মত-বিশ্লেষণ

কভিড পরিস্থিতি বিবেচনায় চাকরিতে প্রবেশসীমা বাড়ানো উচিত

মো. রায়হান আলী: চেনা পৃথিবী যেন করোনার প্রাদুর্ভাবে প্রায় অচেনা হয়ে গেছে। সবকিছু যেন থমকে গেছে। স্বাভাবিক গতিশীল কার্যক্রম যেন নিথর, নিষ্প্রাণ ও স্থবির হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইচ্ছা থাকলেও স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানো সম্ভব হচ্ছে না। কবে করোনার দাপট কমবে, তার উত্তর কারও জানা নেই। থমকে যাওয়া পৃথিবীর মানুষের জীবন-জীবিকার কথা মাথায় রেখেই সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে অঞ্চলভিত্তিক চলছে কিছু স্বাভাবিক কার্যক্রম। আমাদের দেশেও তেমনটা চলছে। কভিডে আমরা অনেক কিছু হারিয়েছি, যা ফেরত পাওয়ার নয়। আবার অনেক কিছুই শিখেছি, যা আগে কোনোদিন শিখিনি। তাই প্রচলিত বিধিবদ্ধ আইনের ছকে বা সীমাবদ্ধতার নিয়মে সবকিছু করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় করা সম্ভবপর হচ্ছে না। পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাভাবিক নিয়মের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় বিকল্প পথে দেশের সার্বিক উন্নয়নের চিন্তা সরকারের। এরই মধ্যে এসব কাজের শুরু হয়েছে এবং ফলও পাচ্ছে জনগণ।

কভিড পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অটো পাসের সুযোগ করে দিয়েছে। দেশের জনগণের কথা চিন্তা করে ভার্চুয়ালি মামলার জরুরি বিষয়গুলোও নিষ্পত্তি করছে। দেশের সরকারি অফিস-আদালতগুলোয় ইন্টারনেটের মাধ্যমে জনগণের সেবার সুদূরপ্রসারী ব্যবস্থা করেছে। সেজন্য আসলেই সরকার সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। দেশে বেকার ও শিক্ষিত বেকার দূরীকরণে নিরলসভাবে কাজ করা হচ্ছে। শিক্ষিত বেকারদের দুরবস্থার কথা চিন্তা করা সরকারের আরও পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন। করোনাকালে দেশের অফিস-আদালতগুলোয় জরুরি বিবেচনায় কিছু কার্যক্রম চলছে। কিন্তু জনবল নিয়োগের কাজ প্রায় বন্ধই বলা চলে। কোনো অভিভাবকের প্রধান লক্ষ্য থাকে সন্তানকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরিতে সহায়তা করা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো গত বছর কভিডের প্রকোপ শুরু হওয়া থেকে কত যে শিক্ষিত ও মেধাবী ছেলেমেয়েদের চাকরির নির্ধারিত বয়স চলে গেছে তার ইয়ত্তা নেই। করোনায় বাংলাদেশের চাকরিপ্রার্থীরা বিপাকে পড়েছেন। কারণ নিয়োগ পরীক্ষা না হওয়ায় চাকরি প্রার্থীরা বয়স হারাচ্ছেন। আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা না হওয়ায় তাদের বয়সও বেড়ে যাচ্ছে। এই করোনার সময় কমপক্ষে দুই লাখ চাকারি প্রার্থী তাদের চাকরির বয়স হারিয়েছেন। দেশে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবি আজকের নয়, অনেক দিনের। কভিডকালে সেটা আরও জোরালো হয়েছে। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ সাধারণ বয়সসীমা ৩০ বছর। মুক্তিযোদ্ধা, চিকিৎসক আর বিশেষ কোটার ক্ষেত্রে এই বয়সসীমা ৩২ বছর। সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানেও একই বয়সসীমা অনুসরণ করা হয়। আর চাকরি থেকে অবসরের সাধারণ বয়সসীমা ৫৯ বছর। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে তা ৬০ বছর। বিচারকদের ক্ষেত্রে ৬২ বছরের নির্দেশ আছে আদালতের, তবে তা কার্যকর হয়নি। বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের দেশ। জনসংখ্যার ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী ৬৮ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু এখন ৭৩ বছর। তবে নারীদের গড় আয়ু ৭৫ বছর, পুরুষের ৭১ বছর। সরকারি চাকরিতে পদ খালি আছে তিন লাখ ১৩ হাজার ৮৪৮টি। সরকারি চাকরিতে কর্মরত আছেন ১২ লাখ ১৭ হাজার ৬২ জন। বাংলাদেশে প্রতিবছর ২০ লাখের মতো নাগরিক চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন। সরকারি নয়, এখন বেসরকারি খাতই হচ্ছে চাকরির বড় ক্ষেত্র।

চাকরির বাজার পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যে পরিমাণ শিক্ষিত বেকার আমাদের দেশে, সে পরিমাণ সরকারি-বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মখালি নেই। ঘনবসতির দেশে লোকসংখ্যার তুলনায় কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষিত বেকারের তুলনায় চাকরির ক্ষেত্রে কর্মের সংস্থান না থাকায় দিন দিন বেকারত্বের হার বেড়েই চলছে। অন্যান্য দেশে যেভাবে কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা ও উদ্যোক্তা রয়েছে, সে তুলনায় আমাদের দেশ বেশ পিছিয়ে। ২০২০ সালের ৩০ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে সফল আত্মকর্মী ও যুব সংগঠনের মাঝে ‘জাতীয় যুব পুরস্কার, ২০১৯’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী যুবসমাজকে ‘চাকরি করব না, চাকরি দেব’এই চিন্তা করার পরামর্শ দেন। ওই অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, আজ যে ২৭ যুবককে পুরস্কার দিলাম, তারা সবাই অনেকের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। এভাবে যুবকরা আত্মকর্মী হলে আগামীতে বাংলাদেশে কেউ বেকার থাকবে না। যুবকরাই হবে বাংলাদেশের কর্ণধার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সের অধ্যাপক ড. একেএম নুরুন্নবী বলেন, বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের যুগে প্রবেশ করেছে। ৬৮ শতাংশ মানুষ এখন কর্মক্ষম। এই সুবিধা আমাদের নিতে হবে, কারণ এই সময়টি থাকবে না। ২০৫০ সালে প্রতি পাঁচজনে একজন হবেন বৃদ্ধ। কাজ করতে সক্ষম নয়, এমন মানুষের সংখ্যা বাড়বে। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। তিনি মনে করেন, একটা দিক হলো তরুণ যে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী তাদের কাজে লাগানো। আবার গড় আয়ু বাড়ার ফলে বয়স্ক কর্মক্ষম মানুষও বাড়ছে। এই দুই শ্রেণিকে কাজে লাগাতে চাকরিতে প্রবেশের বয়স যেমন বাড়ানো দরকার, তেমনি অবসরের বয়সও বাড়ানো দরকার।’ বিশ্বের অন্তত আটটি দেশে এখন চাকরি থেকে অবসরের সর্বোচ্চ বয়স ৬৭ বছর। ৭০ বছর বয়সে অবসর দেয়া হয়, এমন দেশও আছে। করোনায় বাংলাদেশের চাকরিপ্রার্থীরা বিপাকে পড়েছেন। কারণ নিয়োগ পরীক্ষা না হওয়ায় চাকরি প্রার্থীরা বয়স হারাচ্ছেন। আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা না হওয়ায় তাদের বয়সও বেড়ে যাচ্ছে। এই করোনার সময় কমপক্ষে দুই লাখ চাকরিপ্রার্থী তাদের চাকরির বয়স হারিয়েছেন। আর সাধারণভাবে বাংলাদেশে প্রতি বছর যে ২০ লাখ মানুষ চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন, তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৬ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়, চার লাখ মানুষ বেকার থাকেন। আর এই বেকারদের অধিকাংশই উচ্চশিক্ষিত। এরকম বেকার কয়েকজন উচ্চশিক্ষিত মানুষের কথা হলো, চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ালে তাদের চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। আর গড় আয়ু যেহেতু বাড়বে, তাই প্রবেশের সময়সীমাও বাড়ানো উচিত। বিশেষ করে এই করোনায় চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানো খুব জরুরি। মেধাবী চাকরিপ্রার্থীরা করোনার প্যান্ডেমিক পরিস্থিতির কারণে জীবনের স্বপ্ন থেকে ছিটকে যাবে, তা হতে পারে না। সঠিক মেধাকে কাজে লাগিয়ে তা সম্পদে পরিণত করতে হবে। একজন শিক্ষার্থীর লেখাপড়া শেষ করতে ২৭-২৮ বছরও বয়স হয়ে যায়। চাকরির প্রতিযোগিতার মাঠে সামান্য কয়েক বছর হাতে থাকে, তা যথেষ্ট নয়। এমন পরিস্থিতিতে যদি কভিডকালীন অবস্থা বিবেচনায় নিয়োগ পরীক্ষা না হওয়ায় চাকরিপ্রার্থীদের অকালে চাকরিতে প্রবেশের বয়স শেষ হয়ে যায়, তাহলে সেটা নির্ঘাত কষ্টদায়ক হবে। এমন ক্ষতি যদি হয়েই যায়, তাহলে এ ক্ষতির দায়ভার কে নেবে? নিশ্চয় অভিভাবক রাষ্ট্রকেই তাদের সমস্যার সমাধান দিতে হবে। তাই উদ্ভূত সমস্যা নিরসনে সার্বিক দিক বিবেচনা করে বর্তমান চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়িয়ে মেধাবীদের চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ দেয়া এখন সময়ের দাবি।

মো. রায়হান আলী

শিক্ষানবিশ আইনজীবীজজ কোর্ট, খুলনা

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..