প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

কমে গেছে আলু রফতানি বিপাকে রংপুরের ব্যবসায়ীরা

 

হুমায়ুন কবীর মানিক, রংপুর: কয়েক বছর ধরে রংপুর থেকে নিয়মিত আলু রফতানি হওয়ায় ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে আলু উৎপাদনে। তবে এ বছর  আলু রফতানি  আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন আলু রফতানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। এদিকে আলুর চাহিদা কমে যাওয়ায় বর্তমানে কৃষক উৎপাদন খরচ তুলতে না পারার আতংকে দিন কাটাচ্ছেন। পাশাপাশি কৃষকের ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’য়ে পরিণত হয়েছে জেলার কোল্ডস্টোরেজের ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় তিনগুণ আলু সংরক্ষণ না করতে পারার চিন্তা। আলু রফতানির সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক প্রতিষ্ঠানের দাবি, সরকার আলু রফতানিতে যে শতকরা ২০ ভাগ ইনসেনটিভ দিয়েছিল, সেখান থেকে ১০ ভাগ কমিয়ে দেওয়াই আলু রফতানি হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ।

প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে রফতানির সুবিধার্থে শতাধিক ব্যবসায়ী রংপুর জেলার নবীগঞ্জ, মীরবাগ, কাউনিয়া, পাওটানা, হুলাসু, দেওতি, বড়দরগা, রঘু, মীরগঞ্জ মাহিগঞ্জ, সাহেবগঞ্জ, দমদমা, ঠাকুরবাড়ি, মিঠাপুকুর এবং বৈরীগঞ্জে গড়ে তোলেন অস্থায়ী প্রতিষ্ঠান। তারা কৃষকের কাছ থেকে আলু কিনে কমিশনে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মালিকানাধীন রফতানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আলু সরবরাহ করেন। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গ্রিনটেক, এগ্রোফ্রেশ এগ্রোনেস, কৃষাণ বোটানিক লিমিটেড, পিকে ইন্টারন্যাশনাল এবং এগ্রো কনসার্ন অন্যতম। ফ্রেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত রংপুরের উল্লিখিত পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ ট্রাক আলু শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই  ও সিঙ্গাপুরে রফতানির উদ্দেশ্যে শিপমেন্টের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরে প্রেরণ করতে ব্যস্ত সময় কাটান ব্যবসায়ীরা। ফলে আলুর ব্যাপক চাহিদা থাকায় কৃষকের উৎপাদিত উদ্বৃত্ত আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয়েছিল। কিন্তু এ বছর চিত্রটি ভিন্ন। ফেব্রুয়ারিতে আলু রফতানির উদ্দেশ্যে কৃষকের কাছ থেকে আলু সংগ্রহ শুরু হলেও তা আগের বছরের তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছে এবং জুনের আগেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো রংপুর থেকে আলু কেনা বন্ধ করে দেয় বলে জানা গেছে। ফলে অনেক ব্যবসায়ী অধিক লাভের আশায় আগাম আলু কিনে রফতানির উদ্দেশ্যে সরবরাহ করতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়েছেন। আবার বিভিন্ন পয়েন্টে কর্মরত প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক আকস্মিক কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঈদের আগে কর্মহীন হয়ে পড়েন। এদিকে চাহিদা না থাকায় গত বছরের চেয়ে কম দামে দিয়েও আলু বিক্রি করতে ব্যর্থ হয়েছেন চাষিরা।

কমিশন ব্যবসায়ী খাজা নাজিম উদ্দিন বলেন, কৃষকের কাছ থেকে গ্রানুলা আলু কিনেছেন ৯০ কেজির বস্তা ৬০০ টাকা থেকে সাড়ে ৬০০ টাকায়। ডায়মন্ড কিনেছেন ৯০ কেজির বস্তা সাড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। তিনি বলেন, গত বছর আলু রফতানি বেশি হওয়ায় কৃষকরাও ভালো দাম পেয়েছিলেন। গ্রানুলা আলু কেনা হয়েছে প্রতি বস্তা ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় এবং ডায়মন্ড কেনা হয়েছে প্রতি বস্তা ১২০০ থেকে সাড়ে ১২০০ টাকায়। গত বছর তিনি প্রায় ২০০ ট্রাক আলু রফতানির উদ্দেশ্যে সরবরাহ করেছিলেন। কিন্তু এ বছর চাহিদা না থাকায় তা অর্ধেকে নেমে এসেছে।

চাষি ফখরুদ্দিন বলেন, প্রতি বছর তিনি আলু রফতানির উদ্দেশ্যে গ্রানুলা ও ডায়মন্ড আলু বেশি করে আবাদ করেন। কিন্তু এ বছর রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো হঠাৎ করে আলু নেওয়া বন্ধ করে দেওয়ায় অবিক্রীত পাঁচ শতাধিক আলুর বস্তা নিয়ে বিপাকে আছেন। বর্তমানে আলুর যে দাম, তাতে আলু কোল্ডস্টোরেজ করে দাম পাওয়া যাবে কি-না, সে বিষয়ে সংশয় আছে। রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, রংপুর জেলায় ৫৪ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে আলু উৎপাদন হয়েছে ১৩ লাখ ৩৪ হাজার ২৬৯ মেট্রিক টন।

এদিকে রংপুর কৃষি বিপণন অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, রংপুর জেলায় কোল্ডস্টোরেজ আছে ৩৮টি। আলু ধারণক্ষমতা হচ্ছে চার লাখ ৩১ হাজার ৫২৭ মেট্রিক টন। এখন পর্যন্ত স্টোরেজে মজুত করা আলুর পরিমাণ হচ্ছে তিন লাখ ৪৩ হাজার ৬১২ মেট্রিক টন। ফলে উৎপাদিত আলুর অর্ধেকও স্টোরেজ সম্ভব নয়। জেলা মার্কেটিং কর্মকর্তা এএসএম হাসান সারোয়ার বলেন, রংপুরে আলুচাষিরা রফতানির উদ্দেশ্যে বেশি করে আলু চাষ করেন; কিন্তু কোনো কারণে আলু রফতানি কম হলে অবশ্যই চাষি উৎপাদিত আলু নিয়ে বিপাকে পড়বেন।

আলু রফতানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এগ্রোফ্রেশের স্বত্বাধিকারী আফরোজা আক্তার লিপি বলেন, মূলত সরকার আলু রফতানিতে যে ২০ ভাগ ইনসেনটিভ দিয়েছিল, এ বছর তা অর্ধেকে নেমে আনা হয়েছে। ফলে রফতানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান মালিকরা আলু রফতানি বন্ধ করে দিয়েছেন। এছাড়া তিনি অভিযোগ করেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পায়নি; অথচ ট্রাকভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ বছর ১৪ টনের আলুভর্তি ট্রাক রংপুর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে আনতে পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার টাকা বেশি লাগছে। গত বছর ট্রাক ভাড়া ছিল ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা। এ বছর ওই ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা। এ কারণেও আলু রফতানি কমে গেছে।