ধারাবাহিক

করারোপ ও বিনিয়োগ দর্শন

মিজানুর রহমান শেলী: কার্ল স্যাগানের নাম শুনেছেন সবাই। তিনি মজা করে বলেন, ব্যাকটেরিয়ার জীবনচক্র কি কখনও চিন্তা করে দেখেছেন! এটা প্রতি ১৫ মিনিটে দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। তারপরে এই দুটি পৃথক দুটি ব্যাকটেরিয়া হিসেবে কাজ করতে থাকে। অর্থাৎ প্রতি ১৫ মিনিটে একটি ব্যাকটেরিয়া তার প্রজনন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে দুটি ব্যাকটেরিয়াতে পরিণত হয়। স্যাগান আরও বলেন, ‘তাহলে এর অর্থটা আসলে কী দাঁড়ায়? অর্থটা হলো, এটা ঘণ্টায় চারগুণ বেড়ে যায়। আর দিনে বাড়ে ৯৬ গুণ। কিন্তু জানেন কি একটি ব্যাকটেরিয়ার ভর কত? আসলে এটা এক গ্রামের এক ট্রিলিয়ন ভাগের এ ভাগ। কিন্তু এর সন্তান-সন্ততি মাত্র দুদিনে অযৌন প্রক্রিয়ায় বৃদ্ধি পেয়ে সামষ্টিক যে পরিসর তৈরি করে তা একটি পাহাড়ের সমান। এটা হিসাবের বাইরে কিংবা হিসাবের চেয়ে বেশি কিছু। এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে বহু বহু আগে। এভাবে চলতে থাকলে পৃথিবীর সবকিছু একদিন এই ব্যাকটেরিয়া দিয়েই প্রস্তুত করা হবে।’
কিন্তু এই নিয়ে খুব বেশি অবাক হওয়া কিংবা চিন্তায় পড়ে যাওয়ার কিছু নেই বলে অভিমত দিয়েছেন স্যাগান। স্যাগান বলেন, ‘কিছু কিছু বাধা-বিপত্তি সব সময়ই এই ধরনের অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে থাকে। ‘ছারপোকা সব সময়ই খাদ্যের খোঁজে দৌড়ে বেড়ায় অথবা বলা চলে তা সব সময়ই একে অন্যের বিষ দেওয়ার কাজে নিয়োজিত থাকে। অথবা বলা চলে এরা লোকের সামনে প্রজননে খুব লজ্জাবোধ করে থাকে।’
হ্যাঁ, কখনও কখনও বাজে দিন আসে। এমন সব বিশ্রী দিনগুলোতে চার্লি মাঙ্গার যিনি একজন বার্কশায়ারের ভাইস চেয়ারম্যান ও আমাদের সহযোগী এবং আমি কখনোই আমরা আমাদের এই বার্কশায়ারকে ব্যাকটেরিয়া বলে মনে করি না।
এখানে আমাদের দুঃখ রয়েছে ভারা ভারা। আমরা কখনও কোনোদিনই এর নেট সম্পদকে প্রতি ১৫ মিনিটে ব্যাকটেরিয়ার মতো দ্বিগুণ করে নিতে পারিনি। উপরন্তু আমাদের প্রজননে বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ আছে বলে কেউ বলতে পারবে না। আমি নিজেও দাবি করছি, আমরা প্রজননে লজ্জা পায় না। অবশ্য আপনারা ঠিকই বুঝতে পারছেন এই প্রজনন বলতে আসলে বাচ্চা উৎপাদন নয়, বরং জনসমক্ষে আর্থিক উৎপাদন করার কথা বলছি। উপরন্তু স্যাগানের পর্যবেক্ষণও আমরা প্রয়োগ করে থাকি।
একটি মোটা ওয়ালেট (ডলারের ব্যাগ) হলেই যেসব সময় শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগী ফলাফল বয়ে আনবে, তা বলা চলে না। বরং আমরা বলে থাকি একটি মোটা ওয়ালেট সবসময়ই শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগী ফল পাওয়ার অন্তরায়, এমনকি তা শত্রুও বটে।
আর বার্কশায়ার এখন এখানে ১১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে, যা ২২ মিলিয়ন ডলারের সাতে তুলনা করা হয়ে থাকে। আর এ ঘটনাটি ঠিক তখনই ঘটে যখন চার্লি ও আমি দুজনে মিলেই কোম্পানিকে ম্যানেজ করতে থাকি।
যদিও এখানে অনেক অনেক ভালো ব্যবসা রয়ে গেছে। বলা চলে এত ভালো ব্যবসা এর আগে কখনও দেখা যায়নি এত বেশি পরিমাণে। কিন্তু এগুলোকে আমরা কোনোভাবেই ব্যবহার করতে পারছি না। আমরা কোনোভাবেই এত এত ভালো ব্যবসাকে এত এত ডলার হাতে থাকার পরও কিনতে পারছি না। আসলে এই কোম্পানিগুলো বার্কশায়ারের মূলধনের সম্পর্কের সঙ্গে একেবারেই পরিণামহীন। অর্থাৎ বার্কশায়ারের মূলধনের সঙ্গে এসব কোম্পানির সম্পর্কের কোনো ধারাবাহিকতা নেই। নেই কোনো ফলাফল কিংবা কোনো সম্ভাবনা। আর এভাবেই চার্লি আমাকে নিয়মিত স্মরণ করিয়ে দেয় এই বিষয়গুলো। সে বলে, ‘যদি কোনো একটি কাজ করাটা কোনোভাবেই তোমার কাছে মূল্যবান কিছু না হয়ে থাকে, তবে সেই কাজটি সবচেয়ে ভালো করে সম্পন্ন করারও কোনো মূল্য নেই।’ আমরা এখন মনে করি আমরা কেবল সেসব কিছুই ক্রয় করবও যা কিছু ক্রয় করলে আমাদের ব্যবসা নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে। এমনকি আমরা কমপক্ষে ১০০ মিলিয়ন ডলার এক্ষেত্রে ছড়িয়ে দিতেও কোনো বাছ-বিচার করব না। এই অঙ্কটাকে নিশ্চয় আপনার কাছে খুবই ছোট মনে হচ্ছে। আর হ্যাঁ, এটাই সত্য। কেননা আমরা আর আগের মতো চলতে পারছি না। আমাদের কৌশলে পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। আসলে বার্কশায়ারের বিনিয়োগী বিশ্ব দিনে দিনে এখন অনেক সংকুচিত হয়ে এসেছে। এটা অবশ্য একটি নাটকীয় ঘটনা। খুব সহজে যে এটা চলে এসেছে তা নয়।
তবুও আমরা আমাদের পুরোনো রীতি-নীতি থেকে এতটুকু সরে আসার চিন্তা করি না, করব না। আমরা আমাদের জায়গায় অটল থাকতে বদ্ধপরিকর। আমরা জানি যেসব কৌশল ও রীতি-নীতি আমাদের এই পর্যন্ত নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে তা বৃথা যাওয়ার নয়। আমরা এই ধারা অব্যাহত রাখব। আমরা কোনোভাবেই আমাদের মানদণ্ডকে শিথিল করব না। আমরা আমাদের ব্যবসায় নৈতিকতা ও কৌশলের কাছে কারও সঙ্গে কিংবা কোনো কৌশল ও অনৈতিকতার কাছে আপস করব না। আমার এখন টেড উইলিয়ামের কথা মনে পড়ছে। তার ‘দ্য স্টোরি অব মাই লাইফ’ বইতে তিনি বলেছেন, ব্যাখ্যা করেছেন ‘তুমি যদি ভালো হিটার হতে চাও, তবে আমার যুক্তি তুমি গ্রহণ করবে, যাতে করে তুমি হিট করার জন্য অন্তত একটি ভালো বল পেয়ে যেতে পার। আর এটাই হলো আমার বইয়ের প্রথম কৌশল। যদি কখনও একবার আমাকে ওই স্টাফে আঘাত করতে বাধ্য হতে হয় তবে বুঝেতে হবে সেটাই আমার দুঃখের সীমানা। আমি কিন্তু .৩৪৪-এর হিটার নয়। আমি বরং .২৫০-এর একজন হিটার হয়ে যেতে পারি।’ চার্লি আর আমি এ বিষয়ে একমত হয়েছি। এমনকি আমরা উভয়েই এই বিষয়ের ভালো কোনো সুযোগ লুফে নেওয়ার সবচেয়ে ভালো চেষ্টা করতেই থাকব। আর এটাই হবে আমাদের ‘নিজেদের সুখের সীমানা’ মধ্যে সবচেয়ে বড় মঙ্গলের বিষয়।’
আর আমরা সব সময়ই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে বেশ অনাগ্রহ প্রকাশ করে থাকি। এটা আমরা চালিয়ে যাব। আমরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যদ্বাণীকে এড়িয়েই চলব সব সময়ের জন্য। এটার জন্য মূল্য দিতে হয়। মূল্যটা বেশ চড়া। এর ভুক্তভোগী হয়েছেন দেশের বহু বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা। এই ঘটনা একটি বা দুটি নয়।
৩০ বছর আগের কথা মনে পড়ে গেল। কেউই তখন ভিয়েতনামের যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে আগে থেকে ধারণা করতে পেরেছিল না। আর যুদ্ধ যে এত বেশি পরিসরে এত বেশি দিনের এমনকি এত বেশি ভয়াবহতা নিয়ে উপস্থিত হবে, তা কেউই ভাবেনি তখন। মজুরি ও দাম এই যুদ্ধের ফলে নিয়ন্ত্রিত হলো। দুটি তেল মজুত ধাক্কা খেল। আমাদের রাষ্ট্রপতি অব্যাহতি নিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ল। একদিন ডৌ অব ৫০৮ পতিত হলো। ট্রেজারি বিল নিয়ত ধারায় ওঠানামা করতে থাকল। কোনোভাবেই তাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। এটা ২.৮% থেকে ১৭.৪% শতাংশ পর্যন্ত ওঠানামা করতে থাকল।
কিন্তু অবাক হওয়ার মতো বিষয়ও একই সঙ্গে ঘটে গেল, এত এত দুর্ঘটনা, ঘটনার পরে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও বেন গ্রাহামের বিনিয়োগী নীতিতে আসলে তেমন কোনোই পরিবর্তন ঘটল না। সামান্যতম পরিবর্তনও ঘটেনি।

এই দর্শন রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন লরেন্স এ. কানিংহ্যাম।
অনুবাদক: গবেষক, শেয়ার বিজ।

সর্বশেষ..