প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ নিয়ে বিলাসিতায় বাংলাদেশ!

ইসমাইল আলী: ২০২০ সালে উৎপাদন শুরু করে পায়রা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। গত বছর ডিসেম্বরে উৎপাদনে আসে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট। এর দ্বিতীয় ইউনিট ছাড়াও চলতি ও আগামী বছর আরও পাঁচটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন শুরু করবে। এ সাতটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় আট হাজার মেগাওয়াট।

পুরোদমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলে এ সাতটি কেন্দ্রের জন্য মাসে কয়লা লাগবে ২০ থেকে ২১ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ বছরে কয়লা লাগবে প্রায় আড়াই কোটি মেট্রিক টন, যার পুরোটাই আমদানি করতে হবে। প্রতি মেট্রিক টন কয়লার দাম ২০০ ডলার ধরলেও বছরে কয়লা আমদানি বাবদ ব্যয় হবে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) ডলার।

যদিও বছরে এত কয়লা আমদানির উদ্যোগকে বিলাসিতা বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া এত বিশাল পরিমাণ কয়লা আমদানি এবং সেগুলোর গুণগত মান নিশ্চিত করার সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। তাই কয়লা আমদানিতে আন্তর্জাতিক মানের বিশেষজ্ঞ নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।

গত ১৩ মার্চ বিদ্যুৎ ভবনে অনুষ্ঠিত পিডিবির বোর্ড সভায় এ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কয়লা বিশেষজ্ঞ তথা কোল এক্সপার্ট নিয়োগের জন্য টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) অনুমোদন করা হয় সভায়।

বৈঠকে জানানো হয়, বর্তমানে বেসরকারি খাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে রয়েছে তিনটি। এর মধ্যে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে পুরোদমে উৎপাদন শুরু করে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। এর উৎপাদন সক্ষমতা এক হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট। এছাড়া গত ডিসেম্বরে উৎপাদনে আসে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট, যার সক্ষমতা ৬১৭ মেগাওয়াট। আর চলতি বছর জানুয়ারিতে উৎপাদন শুরু করেছে বরিশাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র, যার সক্ষমতা ৩০৭ মেগাওয়াট। অর্থাৎ বর্তমানে বেসরকারি খাতে দুই হাজার ১৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কয়লা দিয়ে উৎপাদন করা সম্ভব।

এদিকে রামপালের দ্বিতীয় ইউনিটের আগামী সেপ্টেম্বরে উৎপাদন শুরুর কথা রয়েছে। ভারতের ঝাড়খণ্ডের এক হাজার ৪৬৬ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটি দুই দফায় চলতি বছর মার্চে ও জুনে উৎপাদন শুরু করবে। এছাড়া এসএস পাওয়ার উৎপাদন শুরু করবে আগামী সেপ্টেম্বরে, যার সক্ষমতা এক হাজার ২২৪ মেগাওয়াট।

মাতারবাড়ী এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটির দুটি ইউনিট চালু হবে যথাক্রমে আগামী বছর জানুয়ারি ও জুলাইয়ে। একইভাবে আগামী বছর মার্চ ও আগস্টে উৎপাদন শুরু করবে পটুয়াখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র, যার সক্ষমতা এক হাজার ২৪৭ মেগাওয়াট। সব মিলিয়ে আগামী বছর সেপ্টেম্বরের মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা দাঁড়াবে সাত হাজার ৯৫২ মেগাওয়াট।

বৈঠকে আরও জানানো হয়, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো হবে বেজ লোড পাওয়ার প্লান্ট। ফলে এগুলোর লোড ফ্যাক্টর হবে ৭০-৮০ শতাংশ। বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের হিট রেট অনুযায়ী চার হাজার ৬০০ থেকে পাঁচ হাজার কিলোক্যালরির কয়লা দরকার হবে। প্রতি টন কয়লার দাম ২০০ ডলার ধরলেও এক্ষেত্রে পিডিবির বছরে আর্থিক সংশ্লিষ্টতার পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। বর্তমান বিনিময় হারে (১ ডলার = ১০৭ টাকা) এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৫১ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা।

পিডিবি জানায়, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার মূল্য ক্যালেরিফিক ভ্যালুর তারতম্যের কারণেও ব্যাপক পরিবর্তন হয়। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় জাহাজ ভাড়াসহ অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনাপূর্বক বিভিন্ন বিকল্প, উৎস ও পদ্ধতির মধ্যে সর্বোত্তম পদ্ধতিতে কয়লা কেনার বিষয়ে সার্বক্ষণিক বিষয়ে পিডিবিকে পরামর্শ প্রদানের জন্য একজন আন্তর্জাতিক মানের ‘কোল এক্সপার্ট’ নিয়োগ করা প্রয়োজন।

‘কোল এক্সপার্ট’ নিয়োগের জন্য ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে পিডিবি। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে পিডিবির প্রধান প্রকৌশলী (প্রাইভেট জেনারেশন)। আর সদস্য সচিব করা হয়েছে পিডিবির কোল পাওয়ার জেনারেশন পরিদপ্তরের পরিচালককে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন পিডিবির অর্থ পরিদপ্তরের পরিচালক, আইপিপি সেল-১-এর পরিচালক, নকশা ও পরিদর্শন-১-এর পরিচালক এবং অর্থ পরিদপ্তরের অর্থ শাখার উপ-পরিচালক-২।

‘কোল এক্সপার্ট’ নিয়োগের টিওআরে বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে বিশেষজ্ঞকে এক বছরের জন্য নিয়োগ করা হবে। তবে প্রয়োজনে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হবে। ‘কোল এক্সপার্ট’ সরকারি, বেসরকারি ও যৌথ বিনিয়োগের আটটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আমদানির জন্য এর মূল্য, উৎস, গুণগত মান ও পরিমাণ প্রভৃতি বিবেচনায় পরামর্শ প্রদান করবে। কয়লার সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট নিরবচ্ছিন্ন রাখতে আদর্শ ও একক পদ্ধতি নিরূপণ করবে। এ ধরনের মোট ১০টি কার্যপরিধি নির্ধারণ করা হয়েছে পরামর্শকের জন্য।

জানতে চাইলে পিডিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে শেয়ার বিজকে বলেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তি সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করে কয়লার দাম ও গুণগত মান নিশ্চিত করা গেলে এসব কেন্দ্র থেকে লাভ করা সম্ভব। এজন্যই পরামর্শক নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

যদিও চাহিদা না থাকায় এ ধরনের বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদনে এলে অন্য কেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হবে বলে জানান ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, এমনিতেই চাহিদা না থাকায় বেশকিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। এর মধ্যে এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু নয়। এগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জও অনেক বেশি। আর বছরে শুধু কয়লা আমদানিতেই পাঁচ বিলিয়ন ডলার খরচ করার মতো সক্ষমতা বাংলাদেশের বর্তমানে আছে কি না, সেটাও প্রশ্নসাপেক্ষ। এছাড়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চললে তেলচালিত কেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হবে। এগুলো হলো অপরিকল্পিত উদ্যোগ ও বিনিয়োগের ফল।