ধারাবাহিক

করারোপ ও বিনিয়োগ দর্শন

মিজানুর রহমান শেলী: বার্কশায়ারের বিনিয়োগকারী হতে গেলে তার যেমন মূল্যায়ণ ক্ষমতা থাকতে হয়, তেমনই তাকে জানতে হয় কীভাবে ক্ষতির মুখেও নিজের সম্পদকে বিনিয়োগ করে দৃঢ়চিত্তে স্টক ধরে রাখতে হয়। সাধারণত এমন সব বিনিয়োগকারী আমাদের সঙ্গে স্থায়ীভাবে বিনিয়োগ করতে সাহস পায় না, যারা ক্ষতি দেখে ভয় করে এবং দূরদৃষ্টিতে যাদের অক্ষমতা রয়েছে। এমন কোনো বিনিয়োগকারী যদি আমাদের মধ্যে কেউ চলেও আসে, তবে সে যে কোনো উপায়েই হোক আমাদের সঙ্গ ত্যাগ করে চলে যেতে বাধ্য হয়ে থাকে।
এখানে সব ধরনের বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগের দামকে সমন্বয় করা হয়ে থাকে একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মধ্য থেকে। তারপর তারা কখনোই কোনোভাবেই আশা করতে পারে না যে, তারা বার্কশায়ারের মূল্য বাড়িয়ে নেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকবে। আমি এর আগে একটি আলোচনায় বলেছি আমরা আমাদের শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে একটি ভারসাম্য আনার চেষ্টা করে থাকি। দেখা যায়, কারও কারও বিনিযোগ কম আবার কারও কারও বিনিয়োগ অনেক বেশি। এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এই বেশি বিনিয়োগের শেয়ারহোল্ডারদের কম মুনাফা পাওয়ার ব্যবস্থা নির্ধারণ করে রাখি। ফলে তারা একটি নির্দিষ্ট প্রান্তিক স্তরে কিছুকাল থেমে থাকে। এরপরে আসে যাদের বিনিয়োগ ছোট তাদের হিসাব। ছোট বিনিয়োগকারীদের যেভাবে সম্ভব সর্বোচ্চ মুনাফা ও সুবিধা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট স্তরে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। ফরে একেকটি নির্দিষ্ট সময়ে এই উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীর মধ্যে একটি ভারসাম্য সৃষ্টি হয়ে থাকে।
যাহোক, বিনিয়োগের মূল্য নিয়ে অতীতের সঙ্গে বর্তমান ও ভবিষ্যতের তুলনা নিয়ে আমাদের বিনিয়োগকারীরা কখনও পীড়াপীড়ি করেন না। এই সুযোগ তাদের দেওয়া হয় না। অন্য কথায় যদি বলি তবে বলতে হবে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আমরা আমাদের কর্মক্ষমতাকে চালিয়ে যায়। এ সময়ের মধ্যে আমাদের কাজ নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তোলার অধিকার রাখে না। এটাকে আমরা অবশ্য আমাদের বিশৃঙ্খলা বলে মনে করি। তাই একটি নির্দিষ্ট সময়ে সবাই আমাদের কাজের পরিসর ও ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ পেয়ে থাকেন। তারা আসলে মাঝ সময়ে যত দুরবস্থায় চোখে দেখুক না কেন ধৈর্য ধরে এবং শেষমেশ আমাদের অর্জনের ওপর ব্যাপক খুশি থাকে। কেননা শেষতক তারা তাদের বিনিয়োগ করা সম্পদের কমপক্ষে দ্বিগুণ সম্পদের মালিক হতে পারেন। এই খুশিটা তাদের অতীতের আশঙ্কাকে শূন্য করে দিতে সক্ষম হয়। আর এ বিষয়টি এখন আমাদের বৈশিষ্ট্য। তাই যারা আমাদের সঙ্গে বিনিয়োগে অংশ নেয় তারা এই পরিস্থিতিটা ঠিকই জানেন ও মানেন।
প্রথমত আমি বলতে চাই, আমাদের ব্যতিক্রমী অর্জন যা আমাদের ইনট্রিনসিক ব্যবসা মূল্যের মধ্যে অর্জিত হয় তা আমাদের মতো একটি পোর্টফোলিও কোম্পানির দ্বারা অর্জন করা নিশ্চয় অসম্ভব কিছু নয়। দ্বিতীয়ত, আমরা বাড়তি বোনাসও আহরণ করে থাকি। আমরা মনে করি, এই বাড়তি বোনাস বিভিন্ন কোম্পানির দরদামকে যথাযথ পরিশুদ্ধ করে দিতে সক্ষম হয়। এমনকি এগুলোর মূল্যমানও তারা বাড়িয়ে তোলে বহুগুণে। এখানে বিভিন্ন ব্যবসার মধ্যে কোনো অসমতা থাকে না। বরং সব ধরনের ব্যবসার মধ্যে একটি উত্তম সামঞ্জস্য রেখেই তা সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। এটাকে কোনো না কোনোভাবে একটি গড়পড়তা পরিস্থিতিতে আনা হয়।
আমরা ব্যবসায় ভালো কিছু অর্জনের ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। আমরা এ ব্যাপারে কারও সঙ্গে কিংবা কোনো বিষয়-ইস্যুর সঙ্গে কখনোই সমঝোতা করে চলি না। আর আমরা চাই, আমরা ভালো ব্যবসা থেকে ভালো মুনাফা অর্জন করতে। যে কোনোভাবেই হোক আমরা কখনোই কোনো খারাপ ব্যবসা থেকে হলেও আমরা ভালো একটি লভ্যাংশ অর্জনের ব্যাপারে কঠোর পরিশ্রমী। আর এ কাজে আমরা বিরামহীন প্রচেষ্টা চালায়। বিশেষত আমরা ব্যবসায় মূল্য থেকেই ভালো সুবিধা আদায় করে নিতে চায়। কেননা ব্যবসা মূল্য যখন ভালো হয় তখন আমাদের আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যায়। আর এটা নিশ্চিত যে কোনো কাজেই আত্মবিশ্বাসের জুড়ি নেই। তাছাড়া আমাদের বার্কশায়ার একটি পোর্টফোলিও কোম্পানি এই বিষয়টিও আমাদের স্বস্তি দিতে সক্ষম হয়। ফলে আমরা যে কোনোভাবেই হোক ভালোফল আহরণে বেশ সুবিধা পেয়ে থাকি। তবে এটা নিশ্চিত যে, আমরা এই পর্যায়ে আসতে কম খাটুনি খেটেছি তা বলা যাবে না। অনেক সংগ্রাম আর মেধার বিনিময়ে আমরা এখানে আসতে সক্ষম হয়েছি।
এখানে আমি আমাদের ‘ক্যাচাপ’ পুরস্কারের কথাটি আনতে চাই। এটা আমরা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। এর অর্থ হলো, আমরা এটাকে স্থাপন করতে চাই যে কোনো উপায়ে; কেননা এর মাধ্যমেই আমরা আমাাদের ভবিষ্যৎকে আরও উজ্জ্বল দেখি।
আমাদের সামনে যে তেমন কোনো সংকট থাকে না, তা নয়। সুবিধার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সঙ্গে চলে আসে আরও অনেক অসুবিধা ও সংকট। আমাদের এসব সংকট ও প্রতিকূলতা মাড়িয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলতে হয় দীর্ঘ মেয়াদে। আমি এখানে এরকম একটি সংকট নিয়ে আলোচনা করতে চাই। আমাদের এই বিশ্ব এখন কোনো অসীম বিশ্ব নয়, যেখানে কোনো কিছু জানতে-বুঝতে বা কোনো প্রান্তে পৌঁছানো যায় না। বরং পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। তাই এ পৃথিবীতে যে কোনো কিছুর অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি ভালো নয়। প্রবৃদ্ধি যখন দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে, তখন যে কোনো ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ হতে পারে বলে আমাদের একটি আশঙ্কা ছিল। তবে এটা সত্যি যে, এই আশঙ্কা এখন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। আমাদের অভিজ্ঞতা তাই বলে। এ বিষয়েও আমি আগে আলোচনা করেছি।
কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির হার যখন খুব ছোট আকারে কোনো একটি জায়গায় স্থান করে নেয়, তবে তাকে আমরা একটি সম্ভাবনা বলেই বিবেচনা করে থাকি। এই প্রবৃদ্ধি সহজে ভেঙে পড়ার মতো কোনো প্রবৃদ্ধি নয়। বড় প্রবৃদ্ধি সব সময়ই নিজে নিজে ভেঙে পড়ে। সেখানে ছোট ছোট প্রবৃদ্ধি সহজে ভাঙ না। আর এ নিয়মটি কোনো সময়কে তোয়াক্কা করে না। মূলত যে কোনো সময় ও যে কোনো পরিস্থিতির জন্যই এই নিয়ম সত্য।
আমি যদি এই বিষয়টিকে একটি উপমার মধ্য দিয়ে বোঝাতে চাই, তবে বলতে হবে: ধরুন আপনি একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। এখন এই অনুষ্ঠানের মঞ্চ তৈরি করেছেন বেলুন দিয়ে। ফলে সবাই খুব হর্ষ ধ্বনি দিচ্ছে। কেননা তা দেখতে খুবই সুন্দর। কিন্তু আপনার বন্ধু তার অনুষ্ঠানে একটি কাঠের মঞ্চ বানিয়েছে। এখানে মোটামুটিভাবে সবাই মিলিত হয়েছে। আনন্দ করছে। কিন্তু আপনার বেলুনের মঞ্চ যে কোনো মুহূর্তে কিংবা আপনার অতিথিদের বেশি উত্তেজনায় যখন ভেঙে যাবে, তখন কিন্তু পুরোটাই নষ্ট হয়ে যাবে। অথচ আপনার বন্ধুর মঞ্চ টিকে থাকবে। এমনকি একটি ভারসাম্যপূর্ণ আমোদ-ফুর্তির ভেতর দিয়ে তার অনুষ্ঠান সফলতা বের করে আনবে।

এই দর্শন রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন লরেন্স এ. কানিংহ্যাম
অনুবাদক: গবেষক, শেয়ার বিজ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..