ধারাবাহিক

করারোপ ও বিনিয়োগ দর্শন

মিজানুর রহমান শেলী: মালিকানাসংশ্লিষ্ট আমাদের প্রথম মূলনীতিতে অনুসারে বলা যায়, চার্লি আর আমি দুজনেই এই বার্কশায়ারের ব্যবস্থাপনা অংশীদার। কিন্তু আমরা আমাদের সাব-সিডিয়ারির সব ম্যানেজারের কাছে এসব ব্যবসার ভারী বোঝা তুলে দেওয়ার সময় তেমন কোনো যোগাযোগ করি না। হ্যাঁ, আমরা এক হয়ে যোগাযোগ করে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি, যখন দেখি আমাদের কোম্পানির কেউ পদত্যাগ করে। তার মানে এই নয় যে, আমাদের বার্কশায়ারে কর্মী সংখ্যা গুটিকয়েক। বরং এখানে ৩৩ হাজার কর্মী রয়েছেন। এর মধ্যে মাত্র ১২ জন অবস্থান করেন সদর দফতরে।
চার্লি আর আমি মূলত মূলধন বিলি-বণ্টন করে থাকি। তাছাড়া আমাদের প্রধান প্রধান ব্যবস্থাপকদের জন্য যাবতীয় প্রয়োজনীয়াদির ব্যবস্থা করে থাকি। তাদের যতœ-আত্মী ও দেখাশোনা এবং খাদ্য-খাবার পরিবেশন করা। হ্যাঁ, এটা মানতেই হবে এসব ম্যানেজার কোনোভাবেই অসুখী নয়। বরং তারা অনেক বেশি সুখী জীবনযাপন করে থাকে। বিশেষ করে এসব ম্যানেজারের যখন কোনো ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে, তখন একেবারে একাই পরিচালনা করে থাকেন। কারও সঙ্গে তার কোনো চিন্তায় আপস বা ভাগাভাগি করতে হয় না। কারও বুদ্ধির জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই শাসন করেন, এই সুখ নিশ্চয় অনেক চমকপ্রদ। আর বস্তুত আমরাই জেনে-বুঝে তাদের রীতিমতো এমন স্বেচ্ছা ক্ষমতায় ছেড়ে দিই। তারা সব ধরনের পরিচালনা সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায় নিয়ে থাকেন। এমনকি সদর দফতর থেকে যে অর্থ তার কাছে আসে তা বিলি বণ্টন করে দেওয়ারও একান্ত নিজ অধিকার তিনি উপভোগ করেন। আবার এই অর্থ তারা আমাদের কাছেই আবার পাঠিয়ে থাকেন। এভাবেই তারা কখনোই আমাদের থেকে পৃথক হয়ে যান না। কাছাকাছি নিবিড় হয়ে থাকেন।
তারা সব সময় নতুন নতুন বড় বিচিত্র মুগ্ধতার হাতছানি পেয়ে থাকেন তাদেরই ছড়ানো পথে। এ অর্থ ছড়ানোর দায় ছিল তাদেরইÑমুগ্ধতাও তাদের। ফিরিয়ে দেওয়ার আকর্ষণ আমাদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা ঋদ্ধ করে তোলে। উপরন্তু চার্লি ও আমিও মুগ্ধ হয়ে থাকি। তাদের মুগ্ধতায় আমাদের অর্থলগ্নির সম্ভাব্যতা বেড়ে যায়, আরও বেশি বেশি অর্থ বেশি পরিসরে ছাড় করার নতুন নতুন দুয়ার আমরা খুলতে থাকি মধুর মোহে। তবে একজন ম্যানেজার যদি কেবল তার নিজের শ্রম ও কর্মকাঠামো দিয়ে এই কাজে নিয়োজিত হতেন, তবে নিশ্চয় তা সফল করে তুলতে পারতেন না। এত বেশি বেশি অর্থলগ্নির দুয়ার খুলতে পারতেন না। এ অভাবই তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরও বাড়িয়ে তোলে।
তবে হ্যাঁ, আমাদের বেশিরভাগ ম্যানেজারই খুব সম্পদশালী। এমনকি এই সম্পদে তাদের একক আধিপত্য রয়েছে। আর তাই আমরাও একটি দায় অনুভব করি তারা যেন তাদের এই সম্পদ নিয়ে বার্কশায়ারের সঙ্গে গলফ খেলার মাঠে কিংবা মাছ ধরার চরে সহাস্যে মিলিত হয়। আমরা কেবল সেই পরিবেশটা তৈরি করে দিই। তারা সাহস পায়: আমাদের সম্পদের সঙ্গে তাদের নিজেদের সম্পদ মিলিয়ে কাজ করার সাহস। আর এ কারণেই আমরাও একটি দায়বোধ করতে থাকি। আমরা তাদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করি। আমরা বুঝি এ ব্যবসায় তারাও মালিক। তাদের অর্থের নিরাপত্তা তাদের ব্যবসার নিরাপত্তা আমাদের মতোই তারাও অনুভব করতে থাকে। আমরা সদা সর্বদা স্বচ্ছতার চর্চা করে থাকি। এমনকি আমরা এমন সব আচরণ করে থাকি যেন তারা বারবার এ ব্যবসায় উৎসাহ পায়। কখনোই যেন আগ্রহ হারিয়ে না ফেলেন। আর তাতে করেই আমাদের অবস্থান দিনের পর দিন অধিষ্ঠিত হতে থাকে।
এবার আসি মূলধন বরাদ্দের কাছে। এই কাজটি আমার ও চার্লি উভয়ের। আমি এটা খুব বেশি উপভোগ করে থাকি। আর এই কাজের ভেতর দিয়ে আমরা দুজনেই বেশ বড় ও উপকারী সব অভিজ্ঞতা আহরণ করতে পেরেছি।
একটি সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের কথায় আসি। এই বিস্তীর্ণ খেলার মাঠে যদি কারও চুলের রঙে ধূসর ছায়া মিশে থাকে তবে নেই কোথাও কোনো দুঃখ রাশি রাশি। আপনার তো ঈশ্বরের হাতের দরকার নেই। আবার এমন কোনো শক্তিশালী হাতের ভাঁজ পড়া পেঁচানো পেশিই বা আপনার কিসে প্রয়োজন পড়বে বলুন তো? আপনি লৌহহস্তে অর্থ ছড়াতে চান? না, তার তো প্রয়োজন নেই। আসলে সব প্রশংসা ওই সৃষ্টিকর্তার। আমাদের মন স্রোতধারার মতো চলমান। যতটা চলে আর কাজ করে যায় কার্যকরী ধারায়, চার্লি আর আমি ততই আমাদের কাজের ওপর শক্ত হয়ে পেয়ে বসি। অতীতে যতটা সফলতা বাগিয়ে এনে ঘর ভরেছি, এখনও ততটাই কাজের সফলতা আমাদের পিছে দৌড়ে বেড়ায়।
আমার মৃত্যু: সে এমন একটি দিনের কথা, যখন বার্কশায়ারের সার্বিক মালিকানায় আসবে পরিবর্তন। তবে আমি বিশ্বাস করি, সেদিন কোনো ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে যাবে না। কোনো অনিষ্ট মাথাচাড়া দিয়ে দাপাবে না। স্বাভাবিক রীতিতে সবকিছু বহমান হবে। প্রথমত, আমার স্টকের মাত্র ১০০ ভাগের এক ভাগ বিক্রি হয়ে যাবে। আর এটা করা হবে কেবল উত্তরাধিকার-সংশ্লিষ্ট কাজে এবং কর পরিশোধে। দ্বিতীয়ত, আমার স্টকের যাবতীয় ব্যালান্স চলে যাবে আমার স্ত্রীর অধিকারে। আমার স্ত্রী, আমার প্রিয়তমা সুসান। সে এই অধিকার রাখবে যদি আমার পরেও সে বেঁচে থাকে অথবা অন্য কোনো সংসার না পাতে।
যাহোক, পরিস্থিতি যেমন হোক না কেন আমার মৃত্যুর পরে আমাকে নিয়ে… সেটা বিষয় নয়। বরং বার্কশায়ারের তখন নতুন কোনো শেয়ারহোল্ডার থাকবে যিনি একই দর্শন মেনে চলেন। এমনকি আমি এবং আমরা যে উদ্দেশ্যগত কাঠামে অনুসরণ করি সেই একই উদ্দেশ্য তিনিও মেনে চলবেন।
এই সন্ধিক্ষণে বার্কশায়ারে পরিবার আসবে না। তারা এসে বার্কশায়ারের ব্যবসা পরিচালনার দায়দায়িত্ব নিয়ে বসবে না। তারা বস্তুত এই কাজে কোনোভাবেই উত্তরাধিকার লাভ করবে না। কেবলমাত্র তিনিই এখানকার ম্যানেজার হওয়ার যোগ্যতা রাখেন, যিনি এই সবকিছুকে ধারণ করেন এবং একইভাবে আমাদের চোখেই দূরদৃষ্টি রাখতে পারেন। যোগ্যজনই এই স্থানে বসবেন।
এমনকি আমার মৃত্যুর পরে কখন থেকে নতুন কোনো এক ম্যানেজার এই স্থানে এসে বসবেন, তা নিজের কি ভাবতে হবে? অবশ্যই না, মৃত্যুর পরক্ষণেই, ওইদিনই নতুন কেউ এই কাজে যোগ দেবে। তবে সে সময় ব্যবস্থাপনা কাঠামোটা আসলে কেমন হবেÑসেই বিষয়ে আমি কিছু বক্তব্য দিতে পারি। কিছু বলতে পারি: অবশ্যই আমার কাজ তখন দুটি অংশে ভাগ হয়ে যাবে। এর একটি কাজ অবশ্যই কোনো নির্বাহী কর্মকর্তা গ্রহণ করবেন বিনিয়োগের বিষয়াদি দেখভালের জন্য। আর অন্যজন এখানে বসবেন যিনি এসব কিছু পরিচালনার কাজ করবেন। আর যদি নতুন কোনো অধিগ্রহণের সময় আসন্ন হয়ে যায়, তবে দুজনে মিলে একসঙ্গে কাজ করবেন। তারা উভয়ে একত্র হবেন। একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেবেন। যে সিদ্ধান্ত যৌক্তিক ও অপরিহার্য কেবল সেই সিদ্ধান্তই তারা গ্রহণ করবেন।
আর এই দুজন নির্বাহী বোর্ড অব ডিরেক্টরির কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন। তারা সব সময় বোর্ড অব ডিরেক্টরির কাছে প্রতিবেদন পেশ করবেন। আর এটা শেয়ারহোল্ডার নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া। আর এসব স্বার্থই ঘুরেফিরে আপনাদের সবার স্বার্থই সংরক্ষণ করে থাকবে।

এই দর্শন রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন লরেন্স এ. কানিংহ্যাম।
অনুবাদক: গবেষক, শেয়ার বিজ।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..