দিনের খবর পত্রিকা শেষ পাতা

করদাতা কোম্পানি বেড়েছে ৫৭ হাজার, রিটার্ন ৩৫%

কোম্পানি নিয়ে টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন

## চলতি বছরের এপ্রিলের মধ্যে সব কোম্পানি করের আওতায় চলে আসবে

## ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১ লাখ ৩৫ হাজার ৩৫২ কোম্পানি ই-টিআইএন নিয়েছে

## চলতি অর্থবছর রিটার্ন দাখিল প্রবৃদ্ধি ৩৫.২১%, ২০১৯-২০ অর্থবছর ছিল ০.৯১%

রহমত রহমান: দেশে বাড়ছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। বিশেষ করে লিমিটেড কোম্পানি। প্রতিষ্ঠান বাড়ে, কিন্তু ই-টিআইএন আর রিটার্ন বাড়ে না। করজালে থাকা প্রতিষ্ঠানও কর ফাঁকি দিতে জমা দেয় ভুয়া অডিট রিপোর্ট। সব লিমিটেড কোম্পানিকে করজালে আনতে আগস্ট মাসে টাস্কফোর্স গঠন করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

টাস্কফোর্স ই-টিআইএন নেয়া, রিটার্ন নিশ্চিত ও ভুয়া অডিট রিপোর্ট প্রতিরোধে কাজ করে। মাত্র ছয় মাসে টাস্কফোর্সের কার্যক্রমে ভালো ফল আসে। ৫৭ হাজারের বেশি নতুন করদাতা কোম্পানি করের আওতায় এসেছে, যা মোট কোম্পানির ৭০ শতাংশ। আগামী এপ্রিলের মধ্যে শতভাগ লিমিটেড কোম্পানি করের আওতায় চলে আসবে।

এছাড়া চলতি অর্থবছর কোম্পানির রিটার্ন বেড়েছে ৩৫ দশমিক ২১ শতাংশ, যেখানে ২০১৯-২০ অর্থবছর ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশ। আর এনবিআরের ইতিহাসে করদাতা কোম্পানির রিটার্ন ১ শতাংশের বেশি কখনও হয়নি। শুধু ই-টিআইএন আর রিটার্ন দাখিল নয়, চলতি অর্থবছর কোম্পানি আয়করের পরিমাণ বাড়বে ৫০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকা। আর আগামী অর্থবছর বাড়বে ২ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা। সম্প্রতি টাস্কফোর্স কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে, যাতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) হিসাবমতে, ২০২০ সালের জুলাই পর্যন্ত নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দুই লাখ ৪৫ হাজার ৬৫৫টি। এর মধ্যে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি তিন হাজার ৫৩২টি ও প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি এক লাখ ৭৫ হাজার ৯৩২টি। আর এনবিআরের হিসাবে, লিমিটেড কোম্পানি এক লাখ ৭৬ হাজার ৪০০। এর মধ্যে ই-টিআইএন রয়েছে ৭৬ হাজার ও রিটার্ন দেয় ৩৫ হাজার। ৯৮ হাজার ৪০০ লিমিটেড কোম্পানি টিআইএন নেয়নি, রিটার্ন দেয় না।

সূত্রমতে, এসব কোম্পানিকে ই-টিআইএন ও রিটার্ন নিশ্চিত করতে ২০২০ সালের ১৯ আগস্ট এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) পরিচালক মো. শব্বির আহমদকে টিম লিডার করে সাত সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। টাস্কফোর্স কমিটি সব কোম্পানির ই-টিআইএন নিবন্ধন, রিটার্ন দাখিল ও শতভাগ সঠিক অডিট রিপোর্ট নিশ্চিত বিষয়ে কাজ করেন।

এছাড়া ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরের সব কোম্পানি রিটার্ন, আরজেএসসি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান এবং যেসব কোম্পানি ই-টিআইএন থাকা সত্ত্বেও রিটার্ন দেয় না সেসব প্রতিষ্ঠান নিয়ে কাজ করেন। কমিটি ৩০টি কর অঞ্চলের ১৪৬টি কোম্পানি কর সার্কেল কোম্পানি করদাতাদের তথ্য যাচাই করে। অনলাইনে অডিট রিপোর্ট যাচাইয়ে ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম (ডিভিএস) নামে একটি সফটওয়্যার চালু করা হয়। এনবিআর ও আইসিএবি যৌথভাবে এ সফটওয়্যার চালু করে।

টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি অর্থবছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১ লাখ ৩৫ হাজার ৩৫২ কোম্পানি ই-টিআইএন নিয়েছে। যেখানে ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ছিল ৭৭ হাজার ৮১৭, ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ৭১ হাজার ১৯০, ২০১৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ৬৪ হাজার ৭৫৪, ২০১৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ৫৮ হাজার ৩৫ ও ২০১৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ছিল ৫২ হাজার ৪৮০টি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি অর্থবছর (১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) প্রায় ছয় মাসে কোম্পানি হিসেবে নতুন ই-টিআইএন নিয়েছে ৫৭ হাজার ৫৩৫টি। যেখানে ২০১৯-২০ অর্থবছর নিয়েছে ৬ হাজার ৬২৭, ২০১৮-১৯ অর্থবছর ৬ হাজার ৪৩৬, ২০১৭-১৮ অর্থবছর ৬ হাজার ৭১৯ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছর ৫ হাজার ৫৫৫। আরজেএসসি নিবন্ধিত কোম্পানির সংখ্যা ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪০০। এর মধ্যে ২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৪৫ শতাংশ অর্থাৎ ৭৮ হাজার ই-টিআইএনের আওতায় এসেছে। বাকি ৫৫ শতাংশ অর্থাৎ ৯৮ হাজার ৪০০ কোম্পানির কর আওতার বাইরে (টিআইএন নেই)। আর চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১ লাখ ৩৫ হাজার ৩৫২ কোম্পানি করের আওতায় (টিআইএন নিয়েছে) চলে এসেছে। চলতি বছরের এপ্রিলের মধ্যে শতভাগ কোম্পানি করের আওতায় চলে আসবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কয়েকটি কর অঞ্চল ৮০ শতাংশের বেশি নন কমপ্লায়েন্ট কোম্পানিকে করের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে কর অঞ্চল-১৫ ও কর অঞ্চল-১১ শতভাগ, কর অঞ্চল-৪, ঢাকা ৯৮ ভাগ, কর অঞ্চল-২, ঢাকা ৯৭ ভাগ, কর অঞ্চল-৯ ও কর অঞ্চল-৩, ঢাকা ৯৫ ভাগ, কর অঞ্চল-১০, ঢাকা ৯০ ভাগ, কর অঞ্চল-৭, ঢাকা ৭৮ ভাগ ও কর অঞ্চল-১২, ঢাকা ৭২ ভাগ।

কোম্পানি রিটার্ন দাখিল বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি অর্থবছর কোম্পানি রিটার্ন দাখিলের হার বেড়েছে (টাইম পিটিশনসহ) ৩৫ দশমিক ২১ শতাংশ। যেখানে বিদায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছর কোম্পানির রিটার্ন দাখিলের হার ছিল শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশ। শুধু তাই নয়, এনবিআরের ইতিহাসে কোম্পানির রিটার্ন দাখিলের প্রবৃদ্ধি থাকে ১ শতাংশ। তবে আগামী অর্থবছর থেকে কোম্পানি রিটার্ন দাখিলের হার দ্বিগুণ হয়ে যাবে বলে টাস্কফোর্স কর্মকর্তারা আশা করছেন।

প্রতিবেদনে অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর ছয় মাসে ঢাকায় কোম্পানি রিটার্ন দাখিল হয়েছে ৩০ হাজার ৮৯৪টি। যেখানে ২০১৯-২০ অর্থবছর দাখিল হয়েছে ২২ হাজার ৮৪৯টি ও ২০১৮-১৯ অর্থবছর ২২ হাজার ৬৪৪টি। রিটার্ন দাখিলের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে কর অঞ্চল-১২। এ কর অঞ্চলে কোম্পানির রিটার্ন দাখিল প্রবৃদ্ধি ৫০ দশমিক ৩ শতাংশ। এরপরে রয়েছে কর অঞ্চল-৪, ঢাকা ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ। এছাড়া কর অঞ্চল-১৪, ঢাকা ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ, কর অঞ্চল-১৫, ঢাকা ৪৩ দশমিক ১ শতাংশ, কর অঞ্চল-৫, ঢাকা ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ, কর অঞ্চল-৮, ঢাকা ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ, কর অঞ্চল-৭, ঢাকা ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ, কর অঞ্চল-১৩, ঢাকা ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ, কর অঞ্চল-১০, ঢাকা ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ ও কর অঞ্চল-২, ঢাকা ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সব কোম্পানি করের আওতায় এলে চলতি অর্থবছর আয়কর আহরণ বাড়বে ৫০০ থেকে এক হাজার কোটি টাকা। আর আগামী অর্থবছর কর আহরণ বাড়বে দুই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা। সেক্ষেত্রে কর আহরণ সক্ষমতা বাড়ানো, শনাক্তকারী কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা, আর্থিক শৃঙ্খলা আনয়ন, করপোরেট প্রশাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে কর্মকর্তারা মত দিয়েছেন। কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। যার মধ্যে রয়েছে করদাতা কোম্পানির ভুয়া অডিট রিপোর্ট বন্ধ করা।

এছাড়া অডিট রিপোর্টের ডিভি কোড নিশ্চিত করা। তবে সার্কেল অফিসাররা ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, অনেক কোম্পানি ডিভিসিবিহীন বহু অডিট রিপোর্ট দাখিল করেছে। এছাড়া আইসিএবিও একই অভিযোগ করেছে। তবে কর অফিসকে এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী, কোম্পানিকে কমপ্লায়েন্সের আওতায় আনতে পদক্ষেপ কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার মত দেয়া হয়।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..