মত-বিশ্লেষণ

কভিডের দুঃসময়ে শ্রমিকের ঈদ বোনাস নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের

ফজলুল কবির মিন্টু: ঈদুল ফিতর সমাগত। ঈদুল ফিতর মুসলিম সম্প্রদায়ের উৎসব হলেও বাংলাদেশে কালের পরিক্রমায় আজ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার আনন্দ-উৎসবে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী কভিড মহামারির কারণে এবারের ঈদ সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে পালিত হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। 

বাংলাদেশের মোট শ্রমিকসংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় কোটি, যার মধ্যে ৮৭ শতাংশ হচ্ছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের, যাদের কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়োগকর্তাই নেই। তারা নিয়মিত কাজ পায় না। সাম্প্রতিককালে দেশে কভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাতে এবং সরকার ঘোষিত অপরিকল্পিত লকডাউনের কারণে দীর্ঘদিন আয়-উপার্জন ছাড়া থেকে লণ্ডভণ্ড তাদের ভবিষ্যৎ। সুতরাং তাদের ঈদ উদ্যাপনের ব্যাপারটি ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। দুবেলা দুমুঠো ভাত জোগাড় করা যেখানে কষ্টসাধ্য, সেখানে ঈদ উৎসব বিলাসিতা ছাড়া আর কী হতে পারে?   

প্রাতিষ্ঠানিক খাতের বাকি ১৩ শতাংশ শ্রমিকের বাস্তব অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়।  বেসরকারি খাতে কর্মরত শ্রমিকদের তুলনায় সরকারি খাতে কর্মরত শ্রমিকদের সৌভাগ্যবান বলা যেতেই পারে। কারণ সব সরকারি শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য বছরে দুটি উৎসব বোনাসের পাশাপাশি বৈশাখী উৎসব ভাতাও যুক্ত হয়েছে। বেসরকারি শ্রমিকদের জন্য রয়েছে ‘শ্রম আইন, ২০০৬’। দুর্ভাগ্যজনকভাবে শ্রম আইনের কোথাও উৎসব বোনাস-সংক্রান্ত কিছুই উল্লেখ নেই। ২০১৫ সালে শ্রম বিধিমালা তৈরি হওয়ার আগ পর্যন্ত উৎসব বা ঈদ বোনাসের ব্যাপারে কোনো আইনগত ভিত্তি ছিল না। শ্রম বিধিমালা তৈরি হওয়ার পর ১১১(৫) ধারাতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রত্যেক শ্রমিক কোনো প্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন এক বছর চাকরি করলে বছরে দুটি উৎসব বোনাস প্রাপ্য হবে। তবে এখানে উল্লেখ আছে, বোনাসের পরিমাণ মূল মজুরির বেশি হতে পারবে না। অর্থাৎ কোনো শ্রমিকের মূল মজুরি যদি চার হাজার টাকা হয়, তাহলে মালিক ইচ্ছা করলে উৎসব বোনাস হিসেবে চার হাজার টাকার সমান বা তার নিচে যেকোনো পরিমাণ টাকা দিতে পারবে। কিন্তু চার হাজার টাকার বেশি দেয়া হলে আইন ভঙ্গ হবে। এ আইনের মাধ্যমে শ্রমিকদের মূল মজুরির চেয়ে কম টাকা বোনাস দেয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। এমনকি কোনো মালিক যদি বোনাস হিসেবে ১০০ টাকা দিতে চায়, তা বেআইনি হবে না। আমাদের দেশে অধিকাংশ মালিকের ধারণা বোনাস মজুরির অতিরিক্ত অংশ। সুতরাং মালিক শ্রমিককে বোনাস প্রদান করতে বাধ্য নয়। অথচ তারা জানে না কোনো শ্রমিকের চাকরির বয়স এক বছর পূর্ণ হলে তাকে বোনাস প্রদানের কথা আইনে বলা হয়েছে। সুতরাং বোনাস হচ্ছে একজন শ্রমিকের কোনো প্রতিষ্ঠানে এক বছর চাকরি করার পর তার আইনসম্মত প্রাপ্য বা অধিকার। বোনাস মালিকের দান নয়। সুতরাং শ্রমিকের চাকরির বয়স এক বছর পূর্ণ  হলে তাকে বোনাস দিতে মালিক বাধ্য। অন্তত ‘শ্রম বিধিমালা, ২০১৫’ তৈরি হওয়ার পর এটা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। বোনাসের আভিধানিক অর্থ মজুরির অতিরিক্ত বোঝালেও বাস্তবে এটি হচ্ছে উৎসব ভাতা, তাই বোনাসকে মজুরির অতিরিক্ত বলার কোনো সুযোগ নেই। বর্তমানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয়ও বোনাসকে উৎসব ভাতা হিসেবেই উল্লেখ করা হয়।

আন্তর্জাতিক শ্রম মান অনুসারে যেকোনো দেশের শ্রম আইন হচ্ছে গরহরসঁস ঝঃধহফধৎফ, অর্থাৎ একজন শ্রমিকের সর্বনি¤œ প্রাপ্য আইনে উল্লেখ থাকে, যাতে কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকের বেশি দেয়ার সক্ষমতা থাকলে এবং ওই মালিক বেশি দিতে ইচ্ছুক থাকলে তাতে আইনগতভাবে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয় না। তাই বোনাস-সংক্রান্ত বিধিমালার ১১১(৫) ধারাটি শ্রম আইনের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে বিধিটির পরিবর্তন খুব জরুরি হয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি শিল্প খাতের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও অসন্তোষ নিরসনে গঠিত ত্রিপক্ষীয় কমিটির ৩৭তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ছে। ওই বৈঠকে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের ঈদ বোনাস ১০ মের মধ্যে পরিশোধ করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এপ্রিল মাসের মজুরি প্রদানের ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা জানা যায়নি। অন্যদিকে ১০ মে বোনাস দেওয়ার ঘোষণায় শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। কেননা শ্রমিকদের একটি সাধারণ দাবি হচ্ছে, প্রতি বছর ঈদের কমপক্ষে ১০ দিন আগে যেন বোনাস দেয়া হয়। কিন্তু শ্রমিকদের যুক্তিসংগত দাবি মালিক ও রাষ্ট্র কেউ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে বলে মনে হয় না। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, পোশাকশিল্পের মালিকেরা আর্থিক সংকটের কথা উল্লেখ করে শ্রমিকদের মজুরি ও বোনাস দেয়ার জন্য সরকারের কাছে ঋণ চেয়েছে। অথচ গত বছরের তুলনায় এ বছর ছয়গুণ বেশি আয় হয়েছে। তারপরও যদি আর্থিক সংকট হয়, সেটা মালিকদের ব্যাপার, কিন্তু এ বিষয়কে ইস্যু করে যেন শ্রমিকদের এপ্রিল মাসের মজুরি ও বোনাস পেতে কোনো সমস্যা না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

কভিডের দ্বিতীয় ঢেউ এবং দেশব্যাপী লকডাউনের মাঝেও শ্রমিকেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কলকারখানা চালু রাখার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে। সরকারের পক্ষ থেকে কলকারখানার মালিকদের শ্রমিকদের পরিবহনের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেয়া হলেও কোনো মালিক তা মানেনি। এর ফলে শ্রমিকদের যাতায়াত বাবদ অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এমনিতে তারা যে মজুরি পায়, তা দিয়ে তাদের মাস চলে না। লকডাউনের সময় যাতায়াত বাবদ অতিরিক্ত খরচের কারণেও শ্রমিকেরা অপ্রত্যাশিতভাবে আর্থিক সংকটে রয়েছে। এ অবস্থায় ঈদ বোনাস সময়মতো পেলে তাদের এমন আর্থিক সংকট কিছুটা হলেও লাঘব হতো। 

ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠক

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..