিয়ে কোনো অতিরঞ্জন নেই। এতসব অর্জন স্বীকৃতি যেন এক জায়গায় এসে থমকে আছে। প্রাণঘাতী অতিমারি কভিড টিকা সংগ্রহে আমাদের অর্জন খুবই নগণ্য। গতকাল শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘কভিড টিকাদানের তালিকায় পেছনের সারিতে বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদন সবাইকে হতাশ করবে। যেখানে টিকার বিকল্প না থাকা সত্ত্বে টিকা সংগ্রহে আমদের ব্যর্থতাই স্পষ্ট হচ্ছে। এদিকে করোনাভাইরাসে সংক্রমণ ও মৃত্যু দুই সপ্তাহ ধরে দ্রুত বাড়ছে।

কভিডের টিকা নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর কিঞ্চিৎ সুসংবাদ পাওয়া গেছে। ১ জুলাই থেকে নতুন করে টিকা কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। এরই মধ্যে সিনোফার্ম, মডার্না ও ফাইজারের কিছু টিকা এসে পৌঁছেছে কিংবা পথে পথে রয়েছে। টিকা দেয়ার জন্য ইতোমধ্যে নতুন করে নিবন্ধনকাজও শুরু হয়েছে। কিন্তু সংগ্রহে ধীরগতিতে সাধারণ মানুষ ভরসা পাচ্ছে না। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে হলে ২৬ কোটি ডোজ (১৩ কোটি লোক দুই ডোজ করে নিলে) টিকা প্রয়োজন। আমরা লক্ষ্য থেকে অনেক পিছিয়ে। এ অবস্থায় টিকার ঘাটতি পূরণে কূটনৈতিক জোরদার করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কভিডের টিকা উৎপাদন করছে। মহামারির সময় বিশ্বের কোনো দেশই নিরাপদ নয়। কোনো দেশের দিকে না তাকিয়ে মহামারি নিয়ন্ত্রণে টিকাসহ যে ধরনের সহযোগিতা পাওয়া যাবে, সেটিকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করতে হবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..