মত-বিশ্লেষণ

কভিডের দ্বিতীয় প্রবাহ মোকাবিলায় ব্যবস্থা নিন

এস এইচ ওয়ালিউল্লাহ: অতিমারি কভিড নিয়ে ভয় ও উৎকণ্ঠা শেষ না হতেই দ্বিতীয় দফা সংক্রমণের কথা উঠছে। ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত, যুক্তরাজ্যসহ বেশ কিছু দেশে এরই মধ্যে তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে, যাকে বলা হচ্ছে সংক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় ঢেউ। বাংলাদেশেও সেকেন্ড ওয়েভ শুরু হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। করোনার চ্যালেঞ্জ আসলে কতটা জটিল, তা বিশ্বে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্তের সংখ্যা থেকে সহজেই অনুমেয়। দ্বিতীয় ঢেউয়ের শুরুতেই আমাদের দেশেও হু-হু করে বাড়ছে সংক্রমণের হার। করোনার প্রাদুর্ভাব না কমলেও জীবিকার তাগিদে বেশ আগে থেকেই বাইরে চলাচল করতে হচ্ছে সবাইকে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও চলছে অফিস-আদালত। মানুষের মাঝে করোনা নিয়ে এখন আর কোনো ভীতিই কাজ করছে না। গ্রাম কিংবা শহর বলে কথা নেই, বাজার ও রাস্তাঘাটের সেই চিরচেনা ভিড় চোখে পড়ার মতো। নেই হাত ধোয়ার চর্চা। সরকারি কিংবা বেসরকারি অর্থায়নে বাজার,  বাসস্ট্যান্ড তথা জনবহুল এলাকায় নির্মিত হাত ধোয়ার ট্যাপ/কল পানিশূন্য হয়ে পড়ে আছে। অপ্রয়োজনে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে অসংখ্য মানুষ। এককথায় স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে মানুষের উদাসীনতা চরমে। গণজমায়েত না ঘটানো, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা এবং মাস্ক পরার মতো গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের দেশে সংক্রমণের হার মুহূর্তের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে।

একথা ভুললে চলবে না যে, করোনার শুরু তথা প্রথম ধাপের মতো দ্বিতীয় ধাপের সংক্রমণও ভ্যাকসিন ছাড়াই আমাদের মোকাবিলা করতে হবে। কারণ এই অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের হাতে ভ্যাকসিন পৌঁছানো সম্ভব নয়। কাজেই এই ধাপেও কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং সচেতনতা অবলম্বন করার বিকল্প কোনো রাস্তা খোলা নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, করোনা বিদায় হওয়ার এখনও অনেক দেরি। কেননা যে কোনো মহামারির দুটি এমনকি তিনটি পর্যন্ত ওয়েভ বা ঢেউ থাকতে পারে। উনিশ শতকের স্প্যানিশ ফ্লু’তে দেখা গিয়েছিল তিনটি ওয়েভ এবং তাতে দ্বিতীয় ওয়েভ ছিল প্রথমটির চেয়ে ভয়ানক। বিশ্বের অনেক দেশেই সবে করোনার দ্বিতীয় প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। তবে করোনার দ্বিতীয় প্রকোপে পৃথিবীর অনেক দেশই প্রথম ধাক্কার মতো খেই হারিয়ে ফেলেনি। কারণ হিসাবে বলা যেতে পারে, করোনার প্রথম ধাক্কায় অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সেসব দেশের মানুষ যেমন হয়েছে সচেতন, তেমনি আগে থেকেই ছিল তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রস্তুতি। 

কিন্তু আগত এই দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলার জন্য আমাদের দেশ আসলে কতটুকু প্রস্তুত? সরকারের ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ নীতি, দেশের পয়েন্ট অব এন্ট্রিগুলোয় স্ক্রিনিং অব্যাহত রাখা, বিদেশফেরত মানুষের ক্ষেত্রে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন বাধ্যতামূলক করা ছাড়াও বেশকিছু ফলপ্রসূ ও কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান হলেও করোনা মোকাবিলায় গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রমে এখনও সমন্বয়হীনতা, সঠিক সিদ্ধান্ত ও সুশাসনের যথেষ্ট ঘাটতি লক্ষ করার মতো। একদিকে রয়েছে, বিপুল এই জনগোষ্ঠীকে এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি না মানাতে পারা, করোনা সংক্রমণের দীর্ঘ ৯ মাসেও পরীক্ষা-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে ব্যর্থতা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অনাস্থা তথা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি করার মতো বিষয়গুলো। অপরদিকে বিশ্বের সব দেশ যার যার সাধ্যানুযায়ী করোনা থেকে তাদের নাগরিকদের নিরাপদ করতে ভ্যাকসিন সংগ্রহের দিকে ঝুঁকে পড়লেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে রয়েছে বেশ খানিকটা পিছিয়ে। চীনের ভ্যাকসিন ট্রায়াল না করে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন ভারত থেকে কেনার অদূরদর্শী সিদ্ধান্তই মূলত ভ্যাকসিন প্রাপ্তিতে আমাদের অনিশ্চয়তায় ফেলেছে।

অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, শীতে সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। যেহেতু বাজারে এখনও ভ্যাকসিন আসেনি, তাই কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই সংক্রমণ রোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হবে। খুব সতর্কতার সঙ্গে সবাইকে মনে রাখতে হবে, জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে সবকিছু খুলে দেওয়া হয়েছে। এর মানে এই নয় যে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এসেছে, কিংবা মহামারি শেষ হয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবে শীতকালে উৎসব, ভ্রমণ, জনসমাগম প্রভৃতি বেড়ে যায়। কিন্তু এবারের শীতকে ব্যতিক্রম হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এসব করার মতো স্বাভাবিক অবস্থা এখনও আসেনি। অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে যাওয়া বন্ধ করতে হবে। দর্শনীয় ও পর্যটনের স্থানগুলোয় ভিড় কমাতে হবে, প্রয়োজন হলে বন্ধ রাখতে হবে। বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী মা ও শিশুদের সুরক্ষায় হাসপাতাল গুলোর নিজ নিজ ইউনিটে সেবার মান বৃদ্ধি করতে হবে এবং মনিটরিং বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি না মানার ভয়াবহতা সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি হাসপাতালকে প্রস্তুত রাখতে হবে, তথা খুলতে হবে করোনা ইউনিট। করোনা চিকিৎসার কারণে হাসপাতালগুলোয় যেন স্বাভাবিক চিকিৎসার ব্যাঘাত না ঘটে, সেদিকে সর্বোচ্চ খেয়াল রাখতে হবে। প্রয়োজন অনুপাতে হাসপাতালগুলোকে রেড, ইয়েলো, গ্রিন প্রভৃতি জোনে ভাগ করতে হবে, যাতে হাসপাতালগুলোয় অন্যান্য চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত না হয়।

গণপরিবহন ও দোকানপাট থেকে শুরু করে হাটবাজার কোথাও কেউ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে নেমেছে মাস্ক পরতে মানুষকে বাধ্য করার জন্য। তবুও হুশ ফিরছে না আমাদের। গণজমায়েত কমানো, অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বাইরে বের না হওয়া এবং মাস্ক পরার মতো কাজগুলো মানুষকে মানানোর দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আর যারা মানছে না তাদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে মানতে বাধ্য করবে। সর্বোপরি কার্যকর ভ্যাকসিন হাতের নাগালে না আসা পর্যন্ত সবাইকে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে এবং এটা নিশ্চিত করবে সরকার।

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..