শেষ পাতা

কমছে বিনিয়োগ, মন্দার কবলে পুঁজিবাজার ছাড়ছেন বিদেশিরা

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ

দীর্ঘদিন হলো পুঁজিবাজারে মন্দা পরিস্থিতি কাটছে না। ফলে বাজার ভালো হবেÑএমন প্রত্যাশায় যারা এতদিন অপেক্ষায় ছিলেন, লোকসান দিয়ে হলেও এখন তারা পুঁজি তুলে নিচ্ছেন। বর্তমানে সাধারণ বিনিয়োগকারীর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদেরও পুঁজি তুলে নিতে দেখা যাচ্ছে। বসে নেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও। গত মার্চ থেকে তাদের বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। যদিও শেয়ার বিক্রির চাপে লেনদেন বাড়তে দেখা গেছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, আগের সাত মাসের মতো অক্টোবরেও বিদেশিরা পুঁজিবাজার থেকে যে পরিমাণ শেয়ার কিনেছেন, তার থেকে বিক্রি করেছেন বেশি। এ নিয়ে টানা আট মাস বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনা থেকে বেশি বিক্রি করলেন। পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এর আগে কখনও টানা আট মাস বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এমন আচরণ দেখা যায়নি।

গত আট মাসে বিদেশিরা দুই হাজার ২২৩ কোটি টাকার শেয়ার ও ইউনিট কিনেছেন। এর বিপরীতে বিক্রি করেছেন তিন হাজার এক কোটি টাকার। অর্থাৎ, কেনার চেয়ে ৭৭৮ কোটি টাকার শেয়ার ও ইউনিট বেশি বিক্রি করেছেন তারা।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনাবেচা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) হালনাগাদ তথ্য পর্যালোচনার পর এ চিত্র পাওয়া গেছে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, অক্টোবরে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ২৩১ কোটি ৯৯ লাখ ৭২ হাজার ১০২ টাকার শেয়ার কিনেছেন। এর বিপরীতে ৩২৮ কোটি ৯২ লাখ ৫৬ হাজার ৩৮৪ টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। সে হিসাবে এ সময়ে ৯৬ কোটি ৯২ লাখ ৮৪ হাজার ২৮২ টাকার শেয়ার বেশি বিক্রি করেছেন বিদেশিরা।

অক্টোবরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওতে মোট ৫৬০ কোটি ৯২ লাখ ২৮ হাজার ৪৮৬ টাকার লেনদেন হয়েছে। এর আগের মাসে লেনদেন ছিল ৫৭৫ কোটি ৯৩ লাখ ২৬৮ টাকা। সে হিসাবে বিদেশি পোর্টফোলিওতে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ১৫ কোটি ৭১ হাজার ৭৮২ টাকা।

এদিকে সেপ্টেম্বরে বিদেশিরা ডিএসইর মাধ্যমে ২৫৭ কোটি ৭৮ লাখ ৭১ হাজার ৪৮০ টাকার শেয়ার কেনেন। এর বিপরীতে বিক্রি করেছেন ৩১৮ কোটি ১৪ লাখ ২৮ হাজার ৭৮৮ টাকার শেয়ার। ওই সময় তারা ৬০ কোটি ৩৫ লাখ ৫৭ হাজার ৩০৮ টাকার শেয়ার বেশি বিক্রি করেছেন।

এর আগে আগস্টে বিদেশিরা ১৭৬ কোটি ৭৮ লাখ তিন হাজার ৪০৮ টাকার শেয়ার কেনেন। এর বিপরীতে বিক্রি করেছেন ২৭৯ কোটি ৩১ লাখ ৮৪ হাজার ৯১১ টাকার শেয়ার। ফলে আগস্টে ১০২ কোটি ৫৩ লাখ ৮১ হাজার ৫০৩ টাকার শেয়ার বিক্রি বেশি করেছেন বিদেশিরা। তার আগের মাস, অর্থাৎ জুলাইয়ে বিদেশিরা ৩০৯ কোটি ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার ৮৩৯ টাকার শেয়ার কেনেন। এর বিপরীতে বিক্রি করেছেন ৪৭৪ কোটি তিন লাখ ৪৬ হাজার ১৮ টাকার শেয়ার। ফলে জুলাইয়ে ১৬৪ কোটি ৬৭ লাখ আট হাজার ১৭৯ টাকার শেয়ার বিক্রি বেশি করেছেন বিদেশিরা।

একইভাবে এপ্রিলে ১৫৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, মে মাসে ৬৫ কোটি ১৭ লাখ ও জুনে ১০ কোটি ৫২ লাখ টাকার বিনিয়োগ তুলে নেন বিদেশিরা। মার্চেও তাদের একই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ওই মাসে বিদেশিদের মোট লেনদেন ছিল ৮৭৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে শেয়ার কেনা ছিল ৩৭৫ কোটি টাকা। আর বিক্রি করেছেন ৪৯৮ কোটি টাকার শেয়ার। এতে মার্চে তাদের নিট বিনিয়োগ প্রত্যাহার হয় ১২৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এ সময়ে বিক্রি বাড়িয়ে টানা বিনিয়োগ তুলে নিয়েছেন তারা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগ বাজারের গভীরতা বাড়ায়। এজন্য বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের ধরে রাখতে হলে পুঁজিবাজার স্থিতিশীল থাকা জরুরি। পাশাপাশি ভালো মানের কোম্পানি তালিকাভুক্তির বিকল্প নেই। বর্তমান বাজারে বিনিয়োগ নিরাপত্তা ইস্যুতে বিদেশি বিনিয়োগকারীর মধ্যে এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এ সংকট দূর করতে হবে। সেটা না হলে তাদের ধরে রাখা সম্ভব হবে না।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক রকিবুর রহমান বলেন, বিদেশিরা সব সময় ভালোমানের কোম্পানির শেয়ারের সঙ্গে থাকতে ভালোবাসেন। পাশাপাশি বাজারে স্থিতিশীল পরিবেশও থাকা জরুরি। কয়েক মাস ধরে বাজারের সার্বিক অবস্থা সন্তোষজনক নয়, যার প্রভাব পড়েছে বিদেশি বিনিয়োগে।

একই ধরনের মন্তব্য করেছেন পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ। তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা খুব হিসাবি। তারা মৌলভিত্তির কোম্পানি ছাড়া বিনিয়োগ করতে চান না। এজন্য দ্রুত ভালোমানের কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানো উচিত। কারণ, আমাদের পুঁজিবাজারে খুব ভালোমানের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক কম।

সর্বশেষ..