প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

কম মূল্য দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি থিয়ানিস অ্যাপারেলসের

সাইদ সবুজ, চট্টগ্রাম: আমদানি নীতি আদেশ অনুযায়ী পোশাক (গার্মেন্ট পণ্য) রপ্তানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম মূল্য সংযোজন হার ২০ শতাংশ। অর্থাৎ রপ্তানির ক্ষেত্রে এর কম মূল্য সংযোজনের বিধান নেই, কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠান সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিতে এই হারে মূল্য সংযোজন করছে না। তারা নির্ধারিত শতাংশের অনেক কমে নিজেদের ইচ্ছামতো মূল্য সংযোজন করছে। এতে প্রতিবছর সরকার বৃহৎ অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে।

সম্প্রতি মেসার্স থিয়ানিস অ্যাপারেলস লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ন্যূনতম মূল্য সংযোজন থেকে কম মূল্য দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। শুধু তা-ই নয়, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বন্ডিং মেয়াদ-উত্তীর্ণ কাঁচামালের বিপরীতে রাজস্ব ফাঁকি, বন্ড সুবিধায় আমদানিকৃত পণ্য অবৈধ অপসারণসহ একাধিক মাধ্যমে ৬৭ কোটি ৮৪ লাখ ৪৭ হাজার টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে।

মেসার্স থিয়ানিস অ্যাপারেলস লিমিটেড চট্টগ্রাম সিইপিজেডের শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বন্ড সুবিধার আওতায় চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটে নিবন্ধিত। এতে প্রতিষ্ঠনটি লাইসেন্সি হিসেবে লাইসেন্সিং রুলস ও কাস্টমস আইন মোতাবেক যাবতীয় আমদানি-রপ্তানি ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের কাছে আইনানুগভাবে দায়বদ্ধ। ফলে ২০০৬ সালে নিবন্ধন পাওয়া প্রতিষ্ঠানটির ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বার্ষিক নিরীক্ষা অনিষ্পন্ন থাকায় চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেট সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির অনিষ্পন্ন নিরীক্ষা সম্পন্ন করে। এতে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন অসংগতি বেরিয়ে আসে। তাই এসব অসংগতির মধ্যে পাঁচটি কারণ উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে পাঁচটি কারণ দর্শানো নোটিস জারি করেছে চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেট। একই সঙ্গে পাঁচটি নোটিসের বিপরীতে ৬৭ কোটি ৮৪ লাখ ৪৭ হাজার টাকা আদায়ের দাবিনামা তোলা হয়েছে।

এসব নোটিসের মধ্যে একটিতে বলা হয়, আমদানি নীতি আদেশ ২০১৫-২০১৮-এর অনুচ্ছেদ ২৪-এর উপ-অনুচ্ছেদ (৯)-এর দফা (ই) বর্ণিত টেবিল অনুযায়ী গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম মূল্য সংযোজন হার কমপক্ষে ২০ শতাংশ হবে। কিন্তু আপনার প্রতিষ্ঠানের ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনিষ্পন্ন বার্ষিক নিরীক্ষা নিষ্পন্ন করে দেখা যায়, ২০১৮ সালে মূল্য সংযোজন হার সাত দশমিক ৮৬ শতাংশ, ২০১৯ সালে ঋণাত্মক ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ ও ২০২০ সালে মূল্য সংযোজন হার চার দশমিক ৫১ শতাংশ। এতে দেখা যায়, নির্ধারিত মূল্য থেকে ২০১৮ সালে ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ, ২০১৯ সালে ২৯ দশমিক ৫০ শতাংশ ও ২০২০ সালে ১৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ মূল্য সংযোজন হারের পার্থক্য রয়েছে। এতে ৩১ কোটি ৯২ লাখ ২৭ হাজার ৩২৫ টাকা সরকারের রাজস্ব ফাঁকি হয়েছে, যা বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

এছাড়া অন্য একটি নোটিসে বলা হয়, আপনার প্রতিষ্ঠানের নিরিক্ষণে দেখা যায়, ৩৫ হাজার ৪৮০ মিটার নাইলিং ফ্রেব্রিকস, যার মূল্য ২১ হাজার ২৮৮ মার্কিন ডলার এবং দুই হাজার ৭৩৬ মিটার

ফ্রেব্রিকস, যার মূল্য দুই হাজার ৮৭২ মার্কিন ডলার। তবে এসব কাঁচামালের বন্ডিং মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। মেয়াদ-উত্তীর্ণ এসব পণ্যের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ২১ কোটি ১৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, যার বিপরীতে সরকারী রাজস্ব আসে ১৩ কোটি ১৯ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৬ টাকা, যা আপনার প্রতিষ্ঠান ফাঁকি দিয়েছে।

অন্য এক নোটিসে দেখা যায়, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ইস্যু হলেও বেপজা থেকে ৬৯টি গেট পাস না নিয়ে ইপিজেডের অভ্যন্তরে প্রবেশ না করে অবৈধভাবে অপসারণের মাধ্যেমে পাঁচ কোটি ৩৬ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৭ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়েছে। ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, আপনার প্রতিষ্ঠান যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্যগুলো আমদানি করেছে, সেগুলো বেজার ওয়েবসাইট, অ্যাসাইকুড়া ওয়ার্ল্ড ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট চেক করে দেখা যায়, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স গ্রহণ করে বেপজার গেট পাস না নিয়ে ইপিজেডের অভ্যন্তরে প্রবেশ না করে আপনার প্রতিষ্ঠান ৬৯টি আইপি ব্যবহার করে পণ্যগুলো অপসারণ করেছে। এসব আপসারণকৃত পণ্যের মূল্য ছয় কোটি ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৭৪৪ টাকা, যার বিপরীতে প্রযোজ্য শুল্ক-কর পাঁচ কোটি ৩৬ লাখ ৯৪ হাজার ৭১৭ টাকা, যা আপনার প্রতিষ্ঠান ফাঁকি দিয়েছে।

আরেক নোটিসে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধায় আমদানিকৃত পণ্য অবৈধভাবে অপসারণ করে ১৭ কোটি ৩৫ লাখ ৭৮ হাজার ৩১৯ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিরীক্ষণে দেখা যায়, ছয় লাখ ৫১ হাজার ৯৩৭ কেজি ফেব্রিকস, যার মূল্য ৩৯ লাখ ৫২ হাজার ৭৩৫ মার্কিন ডলার এবং ৮৭ হাজার ৮৮৫ কেজি অ্যাকসেরিজ, যার মূল্য চার লাখ ৬৩ হাজার ৬৫ মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য থাকার কথা; কিন্তু নিরীক্ষণ মেয়াদে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির মজুত পণ্য রয়েছে দুই লাখ ৯৮ হাজার ৮৯৪ কেজি ফেব্রিকস এবং ৮৬ হাজার ৬০৪ কেজি এক্সেসরিজ মজুত রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি ১৯ কোটি ২১ লাখ এক হাজার ৬৭৬ টাকা মূল্যের মজুদকৃত পণ্য অবৈধভাবে অপসারণ করেছে, যার বিপরীতে রাজস্ব ফাঁকি হয়েছে ১৭ কোটি ৩৫ লাখ ৭৮ হাজার ৩১৯ টাকা।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার একেএম মাহবুবুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, একাধিক মাধ্যমে চট্টগ্রাম সিইপিজেডের মেসার্স থিয়ানিস অ্যাপারেলস লিমিটেড বন্ডেড ওয়্যার হাউস লাইসেন্সিং বিধিমালা সরাসরি লঙ্ঘন করেছে, যা কামস্টম আইন মোতাবেক দণ্ডনীয় অপরাধ এবং লাইসেন্স বাতিলযোগ্য। ফলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রতিটি অপরাধের জন্য কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে লিখিত জবাবসহ রাজস্ব পরিশোধের জন্য বলা হয়েছে।