প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

করপোরেট কর হ্রাস, বাড়তে পারে করমুক্ত আয়সীমা

বাজেট ২০২২-২৩

নিজস্ব প্রতিবেদক: বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দিতে আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছর বাজেটে কমতে পারে করপোরেট করহার। দুই থেকে আড়াই শতাংশ করপোরেট কর কমতে পারে। তবে ঢালাওভাবে নয়, কয়েকটি খাতে কমানো হতে পারে। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দিতে এ কর কমানো হচ্ছে। এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, করপোরেট কর কমলে রাজস্ব আদায় একদিকে বাড়বে, অন্যদিকে কমবে। প্রতিবছর এনবিআর করপোরেট কর হিসেবে পায় ২০ থেকে ২২ হাজার কোটি টাকা। আর ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনা আর বৈশ্বিক মন্দায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত। করপোরেট কিছুটা কমলে ব্যবসায়ীরা স্বস্তি পাবেন। অপরদিকে করমুক্ত আয়সীমা কিছুটা বাড়তে পারে। মূলত করের আওতা বাড়াতে সীমা বাড়াতে চায় এনবিআর। অর্থ মন্ত্রণালয় ও  জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সূত্রমতে, করপোরেট করের হার লিস্টেড ও নন-লিস্টেড কোম্পানির ক্ষেত্রে ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমানোর প্রস্তাবনা রয়েছে। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এনবিআরের বেশ কয়েকবার বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে ব্যবসায়ীদের দাবিগুলোকে গুরুত্ব-সহ বিবেচনা করা হয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়েছে। সেখানেও কমানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সে অনুযায়ী এনবিআর কাজ করছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

বর্তমানে করহার যথাক্রমে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ ও ৩০ শতাংশ রয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নন-লিস্টেড কোম্পানির ক্ষেত্রে করহার ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশ এবং লিস্টেড কোম্পানির জন্য তা ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

অপরদিকে চলতি বছর এনবিআরের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিসহ (ডিসিসিআই) ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলো করপোরেট করহার আবারও কমানোর প্রস্তাবনা দেয়। তারা লিস্টেড ও নন-লিস্টেড কোম্পানির ক্ষেত্রে ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব দেয়, যেটি বর্তমানে রয়েছে যথাক্রমে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ ও ৩০ শতাংশ। এছাড়া করপোরেট ডিভিডেন্ডের আয়ের ওপর বিদ্যমান ২০ শতাংশ করের পরিবর্তে ১০ শতাংশ কর নির্ধারণের আহŸান জানায় ডিসিসিআই। এছাড়া ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র পক্ষ থেকেও করপোরেট করহার কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

অপরদিকে করপোরেট কর কমিয়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন দেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদরা।

পিআরআইর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমাদের করপোরেট করহার প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এটি কমিয়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বর্তমানে দেশের করপোরেট করহার ৩০ শতাংশ। আর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ। অথচ চীন, ভারত, ভিয়েতনামসহ আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর করপোরেট করহার ক্ষেত্রবিশেষ ১৫ শতাংশেরও নিচে। তাই ব্যবসায়ীদের কর কমানোর দাবিকে যৌক্তিক দাবি বলে মনে করেন তিনি। পিডবিøউসির ম্যানেজিং পার্টনার মামুন রশিদ বলেন, আন্তর্জাতিক পরামর্শক সংস্থার কাছ থেকে ৪৩ দশমিক ৭ শতাংশ হারে কর নেয়া হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে আসার উৎসাহ পায় না। এই কর কমানো উচিত।

অপরদিকে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে আনতে করপোরেট করহার আরও কমানোর সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। এনবিআরের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় বিডার মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগে সবসময় পার্শ্ববর্তী এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর করপোরেট করহার বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। বাংলাদেশে উচ্চতর করহারের কারণে অনেক আগ্রহী বিনিয়োগকারীই পরে বিনিয়োগ না করে চলে যান। তাই নতুন বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে এই হার হ্রাস করা প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, বাংলাদেশে করপোরেট করহারের সঙ্গে অন্যান্য কর, যেমন অগ্রিম কর, উৎসে কর অন্তর্ভুক্ত করে সামগ্রিক কর প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশে উন্নীত হয়ে যায়, অথচ কিন্তু বৈশ্বিক করপোরেট করহারের গড় ২১ থেকে ২৪ শতাংশ। বিদেশি বিনিয়োগে আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়ায় ২৪ শতাংশ, ভিয়েতনামে ২০ শতাংশ ও ইন্দোনেশিয়ায় রয়েছে ২৫ শতাংশ। পরপর দুই অর্থবছরে আড়াই শতাংশ হারে কমিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের করপোরেট করহার ৩০ শতাংশ। আর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ২৫ শতাংশ। এর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরেও বাংলাদেশের করপোরেট করহার ৩৫ শতাংশ ছিল। বিডা মহাপরিচালক নতুন বাজেটে এই করহার ২৮ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেন। লভ্যাংশ আয়ের ওপর অগ্রিম কর কোম্পানির জন্য ২০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে এবং ব্যক্তিদের কাছ থেকে ১০ শতাংশ থেকে পাঁচ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাবও দেন তিনি।

সূত্রমতে, চলতি অর্থবছর করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়নি। তবে মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। সেজন্য আগামী অর্থবছর করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হতে পারে। করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা হতে পারে। সে বিষয়ে এনবিআর কাজ করছে। বর্তমানে সাধারণ করহারের মধ্যে ব্যক্তির আয়ের প্রথম তিন লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয় করমুক্ত। পরবর্তী এক লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের ওপর পাঁচ শতাংশ, পরবর্তী তিন লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী চার লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ, পরবর্তী পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের ওপর ২০ শতাংশ এবং অবশিষ্ট আয়ের ওপর ২৫ শতাংশ হারে কর দিতে হয়। নারী ও ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের করদাতাদের জন্য তিন লাখ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে তিন লাখ ৫০ হাজার এবং গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা চার লাখ ২৫ হাজার টাকা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বনি¤œ করহার ১০ শতাংশ থেকে হ্রাস করে পাঁচ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ করহার ৩০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, করমুক্ত সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা হওয়া উচিত। দেখতে হবে দুর্বল জনগোষ্ঠীকে আর কোনো জায়গায় কর সুরক্ষা দেওয়া যায় কি না। নিরাপত্তা বেষ্টনীতে জিডিপির চার শতাংশ বরাদ্দ ছিল, কিন্তু দুই শতাংশের বেশি খরচ করতে পারিনি। আমাদের সাড়ে ১৬ কোটির দেশ। ৭৪ লাখ লোকের টিআইএন রয়েছে। আর ট্যাক্স দেয় শুধু ৩০ লাখ মানুষ। এত জিডিপি হলে মানুষ কেন ট্যাক্স দেয় না?

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের আকার হবে ছয় লাখ ৭৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকার। এর মধ্যে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে চার লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি ধরা হয়েছিল তিন লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। ফলে আগামী বাজেটে মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরের অধীন রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তিন লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আয়কর খাতে এক লাখ ১৭ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা, শুল্ক খাতে ৪২ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা, মূসক খাতে দুই লাখ চার হাজার ৭৫ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাতে পাঁচ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।