প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

কম্বল-চাদরের বৃহৎ সুতিকাগার

 

অনেকের কাছে ‘কম্বলের হাট’, আবার কারও কাছে ‘চাদর-কম্বলের হাট’ নামে পরিচিত শাঁওইল হাট। হাটবারে আশপাশের কম্বলপল্লি থেকে ভোর রাতে চলে আসে তাঁতিদের কাপড়। দুপুর না গড়াতেই বিক্রি শেষ হয়ে যায়। তাই দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা ক্রেতারা বিকিকিনি শেষে দিন থাকতেই রওনা দিতে পারেন নিজ গন্তব্যে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ওই সব কম্বলপল্লিতে অন্তত দুই হাজার তাঁত রয়েছে। সেখানে তাঁতিরা বছরজুড়ে যে কম্বল ও চাদর তৈরি করেন, তার অধিকাংশ বিক্রি হয় শীতকালে। তবে গরম কালেও বসে হাট। মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত উৎপাদিত শীতবস্ত্রগুলো মজুত করা হয় গ্রামের আড়তগুলোয়। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এ চার মাস হাটের ভরা মৌসুম। তখন চাহিদার কারণে কম্বল ও চাদরের উৎপাদন হয় কয়েকগুণ। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ হাজার নারী-পুরুষ সম্পৃক্ত রয়েছেন এখানে।

‘বেচাকেনা কম নয়। শীত মৌসুমে এখানকার প্রতি হাটে অন্তত দুই থেকে তিন কোটি টাকার শীতবস্ত্র কেনাবেচা হয়। সে হিসেবে মৌসুমের চার মাসে তা ৬০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়’ এমনই হিসাব দিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ইউনুছ আলী। তিনি আরও জানান, তাদের উৎপাদিত কম্বল ও চাদরগুলো সাধারণ মানুষের পাশাপাশি দুস্থদের মধ্যে শীতবস্ত্র হিসেবে বিতরণের জন্য কিনে নেয় এনজিও, ব্যাংক ও বিমা কোম্পানি।

কথা হয় নরসিংদীর বাবুরহাট থেকে আসা চাদরের পাইকারি ক্রেতা আবুল মিজানুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, চাদরগুলোর মান যেমন ভালো, দামও তুলনামূলক কম। সে কারণে তারা প্রতি হাটে কেনাকাটা করতে আসেন। নরসিংদীর বাবুরহাট থেকে দেশের অন্যান্য পাইকারি বাজারেও তা সরবরাহ করা হয়।

শীতবস্ত্রের মধ্যে চাদর, কম্বলের ভাগটাই বেশি এ হাটে। তবে গামছা, মাফলার, ওড়না, সোয়েটারের বিক্রিও হয়। দূরদূরান্ত থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে গ্রামের পথঘাট। ফেরি করা দোকান বসে পাঁচশর ওপরে। হাটের দিনগুলো তখন মেলার রূপ নেয়।

হাট ঘুরে চাদরের মান অনুযায়ী ১৫০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। চাদরের রয়েছে বহু পদ। ছেলে-মেয়ে, বয়স্ক, শিশু সবারই চাদর রয়েছে এখানে; তা বিক্রিও হয় মানভেদে। সরাসরি তাঁতিরাই বিক্রি করছেন বলে হাটে কম্বলের দাম অনেক কম। পুরোনো কাপড় থেকে তৈরি পাতলা কম্বলের দাম ১০০ টাকা থেকে শুরু। মাঝারি কম্বলের দাম ১৮০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। আর মোটা ও ভালো মানের কম্বল বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৩৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকায়।

তাঁতি ও বিক্রেতা লিয়াজ মিয়া বলেন, আমরা কাপড় বুনে এ বাজারে বিক্রি করি। তাই কম দাম পাই। ক্রেতারাও কম দামে কিনতে পারেন। তবে শহরের বাজারে এ কম্বলগুলো দ্বিগুণের বেশি দামে বিক্রি হয়।

পাশের ছাতিয়ান গ্রাম থেকে আসা এক বিক্রেতা বলেন, এখানের চাদর কক্সবাজারে ‘বার্মিজ চাদর’ নামে বিক্রি হয়। সেখানের ব্যবসায়ীরা আমাদের বার্মিজের ডিজাইন দেয়। আমরা সেটাই তৈরি করে দেই।

শাঁওইল বাজারের ব্যবসায়ী আবুল হাজী জানান, এখানকার তৈরি চাদর, কম্বল এবং গামছা অত্যন্ত উন্নতমানের হওয়ায় দেশ-বিদেশে চাহিদা রয়েছে। কোনো ধরনের প্রচার ও সরকারি-বেসরকারি সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়াই এখানে গড়ে উঠেছে বিশাল এ কর্মক্ষেত্র।

শাঁওইল হাট-বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহম্মেদ জানান, শীত মৌসুমে এখানকার হাটের দিন শীতের কাপড় কেনার ধুম পড়ে যায়।