দিনের খবর প্রথম পাতা

কভিডে আক্রান্ত বেশি যুবকরা, বয়স্করা বেশি মারা যাচ্ছেন

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে কভিড-১৯ আক্রান্ত সাত লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় চার লাখই যুবক, যাদের বয়স ২১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। আর এ পর্যন্ত যে ১০ হাজারের বেশি মানুষ কভিড-১৯ রোগে মারা গেছেন, তাদের মধ্যে আট হাজারের বেশি মানুষের বয়স পঞ্চাশের বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুবকরা বাইরে বের হচ্ছে বেশি, তাই সংক্রমিতও বেশি হচ্ছে। আর নানা শারীরিক জটিলতার কারণে বয়স্কদের মৃত্যুহার বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত বছরের মার্চে প্রাদুর্ভাবের পর বুধবার পর্যন্ত সাত লাখ সাত হাজার ৩৬২ জনের দেহে নতুন করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছেন ১০ হাজার ৮১ জন।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানÑআইইডিসিআরের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্তদের সবচেয়ে বেশি ৫৪ দশমিক সাত শতাংশের বয়স ২১ থেকে ৪০ বছর। সংখ্যার হিসাবে তা তিন লাখ ৮৪ হাজার ৬৩৪ জন।

তাদের মধ্যে ২৭ দশমিক ছয় শতাংশের (এক লাখ ৯৪ হাজার ৭৫) বয়স ২১ থেকে ৩০ বছর। ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী ২৭ দশমিক এক শতাংশ বা এক লাখ ৯০ হাজার ৫৫৯ জন।

শনাক্ত রোগীদের দুই দশমিক ৯ শতাংশের বয়স ১০ বছরের কম। ১১ থেকে ২০ বছর বয়সের মধ্যে রয়েছে সাত দশমিক তিন শতাংশ, ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সের ১৭ দশমিক তিন শতাংশ, ৫১ থেকে ৬০ বছর বয়সের ১১ দশমিক দুই শতাংশ ও ষাটোর্ধ্ব ছয় দশমিক সাত শতাংশ।

করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে যে ১০ হাজার ৮১ জন মারা গেছেন, তাদের মধ্যে পঞ্চাশোর্ধ্ব  মানুষই ৮০ দশমিক ৮৯ শতাংশ, অর্থাৎ আট হাজার ১৫৫ জন। মোট মৃত্যুর ৫৬ দশমিক ২৯ শতাংশ, অর্থাৎ পাঁচ হাজার ৬৭৫ জনের বয়স ৬০ বছরের বেশি।

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকে, সারাবিশ্বেই বয়স্কদের মৃত্যুর হার বেশি। যাদের কোমরবিডিটি থাকে, তারা করোনাভাইরাসে বেশি সাফার করে ও তাদের মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি।

বাংলাদেশে বয়স্কদের অনেকেই জানেন না তার ডায়াবেটিস আছে, হাইপারটেনশন আছে। এ কারণে আক্রান্ত হওয়ার পর বাসায়ই জটিলতা তৈরি হয়ে যায়। হাসপাতালে নিয়ে আসার পর আসলে কিছু করার থাকে না।

হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, যারা মারা যাচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগের বয়স যেমন ষাটের বেশি, ঠিক তেমনি অধিকাংশের কিন্তু একাধিক রোগ রয়েছে।

বয়সীদের মৃত্যুর বিষয়টি তিনি ব্যাখ্যা করেন এভাবেÑ‘৬০ বছরের বেশি বয়সীদের কথা না বলে আমরা যদি বলতাম, যেসব মানুষের শরীরে প্রতিরোধী ব্যবস্থা কমে গেছে এবং অন্যান্য রোগ যেমনÑডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যানসার ও ব্রঙ্কিওল অ্যাজমা রয়েছে এবং একইসঙ্গে শরীরের প্রতিরোধ করার ক্ষমতা কিছুটা কমে গেছে, সেই মানুষগুলোই বেশি মারা যাচ্ছে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) উপদেষ্টা ডা. বে-নজির আহমেদ মনে করেন, কম বয়সে শরীরচর্চার মতো অভ্যাসগুলো না থাকায় বয়স্করা বেশি মারা যাচ্ছেন করোনাভাইরাসে।

তিনি বলেন, অনেক দেশ আছে যেখানে ৬০ বা তার বেশি বয়সে জটিল রোগ হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে দেখা যায়, ৩০ বছরের পরেই বহু মানুষই উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসে ভুগছে। অনেকে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম বয়সে।

আমরা শরীরচর্চা করি না। শরীরচর্চা করলে শক্তিমত্তা বেড়ে যায়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো ভালো থাকে। সেটা আমাদের দেশে খুব কম হয়। আমাদের দেশে বয়স্ক মানুষেরা হয়তো হাঁটাহাঁটি করে বা ডায়াবেটিস যাদের রয়েছে, তারা হাঁটাহাঁটি করে; কিন্তু আমাদের কালচারে নিয়মিত ব্যায়াম করার বিষয়টি নেই।

তবে দেশে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে অপেক্ষাকৃত তরুণরা যে বেশি সংক্রমিত হচ্ছে, সেটাও তুলে ধরেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক এই পরিচালক।

তরুণদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা বেশি। তার মানে তারা মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। তবে তাদের মৃত্যুহার কম।

ডা. মুশতাক বলেন, যুবকরা নানা কাজে বাসার বাইরে বের হয়। তারা সচল জনগোষ্ঠী, তাদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

যুবকদের মাধ্যমে বাড়ির বয়স্কদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।

বাসার বয়স্করা যারা এক দিনও বাইরে বের হয় না, তারাও আক্রান্ত হচ্ছে যুবকদের মাধ্যমে। যুবকরা জানেও না তাদের দ্বারা বয়স্করা আক্রান্ত হচ্ছে। এ কারণে যুবসমাজের চলাফেরায় সাবধানতা অবলম্বন করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় আরও জোর দিতে হবে।

লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট মৃত ১০ হাজার ৮১ জনের মধ্যে সাত হাজার ৪৯৯ জনই পুরুষ। দুই হাজার ৫৮২ জন নারী। অর্থাৎ মৃতদের শতকরা ৭৪ ভাগ পুরুষ ও ২৬ ভাগ নারী।

পুরুষের মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, পুরুষ বাসার বাইরে বেশি বের হয় এটাই পুরুষ মৃত্যু বেশি হওয়ার কারণ নয়, এর পেছনে অন্য কারণ রয়েছে। সেটা হচ্ছে হরমোন, যে হরমোন নারীদের আছে, কিন্তু পুরুষের নেই। এই হরমোনগুলো ভাইরাসটাকে সংক্রমণে বাধা দেয়। এই হরমোন থাকার ফলে এক ধরনের ইমিউনিটি তৈরি হয় এবং ভাইরাসকে প্রতিরোধ করে। সে কারণেই বিশ্বজুড়ে পুরুষের তুলনায় নারীর সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই তাৎপর্যপূর্ণভাবে কম।’

আইইডিসিআর গত ২৭ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার ৫১ হাজার ১০৩টি নমুনা পরীক্ষা করে দেখিয়েছে, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে শনাক্তের হার ৩৬ শতাংশ। উত্তর সিটি করপোরেশনে শনাক্তের হার ২৯ শতাংশ। যেখানে সারাদেশের শনাক্তের হার এখনও ১৫ শতাংশের নিচে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসেবে দেখা গেছে, এ পর্যন্ত এক লাখ ৫০ হাজার ৬২৯ জন আক্রান্ত হয়েছে ঢাকা জেলায়, যা অন্য যে কোনো জেলার চেয়ে বেশি। আক্রান্তের সংখ্যায় এরপরই আছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ২৮ হাজার ১১২ জন করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়া সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি এমন জেলাগুলোর মধ্যে বগুড়ায় ৯ হাজার ২৪০ জন, সিলেটে আট হাজার ৮৩৭ জন, কুমিল্লায় আট হাজার ৮০৩ জন, নারায়ণগঞ্জে আট হাজার ২৯০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে।

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ঢাকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব রয়েছে, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সব এখানে। সব মিলিয়ে ঢাকায় ঝুঁকি বেশি। এ কারণেই ঢাকায় আক্রান্ত মানুষ বেশি পাওয়া যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মোট মৃতের পাঁচ হাজার ৮৫৪ জন ঢাকা বিভাগের। এক হাজার ৮০৮ জন চট্টগ্রাম বিভাগের বাসিন্দা। অর্থাৎ মোট মৃতের ৫৮ দশমিক শূন্য সাত শতাংশ ঢাকা বিভাগের। ১৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ চট্টগ্রাম বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন।

এছাড়া মৃত্যুহার খুলনা বিভাগে ছয় দশমিক ২৩ শতাংশ ও রাজশাহী বিভাগে পাঁচ দশমিক ৩৭ শতাংশ। রংপুর, সিলেট, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে মৃত্যুহার চার শতাংশের নিচে ছিল।

ঢাকায় মৃতের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণ সম্পর্কে ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, যেখানে সংক্রমণ বেশি হবে, সেখানে আনুপাতিক হারে মৃত্যু বেশি হবে। সে অনুযায়ীই মৃত্যু হয়েছে ঢাকায়। তবে ঢাকার আশপাশের জেলার লোকজন চিকিৎসার জন্য ঢাকায় চলে আসে বলে তাদের ঢাকার ধরে গণনা হওয়াই ঢাকায় মৃত্যু বেশি হওয়ার কারণ বলে মনে করেন তিনি।

ডা. লেলিন চৌধুরী মনে করেন, ঢাকা জনবহুল ও এখানে বসবাসকারীরা স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন না করায় ঢাকায় মৃতের সংখ্যা বেশি।

ঢাকা ও চট্টগ্রামে জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় এখানে মৃত্যুহার বেশি। এছাড়া এ স্থানগুলো জনবহুল হওয়ায় অনেক রোগী শনাক্ত করার আগেই তার কাছ থেকে অন্যরাও সংক্রমিত হচ্ছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..