প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

কভিডের তৃতীয় ঢেউয়ের পথে বাংলাদেশ?

নজরুল ইসলাম: দেশে কভিডে মৃত্যু ও শনাক্তের হার এখন ঊর্ধ্বমুখী। গত বছরের নভেম্বরের শুরু থেকে মাঝামাঝি পর্যন্ত সংক্রমণ কিছুটা স্থিতিশীল ছিল। এ সময় সংক্রমণের হার কমে এক শতাংশের নিচে নেমে যায়। আর সংক্রমণের সংখ্যা ২০০-৩০০ মধ্যেই ছিল। তবে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে তা বাড়তে শুরু করে।

নতুন বছরের জানুয়ারিতে এসে আগের বছরের চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। সংক্রমণের হার ২৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। সংক্রমণের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। গতকাল তা ১১ হাজার অতিক্রম করে। তবে কভিডের এ ঊর্ধ্বমুখী হারকে এখনই তৃতীয় ঢেউ বলতে নারাজ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এখনই সেরকম কিছু বলা যাবে না। তবে দেশ কভিডের তৃতীয় ঢেউয়ের পথে বলা যায়। যদিও সংক্রমণের পরিস্থিতি অশুভ ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

এদিকে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির কারণে গতকাল দুই সপ্তাহের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। কভিড সংক্রমণ শুরু হলে ২০২০ সালের মার্চের মাঝামাঝিতে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করা হয়। দফায় দফায় সেই ছুটি বাড়ানো হয়। প্রায় দেড় বছর বন্ধ ছিল স্কুল-কলেজগুলো। করোনা সংক্রমণ কমতে শুরু করলে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে খুলে দেয়া হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। 

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগের ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা) করোনায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ১১ হাজার ৪৩৪ জন। এ সময়ে নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার ২৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা আগের দিন ছিল ২৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ। আর করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ১২ জন।

গত বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সোয়া ৪১ হাজার নমুনা পরীক্ষা করে ১০ হাজার ৮৮৮ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ে। নতুন রোগী পাওয়া গেছে দেশের ৬৪ জেলাতেই। তার আগের দিন বুধবার ৯ হাজার ৫০০ নতুন রোগী শনাক্তের কথা জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বৃহস্পতিবার মারা যান চারজন। তার আগের দিন বুধবার মারা যান ১২ জন।

জানুয়ারির প্রথম দিনও শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল চারশ’র নিচে, ৬ জানুয়ারি তা হাজার ছাড়ায়, ১৬ জানুয়ারি পেরিয়ে যায় পাঁচ হাজারের ঘর।

১৭ জানুয়ারি জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং শনাক্ত হয়েছেন ছয় হাজার ৬৭৬ জন। শনাক্তের হার বেড়ে দাঁড়ায় ২০ দশমিক ৮৮ শতাংশে। তার আগের ২৪ ঘণ্টায় আটজনের মৃত্যু হয়। শনাক্ত হন পাঁচ হাজার ২২২

 জন। শনাক্তের হার ছিল ১৭ দশমিক ৮২ শতাংশ। ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত কভিড সংক্রমণের ক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার ধরন ওমিক্রন মোট ৫৫ জনের দেহে শনাক্ত হয়েছে।

হাসপাতালগুলোয় ‘আশঙ্কাজনক হারে’ রোগী ভর্তি হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। গতকাল এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনই রোগী শনাক্তের হার বাড়ছে, যদিও মৃত্যুর হার এখনও কিছুটা কম। সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কারণ আমরা এখনও সেভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানছি না। সরকার ১১ দফা বিধিনিষেধ দিয়েছে, তারপরও মানুষ সেটা মানছে না।’

এর আগে ১৭ জানুয়ারি বিকালে এক ভার্চুয়াল প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা এবিএম খুরশীদ আলম বলেন, ‘আক্রান্তের হার বেড়ে যাওয়া অশুভ ইঙ্গিত। আমরা যদি নিজেদের সংবরণ না করি, এটাকে প্রতিহত করার চেষ্টা শক্তিশালী না করি, তবে পরে বিপদের বড় আশঙ্কা আছে। শনাক্তের হার দুই সপ্তাহ আগেও দুই শতাংশের নিচে ছিল। আজ (১৭ জানুয়ারি) ২০ দশমিক ৮৮ শতাংশ। দুই সপ্তাহের মধ্যে অনেকখানি বেড়েছে।’

তিনি বলেন, ‘অনেকে ভাবছে ওমিক্রনে ভয়ের কারণ নেই। কারণ এখানে মৃত্যুর হার কম। আমাদের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং আইইডিসিআর জিনোম সিকোয়েন্স করছে। তারা বলছেন, ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণের হার বেশি। ওমিক্রন বাড়ছে, তবে সেটা ডেল্টার মতো নয়। ঢাকায় ওমিক্রনের হার বেশি। তবে সামগ্রিকভাবে ডেল্টার প্রাধান্য সব জায়গায় বেশি। অন্যান্য শহরে ওমিক্রন নেই। এখানে যেটা বাড়ছে সেটা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। এই ভ্যারিয়েন্টের পরিণতি আপনারা আগেই দেখেছেন।’

১৬ জানুয়ারি রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে গত এক সপ্তাহে ২০ হাজার ২৮০ জনের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। শতকরা হিসাবে এটি ২২২ শতাংশ। একইসঙ্গে এই সময়ে মৃত্যু বেড়েছে ৬১ শতাংশ। এ অবস্থায় স্বাস্থ্যবিধির কোনো বিকল্প নেই।’

কভিডের এই ঊর্ধ্বগতিকে থার্ড ওয়েভ (তৃতীয় ঢেউ) বলা যাবে কি না জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এখনই সেটা বলা যাবে না, তবে সে পথে এগুচ্ছে বলা যায়।’ তৃতীয় ঢেউ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কী ধরনের প্রস্তুতি আছেÑজানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রয়েছে। বেডও তৈরি রয়েছে। চিকিৎসকরাও প্রস্তুত রয়েছেন। নার্সসহ অন্যরাও প্রস্তুত আছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমরা বারবার বলছি স্বাস্থ্যবিধি মানতে। এর কোনো বিকল্প নেই। ১৫ দফা নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি না মানলে বিপদ বাড়বে। সবাই মিলে এই বিষয়ে জোর দিতে হবে।’

এদিকে ওমিক্রনের বিস্তার শুরুর পর ৮ ডিসেম্বর থেকে ৮ জানুয়ারির মধ্যে যারা কভিডে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেছেন, তাদের বেশিরভাগই আগের ধরন ডেল্টায় সংক্রমিত ছিলেন বলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে। গত সপ্তাহে গবেষণার ফল তুলে ধরেন বিএসএমএমইউর জেনেটিকস অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি বিভাগের চেয়ারম্যান লায়লা আঞ্জুমান বানু।

তিনি বলেন, ‘৮ ডিসেম্বর থেকে ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত এক মাসে ৯৬টি নমুনার জেনোম সিকোয়েন্স করা হয়েছে। সেসব রোগীর মধ্যে ৪০ জন ছিলেন বহির্বিভাগের ও ৫৬ জন ছিলেন হাসপাতালে ভর্তি। আউটডোর পেশেন্টের নেয়া নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিং করে আটজনের মধ্যে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ২০ শতাংশ ওমিক্রনে আক্রান্ত ছিল। বাকিদের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে। আর যারা ইনডোরে ভর্তি ছিলেন, তাদের মধ্যে কারও ওমিক্রন পাওয়া যায়নি।’

কভিড সংক্রমণের বৈশ্বিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ডিসেম্বর থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংক্রমণের হার ও শনাক্তের সংখ্যা বাড়ছে। তবে চলতি বছর এ হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে বিভিন্ন দেশে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সংক্রমণ দ্রুত বাড়ায় বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ নতুন করে লকডাউনে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে তৃতীয় ঢেউ বলেই আখ্যায়িত করেছে। তবে মার্চে তা সারাবিশ্বে ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়তে পারে ইঙ্গিত দিয়েছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশেও চলতি বছর বিশেষত গত দুই সপ্তাহে দ্রুত বেড়েছে সংক্রমণ। কভিডের শনাক্তের হারের এই ঊর্ধ্বগতিকে থার্ড ওয়েভ বলা যাবে কি না জানতে চাইলে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘কভিডে মৃত্যু ও শনাক্তের হার বাড়ছে, কিন্তু এটাকে এখনই থার্ড ওয়েভ বলা যাবে না। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি আমরা।’

তথ্যমতে, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়েছিল ২০২০ সালের ৮ মার্চ। গতকাল পর্যন্ত সরকারি হিসাবে দেশে কভিড রোগী মোট শনাক্ত হলেন ১৬ লাখ ৬৪ হাজার ৬১৬ জন। আর এ পর্যন্ত মারা গেছেন ২৮ হাজার ১৯২ জন।