Print Date & Time : 23 May 2022 Monday 2:44 am

কমছে নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার পরিমাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিদায়ী বছরে ২০১৬ সালের তুলনায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার পরিমাণ কমেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্যমতে,  ২০১৭ সালে ২৯১টি কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এর মধ্যে ১৮৫টি কোম্পানি দুই থেকে ৭৭৫ শতাংশ পর্যন্ত নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর আগের বছর ১৯১টি কোম্পানি তিন থেকে ৬৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল।

প্রসঙ্গত, পুঁজিবাজারে ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ অতিপরিচিত শব্দ। কোনো কোম্পানি তার মুনাফার যে অংশ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বিতরণ করে, সেটাই লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড। কখনও কখনও রিজার্ভ বা সংরক্ষিত তহবিল থেকেও লভ্যাংশ বিতরণ করা হয়। লভ্যাংশ নগদ টাকা ও স্টক বা বোনাস (শেয়ার) অথবা উভয় আকারে হতে পারে।

এদিকে ২০১৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১৪২টি কোম্পানি বোনাস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন বৃদ্ধি করেছে। যার পরিমাণ দুই হাজার ৮০৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। আর এর জন্য কোম্পানিগুলোকে ২৭৯ কোটি ২৯ লাখ বোনাস শেয়ার ইস্যু করতে হয়েছে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার হার বাড়লে এটা সার্বিক বাজার পরিস্থিতির জন্য ভালো। নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার মানে হলো কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা বাড়ছে, তাদের আয়ও হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বোনাস লভ্যাংশ দেওয়ার প্রধান কারণ হলো কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণ করা। এটা সারা বিশ্বে প্রচলিত। কিন্তু আমাদের দেশে বোনাস লভ্যাংশ দেওয়ার অর্থ হলো বেশিরভাগ কোম্পানির নগদ দেওয়ার ক্ষমতা নেই। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। একপর্যায়ে শেয়ারের দর পড়ে যায়।’

ডিএসইর তথ্যমতে, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে ব্যাংক খাতের ১৭টি, আর্থিক খাতের ১০টি, প্রকৌশল খাতের ২২টি, খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের পাঁচটি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের পাঁচটি, পাট খাতের একটি, বস্ত্র খাতের ২৪টি, ওষুধ ও রসায়ন খাতের ১২টি, সেবা ও আবাসন খাতের দুটি, সিমেন্ট খাতের একটি, আইটি খাতের চারটি, ট্যানারি খাতের দুটি, সিরামিক খাতের তিনটি, বিমা খাতের ২৫টি এবং বিবিধ খাতের সাতটি কোম্পানি রয়েছে।

২০১৬ সালে মোট ১২৬টি কোম্পানি পুঁজিবাজারে বোনাস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন বাড়িয়েছিল। ওই বছরে দুই হাজার ৫০৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূলধন বৃদ্ধি করে। এর জন্য ২৫০ কোটি ৮০ লাখ বোনাস শেয়ার ইস্যু করতে হয়। সেই হিসাবে গত বছরের তুলনায় ১৬ কোম্পানি নতুন যুক্ত হয়েছে বোনাস শেয়ার ইস্যু করার তালিকায়। তাতে মূলধন বেড়েছে ২৯৯ কোটি ১৬ লাখ টাকা।

জানা গেছে, বিএসইসি তালিকাভুক্ত কোম্পানির সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের করপোরেট গভর্ন্যান্স গাইডলাইন (সিজিজি) সংশোধন করছে, যা জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে। এতে কোম্পানি অন্তর্র্বর্তীকালীন সময়ের জন্য কোনো স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা দিতে পারবে না বলে প্রস্তাব করেছে।

এদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সবশেষ প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ২২৬টি কোম্পানি এজিএম করেছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ১৫০টি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। এর মধ্যে ১২১টি কোম্পানি ১০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দেয়। আর ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দিয়েছে বাকি ২৯টি কোম্পানি।

এর আগের বছর বিএসইসির বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এজিএম করা তালিকাভুক্ত ২৬২ কোম্পানির মধ্যে নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে ১৬৮টি কোম্পানি। এর মধ্যে ১০ শতাংশের বেশি নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে ১৩৯টি কোম্পানি। অন্যদিকে এর চেয়ে কম নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে ২৯টি কোম্পানি। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির দেওয়া গত দুই অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের ব্যবধানে শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ প্রদান করা কোম্পানির সংখ্যা কমেছে।

সিকিউরিটিজ আইনের বিধানুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি ১০ শতাংশের কম ও ৫ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দিলে ‘এ’ থেকে ‘বি’ ক্যাটেগরিতে লেনদেন হয়। যদি পাঁচ শতাংশেরও কম কোনো ধরনের লভ্যাংশ প্রদান করে তাহলে স্টক এক্সচেঞ্জের ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে কোম্পানিটির লেনদেন পরিচালিত হয়।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর স্টক (বোনাস) লভ্যাংশ দেওয়ায় বিনিয়োগকারীরা সাময়িকভাবে উপকৃত হলেও দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হন। আর এতে উদ্যোক্তা-পরিচালকরা লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।

এছাড়া স্টক ডিভিডেন্ডের কারণে প্রতিবছরই শেয়ারের পরিমাণ বাড়লেও কোম্পানির মুনাফা আনুপাতিক হারে বাড়ছে না। এতে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) কমার পাশাপাশি কমছে ডিভিডেন্ডের পরিমাণ কমে। ফলে শেয়ারদরে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ইপিএস কমায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও একসময় শেয়ারে অনাগ্রহ দেখায়। এতে কখনও কখনও লেনদেনে শেয়ারদরে ভাটা পড়ে।

তারা বলছেন, একটি কোম্পানি যখন ব্যবসা সম্প্রসারণ ছাড়াই শুধু বোনাস ডিভিডেন্ড দিতে থাকে তখন সেগুলোয় বিনিয়োগ না করাই ভালো। তার ওপর যদি পরিচালকদের  বোনাস বিক্রির ঘোষণা থাকে তাহলে তো কোম্পানির শেয়ারে আরও নেতিবাচক অবস্থা সৃষ্টি হয়। শেয়ারহোল্ডারদের নগদ লভ্যাংশ দেওয়া ভালো। তবে স্বাভাবিকভাবেই বেশি লভ্যাংশ শেয়ারহোল্ডাররা ইতিবাচক হিসেবে দেখেন। তবে বেশি নগদ লভ্যাংশ দিলে পরে বেশি আয় করা সম্ভব হয় না। কোম্পানিকে দীর্ঘ মেয়াদে সুসংহত করতে লভ্যাংশ প্রদানে মাঝামাঝি পন্থা অবলম্বন করাই মঙ্গলজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।