দিনের খবর শেষ পাতা

কভিডে আক্রান্ত ২৭ হাজার ব্যাংকার, ১৪৩ জনের মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক: মহামারি কভিড-১৯-এর তৃতীয় ঢেউয়ে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে কর্মরতদের আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়ছে, পাশাপাশি বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। ব্যাংকারদের মধ্যে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে ব্যাংকগুলো। তবে সব ব্যাংকের ব্যবস্থা এক রকম নয়। বেসরকারি ব্যাংগুলো কর্মকর্তাদের চিকিৎসা ব্যয় বহন এবং করোনায় মারা যাওয়া কর্মীর পরিবারকে সাহায্য করলেও উল্টো চিত্র বেশিরভাগ সরকারি ব্যাংকে।

তথ্য অনুযায়ী, এক মাসে এক হাজার ৮৩৭ কর্মকর্তা-কর্মচারী করোনায় সংক্রমিত হয়েছেন। আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১০ ব্যাংকার। এছাড়া উপসর্গ দেখা দিয়েছে আরও সহস্রাধিক কর্মকর্তার শরীরে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ ছুটি, লকডাউন কিংবা বিধিনিষেধ সব ক্ষেত্রেই জরুরি সেবা হিসেবে চলছে ব্যাংকিং কার্যক্রম। নানা প্রতিবন্ধকতায় অফিসে যাতায়াত এবং ব্যাংকিং সেবা দিয়ে যাচ্ছেন ব্যাংকাররা। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে পরিপালন করা সম্ভব হচ্ছে না। এসব কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন ব্যাংকাররা। বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। তাই স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার পাশাপাশি অধিক কর্মী সমাগম ঠেকাতে অনলাইন ব্যাংকিংয়ে জোর দেয়া উচিত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ৩০ জুন পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ২৭ হাজার ২৩৭ কর্মী কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৪৩ জন মারা গেছেন। গত মে মাসে আক্রান্ত ছিলেন ২৫ হাজার ৪০০ ব্যাংককর্মী। ওই সময় মারা যাওয়া ব্যাংকারের সংখ্যা ছিল ১৩৩ জন। এ হিসাবে গত জুনে এক হাজার ৮৩৭ ব্যাংককর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আর মারা গেছেন ১০ জন।

করোনায় সর্বোচ্চ ব্যাংককর্মী আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকে। ব্যাংকটিতে এখন পর্যন্ত ২৭ কর্মী মারা গেছেন। এর মধ্যে গত বছর ২২ জন আর চলতি বছরে পাঁচজন মারা গেছেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান। এছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের ১১ জন ও ন্যাশলান ব্যাংকের সাতজন করোনায় মৃত্যুবরণ করেছেন।

জানা গেছে, গত বছর ৮ মার্চ দেশে প্রথম তিনজনের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এর ১০ দিন পর ১৮ মার্চ দেশে এ ভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম একজনের মৃত্যু হয়। এদিকে করোনার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে গত বছর ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। সরকারি-বেসরকারি বেশিরভাগ অফিস বন্ধ ছিল। কিন্তু জরুরি সেবা হিসেবে সীমিত পরিসরে খোলা রাখা হয় ব্যাংক।

সর্বশেষ কভিডের বিস্তার রোধে সরকার ২৩ জুলাই সকাল ৬টা থেকে ঘোষিত কঠোরতর বিধিনিষেধ জারি করেছে। চলবে ৫ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত। এ সময়ও সীমিত পরিসরে চলবে ব্যাংকিং কার্যক্রম।

কভিড-১৯-আক্রান্ত হয়ে দেশের ব্যাংককর্মীদের মধ্যে প্রথম মারা যান সিটি ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মুজতবা শাহরিয়ার (৪০)। গত বছর ২৬ এপ্রিল সকালে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এতে করে প্রাণঘাতী করোনায় ভীত হয়ে পড়েন অনেকে। জরুরি প্রয়োজনে ব্যাংককর্মীদের কাজে ফেরাতে বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ঝুঁকি বিমাসহ যাতায়াত ভাতা, চিকিৎসা ভাতা ও করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে এককালীন আর্থিক সুবিধা দেয়ার কথা ঘোষণা করা হয়।

চলতি বছর ১৯ এপ্রিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ-সংক্রান্ত সবশেষ নির্দেশনায় বলা হয়, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে পদভেদে ২৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাবেন। এ অর্থ কোনোভাবে কর্মীর ঋণ বা অন্য কোনো দায়ের সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে না বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়।

এ বিষয়ে বেসরকারি সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম কামাল হোসেন বলেন, অর্থনীতি সচল রাখতে ব্যাংক চালু রাখা জরুরি। এর বিকল্প কোনো কিছু নেই। তাই ব্যাংকারদের স্বাস্থ্যঝুঁকি চিন্তা করে সরকার ঘোষিত সব নিয়মকানুন পালন করছি আমরা। কর্মীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনেই অফিস করছেন। পাশাপাশি সাপ্তাহিক বাই-রোটেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে এ পরিস্থিতিতেও কর্মকর্তাদের চাপের মুখে পড়তে না হয়। এছাড়া আমাদের যে কর্মীরা করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের চিকিৎসার ব্যয় ব্যাংক বহন করছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী আক্রান্ত ও মারা যাওয়া কর্মীদের সব ধরনের প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের ব্যাংকের এক কর্মকর্তা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। তার তিন দিনের মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী তার পরিবারকে সব টাকা পরিশোধ করেছি। করোনার সংক্রমণ রোধে আমাদের ব্যাংক সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে।

সিটি ব্যাংকের হিউম্যান রিসার্চ (এইচআর) বিভাগের প্রধান নিশাত আনুয়ার শেয়ার বিজকে বলেন, করোনা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ১১ কর্মকর্তা মারা গেছেন। তাদের সবাইকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী বিমার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া কভিডে আক্রান্ত আটশ’র বেশি কর্মকর্তার চিকিৎসার ব্যয় বহন করেছে ব্যাংক। করোনাকেন্দ্রিক প্রস্তুতির জন্য সবমিলে তাদের এক কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..