খবর দিনের খবর

কভিড আতঙ্ক মাথায় নিয়ে ঢাকা ছাড়ছে মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক: আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে ৮ দিনের জন্য বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছে সরকার। তাই মহামারি কভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ভীতি নিয়েই ঈদুল আজহা উদযাপন করতে বাড়ি ফিরছেন মানুষ। দুর্ভোগ আর গাড়ি ভাড়ায় বাড়তি টাকা গুনতে হলেও পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতেই রাজধানী ছাড়ছেন ঘরমুখো মানুষ।

গতকাল রাজধানীর গাবতলী, কল্যাণপুর ও শ্যামলী বাস কাউন্টারগুলো ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র। এসব কাউন্টার ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে যাত্রীরা ভিড় করছেন বাড়ি ফিরতে।

কঠোর লকডাউনের কারণে অনেক দিন গণপরিবহনসহ সবকিছু বন্ধ ছিল। ইচ্ছে থাকলেও অনেকে বাড়ি ফিরতে পারেননি। তাই কেউ মোটরসাইকেলে, কেউ বিরতিহীন বা লোকাল গণপরিবহনে, কেউবা প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ভাড়া করে আবার কেউ মিনি পিকআপভ্যানে করে ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন। তবে গাড়ির শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাত্রীরা কাউন্টারে অপেক্ষা করছেন বলেও জানিয়েছেন তারা।

ঢাকা থেকে মেহেরপুর যাবেন আশরাফুল ইসলাম তিন ঘণ্টা ধরে বাসের অপেক্ষায় রয়েছেন। কখন বাস আসবে আর কখন বাড়ি ফিরবেন কিছুই বুঝছেন না বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, ফোন করে কাউন্টারে এসেছি তারপরও তিন ঘণ্টা হয়ে গেল এখনও গাড়ি এসে পৌঁছায়নি। জানি না কখন রওনা দিতে পারব। 

এদিকে রাস্তায় দীর্ঘ যানজটের কারণে শিডিউল বিপর্যয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে অবস্থিত হাই ট্রাভেলস দ্রুতি পরিবহনের ফোরম্যান মো. সুমন মিয়া। তিনি বলেন, রাস্তায় যানজটের কারণে গাড়ির শিডিউল বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সকালে গাড়ি ফেরার কথা থাকলেও সেই গাড়ি বিকালেও ফিরছে না। তবে আমরা শিডিউল যাত্রীদের ফোন করে জানিয়ে দিচ্ছি।

অপরদিকে ঈদের পর কঠোর লকডাউন থাকায় অনেকেই পরিবার নিয়ে ছুটছেন গ্রামের বাড়িতে। একটু দুর্ভোগ হলেও যাত্রীদের চোখেমুখে আনন্দ দেখা গেছে। কারণ পরিবার নিয়ে বাড়িতে ভালো সময় কাটবে বলে মনে করছেন তারা।

এ ব্যাপারে গাবতলীতে অবস্থানরত রফিকুল ইসলাম বলেন, একটু দুর্ভোগ কম হবে ও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভীতি নিয়েই পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়ি বগুড়া যাচ্ছি। ঈদের পর কঠোর লকডাউনে থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদটা ভালো কাটবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ঈদের সরকারি ছুটি শুরু না হলেও ফাঁকা হতে শুরু করেছে ব্যস্ত নগরী ঢাকা। তবে সরকারি ছুটির সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদেরও চাপ অনেক বাড়বে বলে জানিয়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা।

ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া লঞ্চগুলোয় স্বাস্থ্যবিধি ছিল চরম উপেক্ষিত। মাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্ব মানা দূরের কথা, লঞ্চ কর্তৃপক্ষকে প্রবেশ পথে হ্যান্ড স্যানিটাইজার স্প্রে করতেও দেখা যায়নি এদিন। তারা শুধু যাত্রী নিতে ব্যস্ত।

এছাড়া লঞ্চগুলোয় নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া ও অতিরিক্ত যাত্রী নিতে দেখা গেছে। তবে এ বিষয় মানতে রাজি না অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও লঞ্চ মালিকরা। তারা বলছেন, স্বাস্থ্যবিধি যথাযথ মেনেই লঞ্চ ছাড়া হচ্ছে। 

গতকাল সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ভোরবেলা যাত্রীদের ভিড় দেখা গেলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় কমে গেছে। ভোরে লঞ্চগুলোয় নির্দিষ্ট সংখ্যার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে সদরঘাট টার্মিনাল থেকে লঞ্চ ছেড়ে যেতে দেখা গেছে। লঞ্চের ভেতরে মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধির কোনো কিছুই।

এ বিষয়ে ঢাকা-চাঁদপুর-ঈদগাহ ফেরিঘাট রুটের ইমাম হাসান-৫ লঞ্চের পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ফয়েজ আহমেদ জানান, আমরা সরকারের নির্দেশ মতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখে লঞ্চ ছাড়ব। যাত্রীদের মাস্ক পরার জন্য বারবার হ্যান্ড মাইকে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু যাত্রীরা মানছে না। আমরা তাদের বলতে পারি। কিন্তু যাত্রীরা যদি নিজেদের ভালো নিজেরা না বোঝেন তাহলে আমাদের কিছু করার নেই। 

আপনার লঞ্চে প্রবেশ পথে কাউকে দেখলাম না হ্যান্ড স্যানিটাইজার স্প্রে করতে। এছাড়া যাত্রীরা ডেকে প্রায় গাঁ ঘেঁষে বসে আছেনÑএমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যাত্রীদের দূরত্ব বজায় রাখতে বললে বলে আমরা এক পরিবারের। এছাড়া লঞ্চের প্রবেশ মুখে আমাদের একজন স্যানিটাইচার স্প্রে করছে একই সঙ্গে তাপমাত্রাও মাপছে যাত্রীদের।

তিনি বলেন, সরকারের নির্দেশ মতো চেয়ারে এক সিট ফাঁকা রেখে যাত্রী বসানো হলেও আমরা বাড়তি ভাড়া নিচ্ছি না। সরকারের রেট অনুযায়ী ভাড়া ডেক ১৮৬ টাকা, আমরা নিচ্ছি ১৫০ টাকা।  আর চেয়ারের ভাড়া ২৮৮ টাকা, আমরা নিচ্ছি ২০০ টাকা। আরও দু’দিন পর থেকে শুরু হচ্ছে ঈদের ছুটি। আজ সন্ধ্যা থেকে হয়তো যাত্রীর চাপ আরও বাড়বে।

ভোলা রুটে চলাচলকারী গ্লোরি অব শ্রীনগর-৩-এর যাত্রী হাসান বলেন, ঈদের ভিড় এড়াতে দুদিন আগেই স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করতে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। স্বাস্থ্যবিধি মানা জরুরি কিন্তু লঞ্চে মানাটা আসলেই অনেক কঠিন কাজ। ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা লঞ্চে চুপ করে বসে থাকা যায় না। লঞ্চ কর্তৃপক্ষ বারবার মাইকিং করছে স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য কিন্তু এতে কোনো লাভ হয় না।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিজীবী সাইফুল ইসলাম সকাল থেকেই সদরঘাট টার্মিনালে এসে বসে আছেন হাতিয়ায় যাওয়ার জন্য। তাকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বলেন, কী করবো ভাই ডাবল ভাড়া দিয়ে কেবিন নিয়েছি। যদি সেটা হাত ছাড়া হয়ে যায় সে জন্য আগে এসে বসে আছি। হাতিয়ার লঞ্চগুলোয় ডিলাক্স কেবিনের ভাড়া এক হাজার ১০০ টাকা। সেখানে আমাকে দিতে হয়েছে আড়াই হাজার টাকা। 

বরগুনার যাত্রী মাহমুদ আলম বলেন, বরিশালে যাব ভাই। তিনদিন ধরে কেবিনের টিকিটের জন্য ঘুরছি কিন্তু পেলাম না। অবশেষে চেয়ারের টিকিট পেয়েছি এমভি পূবালী-১-এর, তাও প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া দিতে হয়েছে। 

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের ট্রাফিক বিভাগ থেকে জানান, শনিবার ভোড় ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২৭টি লঞ্চ দেশের বিভিন্ন রুটে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে ছেড়ে গেছে। এ সময় সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে এসেছে ৫০টি লঞ্চ। ঈদের জন্য অন্যান্য সময়ের তুলনায় এখন লঞ্চ একটু বেশি যাওয়া-আসা করছে। আগে যেখানে স্বাভাবিক সময়ে ৮৫টি লঞ্চ ছেড়ে যেত এখন সেখানে ১০২টি লঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছে। 

বিভাগ থেকে জানানো হয়, এ বছর লঞ্চের যাত্রী অন্যান্য বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কম। তবে গার্মেন্টস ছুটি হলে আগামী সোম ও মঙ্গলবার একটা চাপ পড়বে। এছাড়া স্বাস্থ্য বিধি মানাতে পর্যাপ্ত নৌ-ট্রাফিক পুলিশ পন্টুনে মনিটর করছে।

এদিকে ঈদ উপলক্ষে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে যাওয়ার সেই চিরচেনা ভিড় নেই রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে। অনলাইনে টিকিট বিক্রি করায় কাউন্টারগুলোয় নেই টিকিটপ্রত্যাশীদের কোনো লাইন। শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিতে ট্রেনগুলোর আসন সংখ্যার অর্ধেক টিকিট ইস্যু করায় স্টেশনে যাত্রীদের কোনো চাপ নেই।

লকডাউন শিথিল হওয়ার পর গত বুধবার সকাল থেকে শুধু অনলাইন ও অ্যাপের মাধ্যমে ঈদযাত্রার অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করেছে রেলওয়ে। ফলে যাত্রীদের কাউন্টারে লাইনে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই। গতকাল স্টেশনে দেখা গেল কাউন্টারগুলো ফাঁকা।

স্টেশন ম্যানেজার মোহাম্মদ মাসুদ সারওয়ার জানান, কাউন্টারে টিকিট বিক্রি হওয়া মানুষের ভিড় কমেছে। শুরুতে দুদিন টিকিটের জন্য কেউ কেউ এলেও এখন আর সেই ভিড় নেই। রেলওয়ে জানিয়েছে, লকডাউন শিথিল হওয়ায় ৩৮টি আন্তঃনগর এবং ১৯টি মেইল ও কমিউটার ট্রেন চলবে। যদিও স্বাভাবিক সময়ে ১০২টি আন্তঃনগর ট্রেন এবং ২৬০টি লোকাল, কমিউটার ট্রেন ও মালবাহী ট্রেন চলাচল করে। রেল স্টেশনে দেখা গেছে, মানুষজনের ভিড় এড়াতে মাইকিং করছেন রেলকর্মীরা। মাস্ক ছাড়া কাউকে স্টেশনে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। মানুষজনের জটলা হলেই সরিয়ে দেয়া হচ্ছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..