মত-বিশ্লেষণ

কমিউনিটি ক্লিনিকের সাফল্যগাথা

সাঈদা কামরুন নাহার: যন্ত্রণায় ছটফট করছে সন্তানসম্ভবা রহিমা। তার স্বামী মোবারক মিয়া কী করবেন, বুঝতে পারছিলেন না। রহিমার মা পার্শ্ববর্তী বাড়ির সেলিমের বউকে খবর দিলে তিনি ছুটে আসেন। সেলিমের বউ রহিমাকে পার্শ্ববর্তী কমিউনিটি ক্লিনিকে নিয়ে যেতে বলেন। তার পরামর্শ অনুযায়ী রহিমাকে নিকটস্থ কমিউনিটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। তার স্বামী সেখানে দায়িত্ব পালনরত কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) রহিমাকে পরীক্ষা করে জানান, এটি প্রসবব্যথা নয়, এটি গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা। এরপর তিনি রহিমাকে কিছু ওষুধ দিয়ে বাড়ি যেতে বলেন। সে ওষুধ খাওয়ার পর রহিমার ব্যথা কমে আসে।
আমাদের দেশে অসংখ্য নারী গর্ভকালীন বিভিন্ন ধরনের ব্যথাকে প্রসবব্যথা বলে মনে করলেও আসলে তা প্রসবব্যথা নয়। তা ফল্স পেইন। যেমনটি রহিমার বেলায় ঘটেছে। এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের পাশাপাশি কমিউনিটি ক্লিনিকেও স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও পুষ্টিসেবা দেওয়া হয়, যা আজ দেশের প্রায় সব মানুষই অবগত। মানুষকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া বা তাদের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমানে কমিউনিটি ক্লিনিক মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় যে উন্নতি সাধন করেছে, তাতে কমিউনিটি ক্লিনিকের বড় ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের এ কমিউনিটি ক্লিনিকের সাফল্যগাথা নিয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ‘কমিউনিটি ক্লিনিক হেলথ রেভুল্যুশন ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে পুস্তিকাও ছেপেছে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর যেসব গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল কমিউনিটি ক্লিনিক পুনরুজ্জীবিতকরণ প্রকল্প। এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পাঁচ বছরমেয়াদি ‘রিভাইটালাইজেশন অভ কমিউনিটি হেলথ কেয়ার ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় প্রাথমিকভাবে সারা দেশে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত ১৩ হাজার ৩৬৯টি নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৩২৬টি ক্লিনিক চালু রয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়। বর্তমানে প্রতিটি ক্লিনিক থেকে দৈনিক গড়ে ৪০-৪৫ জন গ্রামীণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নেয়।
কমিউনিটি ক্লিনিকে জরুরি বা মারাত্মক রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হয় না। কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) প্রতি কর্মদিবসে এতে সেবাদান করেন। তাছাড়া স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার কল্যাণ সহকারী প্রত্যেকে ন্যূনতম তিন দিন কমিউনিটি ক্লিনিকে উপস্থিত থেকে সেবাদান করেন। দেশের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় সেবা গ্রহণকারীদের বিনামূল্যে ৩০ ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়। শুক্রবার ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিন ছাড়া সপ্তাহে ছয় দিন (শনি থেকে বৃহস্পতিবার) সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা দেওয়া হয়।
অত্যাবশ্যকীয় সেবা প্রদানের প্রাথমিক স্তর হচ্ছে কমিউনিটি ক্লিনিক। এখানে গ্রামীণ মানুষের চাহিদা অনুযায়ী বিনামূল্যে স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও পুষ্টিসেবা দেওয়া হয়। এসব ক্লিনিকের নারীরা প্রসবপূর্ব (গর্ভকালীন), প্রসবকালীন ও প্রসব-উত্তর (প্রসবের পরবর্তী ৪২ দিন) অত্যাবশ্যকীয় সেবা প্রদান এবং কোনো জটিলতা দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব প্রসূতিকে জরুরি সেবাকেন্দ্রে পাঠানো হয়। সদ্য প্রসূতি মা (ছয় সপ্তাহের মধ্যে) এবং শিশুদের (বিশেষত মারাত্মক পুষ্টিহীন, দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়া ও হামে আক্রান্ত) ভিটামিন-‘এ’ ক্যাপসুল প্রদান করা হয় এ ক্লিনিগুলোয়। এছাড়াও নারী ও কিশোরীদের রক্তশূন্যতা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদানের পাশাপাশি তাদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ও পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ক্লিনিকগুলোয় শিশুদের প্রতিষেধক এবং ১৫-৪০ বছর বয়সী নারীদের ধনুষ্টংকারের টিকা দেওয়াসহ ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সন্দেহজনক এএফপি (হাত-পা বা যে কোনো অঙ্গ হঠাৎ অবশ হওয়া বা দুর্বল হওয়া) শনাক্ত করার পর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এ ক্লিনিকে নবজাতকের অত্যাবশ্যকীয় সেবাদানসহ আগ্রহী নারীদের আইইউডি স্থাপন, প্রথম ডোজ গর্ভনিরোধক ইনজেকশন প্রদান এবং জন্মনিরোধকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার চিকিৎসা ও পরামর্শ প্রদান করা হয়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে তিন হাজার ৫৮টি কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাভাবিক প্রসব পরিচালিত হচ্ছে এবং ২০০৯ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ৭৪ হাজার ৭১৬টি স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়াও উল্লিখিত সময়ে ৭৭ কোটির অধিক ভিজিটের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগণ সেবা গ্রহণ করেছে এবং এর মধ্যে তিন দশমিক ৫৪ কোটির অধিক জরুরি ও জটিল রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।
কমিউনিটি ক্লিনিকে অস্থায়ী পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি-সংক্রান্ত বিভিন্ন উপকরণ; যেমন: খাবার বড়ি, কনডম প্রভৃতি সার্বক্ষণিক সরবরাহ ও বিতরণ নিশ্চিত করা হয়। যারা কোনো কারণে বর্তমানে খাবার বড়ি বা অন্য কোনো কারণে পদ্ধতি গ্রহণ করছেন না, কিংবা যক্ষ্মা, কুষ্ঠ প্রভৃতি রোগের কারণে চিকিৎসাধীন রয়েছেন অথবা যারা ওষুধ সেবনের জন্য আসছেন না অথবা গর্ভবতী নারীরা প্রসবপূর্ব বা প্রসব-উত্তর সেবা গ্রহণ করেননি, তাদের খুঁজে বের করে পুনরায় চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা এ ক্লিনিকের কাজ। এর বাইরেও পারিবারিক পর্যায়ে শয্যাশায়ী রোগীদের যারা সেবা দেন, তাদের প্রশিক্ষণ ও বয়স্কদের সংগঠিত করে ব্যায়াম ও অন্যান্য আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা করা হয় এ ক্লিনিকগুলোয়। জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের (নিপোর্ট) জরিপে দেখা গেছে, বাড়ির পাশে কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ওষুধ আর পরামর্শ নিয়ে ৮০ শতাংশ মানুষ সন্তুষ্ট।
কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সেবাগ্রহীতাদের সেবা গ্রহণ সহজতর করতে সরকার প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে ইন্টারনেট সংযোগসহ একটি করে ল্যাপটপ সরবরাহ করেছে। ফলে সেবাগ্রহীতারা অনলাইনে বিভিন্ন রিপোর্ট ও তথ্য পেয়ে থাকেন। কমিউনিটি ক্লিনিক মূলত জনগণ ও সরকারের যৌথ প্রয়াসে বাস্তবায়িত একটি সমন্বিত কার্যক্রম।
কমিউনিটি ক্লিনিক বর্তমানে দেশের স্বাস্থ্যসেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে প্রতি ছয় হাজার জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আজ আর প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতে হয় না; কেননা ঘরের পাশেই আছে কমিউনিটি ক্লিনিক। রহিমার মতো নারীরাও এখন আর ভাবেন না। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কমিউনিটি ক্লিনিকেই তার সন্তান প্রসব করাবেন। আমরাও চাই রহিমার মতো দেশের হাজারো মা-বোন তাদের স্বাস্থ্যসেবা নিতে নিকটস্থ কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে নিশ্চিন্তে থাকুক। হাসিমুখে প্রশান্তি নিয়ে ঘরে ফিরে আসুক আবার।

পিআইডি নিবন্ধ

সর্বশেষ..