দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বিদেশি ওষুধ

করোনায় লাগেজ পার্টির কার্যক্রম বন্ধ

আয়নাল হোসেন: নেত্রকোণা জেলার সদর উপজেলার কুরপাড় এলাকার গৃহবধূ জুলেখা খাতুন দীর্ঘদিন ধরে হাড়ের ক্ষয় রোগে ভুগছেন। চিকিৎসকরা তাকে নোভাটিস কোম্পানির অ্যাকলাস্টা (জেনেরিক জুলেড্রনিক এসিড) ইনজেকশন দেওয়ার পরামর্শ দেন। ওই ইনজেকশনটির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৩৩ হাজার ৮০০ টাকা। অথচ লাগেজপার্টি এই ওষুধটি বিক্রি করছে ২৬ হাজার টাকায়। যদিও দেশি কোম্পানির একই ওষুধ পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের ওষুধশিল্প আজ বহু দূর এগিয়ে গেছে। রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তবে এখনও জটিল অনেক রোগের ওষুধ দেশে তৈরি হচ্ছে না। এসব ওষুধ মূলত লাগেজপার্টির মাধ্যমে বিদেশ থেকে আমদানি হয়ে বাজারে বিক্রি হতো। বর্তমানে করোনাভাইরাসের কারণে বিদেশ গমন বন্ধ রয়েছে। ফলে লাগেজপার্টির ওষুধ আমদানিও বন্ধ হয়ে গেছে। একশ্রেণির অসাধু চিকিৎসক মোটা অঙ্কের কমিশনের লোভে ব্যবস্থাপত্রে আনরেজিস্টার্ড ওষুধ লিখছেন। এতে বিপাকে পড়েছেন অনেক রোগী। আর এই সুযোগে একশ্রেণির ব্যবসায়ী কামিয়ে নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের টাকা।

যদিও অনেক আনরেজিস্টার্ড ওষুধ লাগেজ পার্টির মাধ্যমে আমদানি হয়ে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এসব ওষুধের মান নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।

লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের জন্য ব্যবহৃত সোরানিব ২০০ মিলিগ্রামের ১০টি ট্যাবলেটের মূল্য আগে ছিল এক হাজার ৮০০ থেকে এক হাজার ৯০০ টাকা। সরবরাহ না থাকায় ১০টি ট্যাবলেট এখন তিন থেকে চার হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মৃগী রোগীদের জন্য ব্যবহৃত ১০টি সেনরিল ৫০০ মিলিগ্রামের ট্যাবলেটের মূল্য ছিল এক হাজার ৪৫০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। বর্তমানে তা চার থেকে পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মস্তিষ্কজনিত সমস্যার রোগীদের জন্য ব্যবহৃত প্রতি ১০টি ভিন্যাট ৪০০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেটের মূল্য ছিল দুই হাজার ৭০০ টাকা। বর্তমানে তা চার থেকে পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মস্তিষ্কজনিত সমস্যার রোগীদের জন্য ব্যবহৃত প্রতি ১০টি ২ পয়েন্ট ৫ মিলিগ্রাম ট্যাবলেটের মূল্য ছিল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। বর্তমানে তা এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লাগেজপার্টির মাধ্যমে আমদানি করা আরও অসংখ্য ওষুধের সরবরাহ সংকট চলছে দেশে। আর এসব ওষুধ অস্বাভাবিক দামে বিক্রি হচ্ছে বাজারে।

আলিফ-লাম-মিম মডেল ফার্মেসির বিক্রয় প্রতিনিধি সদানন্দ সাহা জানান, করোনাভাইরাসের কারণে লাগেজপার্টির ওষুধ আমদানি বন্ধ রয়েছে। এসব ওষুধ দেশের কোনো কোম্পানি তৈরি করছে না। আবার রেজিস্ট্রেশনও নেই। অথচ বাজারে এসব ওষুধের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে চিকিৎসক এসব ওষুধ রোগীর ব্যবস্থাপত্রে লিখছেন। আর রোগীরাও এসব ওষুধ কিনতে মরিয়া।

যেসব ওষুধের রেজিস্ট্রেশন দেশে নেই, তা ব্যবস্থাপত্রে দেওয়া উচিত নয় বলে মনে করছেন ওষুধবিদ্যা বিশেষজ্ঞরা। রোগীর স্বার্থে আনরেজিস্টার্ড ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে লেখা কিংবা তা ব্যবহারে প্রলুব্ধ করা যাবে না। এতে রোগীর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তারা মনে করছেন। এজন্য অপ্রয়োজনীয় রেজিস্ট্রেশন প্রশাসন দিচ্ছে না।

একশ্রেণির অসাধু চিকিৎসক মোটা অঙ্কের কমিশনের লোভে রেজিস্ট্রেশনবিহীন ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে লিখছেন। এসব চিকিৎসকের সনদ বাতিল করা উচিত বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরা ওষুধবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আ ব ম ফারুক। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, কোনো ওষুধ রেজিষ্ট্রেশন করার দরকার হলে ওষুধ নিয়ন্ত্রণ কমিটিতে একটি প্রস্তাব পাঠানো উচিত। ওই কমিটিতে বিশেষজ্ঞ ছাড়াও ওষুধ কোম্পানির ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকেন। ওষুধের গুণাগুণ ও সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে রেজিস্ট্রেশনের অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে বাংলাদেশে অনেক সহজেই একটি ওষুধের রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়। অথচ বিশ্বের অনেক দেশেই ওষুধ রেজিস্ট্রেশন সহজ নয়।

বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সাবেক পরিচালক জাকির হোসেন রনি শেয়ার বিজকে বলেন, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও র‌্যাবের কঠোর নজরদারির কারণে আনরেজিস্টার্ড বা লাগেজপার্টির ওষুধ বিক্রি অনেকটাই কমেছে। তবে এখনও বাজারে এসব ওষুধ বিক্রি হয়ে আসছে। তবে রোগীর স্বার্থে আনরেজিস্টার্ড ওষুধ আমদানিতে ওষুধ প্রশাসন অনাপত্তি দিয়ে থাকে। তবে এই প্রক্রিয়াটি সহজতর হলে রোগীরা উপকৃত হবে। তবে এসব ওষুধের মান অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। তবে লাগেজপার্টির মাধ্যমে আমদানিকৃত ইনজেকশন কোল্ড চেইন মানা সম্ভব হয় না। এসব ওষুধ ব্যবহার না করাই উচিত বলে তিনি মনে করছেন।  সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে চাইলে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, প্রেসক্রিপশন মেডিসিন কখনও লাগেজপার্টির মাধ্যমে বিক্রি হতে পারে না। যেসব ওষুধ লাগেজপার্টির মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে, সেগুলোর গুণাগুণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আর যেসব ওষুধ দেশে উৎপাদন করা হচ্ছে না, আবার কেউ রেজিস্ট্রেশনও করছে নাÑএসব ওষুধের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সুপারিশে প্রশাসন অনাপত্তি দিয়ে থাকে। তবে লাগেজপার্টির মাধ্যমে যেসব ওষুধ দেশে আসছে, সেগুলো রেজিস্ট্রেশন করার মতো যোগ্যতা সংশ্লিষ্ট উৎপাদনকারীদের নেই। ফলে তারা ভিন্ন পথে ওষুধ বাজারজাত করে আসছে। 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..