দিনের খবর পত্রিকা প্রথম পাতা

করোনাকালীন বাজেটে আয়কর পলিসি ‘ম্যাজিক’

রহমত রহমান: বর্তমান বাজেটটি করোনাকালীন বাজেট নামে পরিচিত। করোনায় মানুষ চাকরি হারিয়েছেন; ফলে কমেছে মানুষের আয়। এতে ব্যক্তি-শ্রেণির আয়কর আদায়ে বেশ প্রভাব পড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে আঘাত করেছে করোনা। ফলে কোম্পানির আয় কমেছে। এতে কোম্পানি থেকে কর আহরণও কমেছে। স্বাভাবিক বিবেচনায় চলতি অর্থবছর আয়কর খাতে করোনার আঘাত লাগার কথা সবচেয়ে বেশি। কমে যাওয়ার কথা আয়কর আহরণ। কিন্তু বাজেটে কয়েকটি নীতিগত পরিবর্তন আয়কর আহরণে ‘ম্যাজিক’ হিসেবে কাজ করেছে। তবে এসব নীতিগত পরিবর্তন কেবল করোনাকালীন করদাতাদের সহায়তা দেয়ার জন্য করা হয়েছে।

তীক্ষè নীতিগত পরিবর্তনের সঙ্গে করোনার মধ্যেও পরিবীক্ষণ বৃদ্ধি করার কারণে কয়েকটি খাতে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার আয়কর বেশি আদায় হবে। নীতিগত পরিবর্তনের কারণে কেবল আয়কর আদায়ই বাড়ছে না, বরং তা করোনাকালীন অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাজেটের এসব সিদ্ধান্ত মস্কে যাওয়া অর্থনীতিকেও ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করছে। আগামী বাজেটেও একইভাবে কয়েকটি নীতিগত পরিবর্তন আনার কথা ভাবছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বাজেটের আগেই কিছু নীতিগত পরিবর্তন নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এনবিআর কর্মকর্তারা।

এনবিআর সূত্রমতে, প্রথমত তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি খাতে উৎসে কর এবারের বাজেটে দ্বিগুণ করা হয়েছে। অর্থাৎ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে রপ্তানি খাতে আয়কর (উৎসে কর) কর্তন দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বাজেটে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকসহ সব ধরনের পণ্য ও সেবা রপ্তানি কভিড-১৯ মহামারির কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাই রপ্তানি খাতকে সার্বিক সহায়তা করার অংশ হিসেবে আয়কর অধ্যাদেশে উল্লিখিত উৎসে করহার কমানোর প্রস্তাব করছি। আয়কর অধ্যাদেশে তৈরি পোশাকসহ সব ধরনের পণ্যের রপ্তানি মূল্যের ওপর ১ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তনের বিধান রয়েছে। এসআরও জারির মাধ্যমে এ হার হ্রাস করা হয়েছে, যা ৩০ জুন ২০২০ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।’

সূত্রমতে, বিদায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে তৈরি পোশাকসহ সব ধরনের পণ্য রপ্তানির ওপর উৎসে কর ১ শতাংশ কেটে রাখার আদেশ জারি করা হয়। পরে পোশাক রপ্তানিকারকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ অন্যান্য ব্যবসায়ী সংগঠনের দাবির মুখে অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে সেটা কমিয়ে দশমিক ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল এনবিআর। দেশ থেকে যত পণ্য রপ্তানি হয়, এর ৮৩ শতাংশের বেশি হয় তৈরি পোশাক। তবে তবে চলতি অর্থবছর দশমিক ৫০ শতাংশ করা হলেও কোনো সংগঠনের পক্ষ থেকে উৎসে কর কমানোর কোনো প্রস্তাব করা হয়নি। করোনার কারণে রপ্তানিতে তেমন প্রভাব পড়েনি। ফলে একটি পলিসিগত সিদ্ধান্তে রপ্তানি খাতে উৎসে আয়কর আহরণ দ্বিগুণ হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, কালোটাকা সাদা করার ক্ষেত্র বৃদ্ধি করা। চলতি বাজেটে জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বহাল রাখা হয়। সঙ্গে পুঁজিবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগের বিশেষ সুযোগ দেয়া হয়। এতে কালোটাকা সাদা করার সুযোগে সাড়া পড়ছে। সরকারের অভয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহ বাড়ছে। এতে ভালো ফল আসতে শুরু করেছে। একদিকে কর আহরণ বাড়ছে, অন্যদিকে অর্থনীতিতে এ টাকা দ্রæত প্রবেশ করছে। আগামী দিনে অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

এনবিআরের হিসাব মতে, অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও পুঁজিবাজারের উন্নয়নে চলতি অর্থবছর সরকার অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগে বিশেষ সুযোগ দেয়। গত বছররের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আয়কর অধ্যাদেশের ১৯-এর এএএএ ধারায় প্রদত্ত সুযোগ নিয়ে ২০৫ জন করদাতা ২২৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছেন। এর বিপরীতে ১০ শতাংশ হারে এনবিআর কর পেয়েছে ২২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।

অন্যদিকে আয়কর অধ্যাদেশের ১৯-এএএএএ ধারা অনুযায়ী, নগদ অর্থ, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, জমি, ফ্ল্যাট ও জমিতে সাত হাজার ৪৪৫ জন করদাতা ৯ হাজার ৩৯৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা কালোটাকা সাদা করেছেন। যাতে সরকার কর পেয়েছে ৯৩৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। পুঁজিবাজার, নগদ অর্থ, জমি, ফ্ল্যাটে গত ছয় মাসে মোট সাত হাজার ৬৫০ জন করদাতা ৯ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা কালোটাকা সাদা করেছেন। যাতে সরকার কর পেয়েছে ৯৬২ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

বাজেট বলা হয়েছে, দেশের প্রচলিত আইনে যা-ই থাকুক না কেন, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের চলতি অর্থবছরে আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত জমি, বিল্ডিং, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের প্রতি বর্গমিটারের ওপর নির্দিষ্ট হারে এবং নগদ অর্থ, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, বন্ড বা যে কোনো সিকিউরিটিজের ওপর ১০ শতাংশ কর দিয়ে আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করলে কর্তৃপক্ষসহ কেউ প্রশ্ন করতে পারবে না। একই সময় ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা পুঁজিবাজারে অর্থ বিনিয়োগ করলে, ওই বিনিয়োগের ওপর ১০ শতাংশ কর দিলে, আয়করসহ কোনো কর্তৃপক্ষ প্রশ্ন করবে না।

তৃতীয়ত, বাজেটে সম্পদ অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে কর দ্বিগুণ করা হয়েছে। দেশের সর্বত্র উন্নয়নের ছোঁয়া লাগছে। সরকার দেশের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করছে। উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভ‚মি অধিগ্রহণ করতে হয়। বিশেষ করে বড় প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি কোটি টাকার ভ‚মি অধিগ্রহণ করতে হয়। বিগত বাজেটে ভ‚মি অধিগ্রহণ কর ছিল ১-২ শতাংশ। চলতি বাজেটে ৩-৬ শতাংশ করা হয়েছে। এতে ভ‚মি অধিগ্রহণ খাত থেকে আয়কর আহরণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

চতুর্থত, চলতি বাজেটে গাড়ি মালিকদের ওপর কর বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ১৫০০ সিসি পর্যন্ত গাড়ির ওপর কর ১৫ হাজার থেকে ১০ হাজার বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। দেশে ব্যক্তিগত গাড়ির মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই ১৫০০ সিসির কম। ১৫০০ সিসির বেশি কিন্তু ২০০০ সিসির কম, এমন প্রাইভেট কার ও জিপ গাড়িতে কর ৩০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। ২০০০ সিসি থেকে ২৫০০ সিসির কম গাড়ির কর এখন ৭৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হয়েছে। ২৫০০ থেকে ৩০০০ সিসির কম পর্যন্ত এবং ৩০০০ সিসি থেকে ৩৫০০ সিসি পর্যন্ত গাড়ির জন্য বাড়ানো হয়েছে ২৫ হাজার টাকা করে। এই দুটি শ্রেণিতে করের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১ লাখ ও ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। ৩৫০০ সিসির বেশি এমন সব বিলাসবহুল গাড়ির ওপর বার্ষিক কর ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা হয়েছে। মাইক্রোবাস ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করা হয়েছে।

এছাড়া বিআরটিএর রেজিস্ট্রেশন সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। পঞ্চমত, চলতি অর্থবছর নগদ সহায়তার ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে এ খাতেও দ্বিগুণ কর আদায় হচ্ছে। বর্তমানে রপ্তানিতে প্রায় ২৬টি শ্রেণিতে নগদ সহায়তা দেয়া হয়।

অন্যদিকে, চলতি বাজেটে করদাতাদের সাপোর্ট দিতে বেশ কিছু ছাড় দেয়া হয়েছে, যাতে কর আদায় কমেছে। এর মধ্যে রয়েছেÑব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা কমানো, করপোরেট হার হ্রাস, কয়েকটি খাতে উৎসে কর হ্রাস ইত্যাদি। এসব খাত থেকে গত অর্থবছরের তুলনায় কর আদায় কম হচ্ছে। যদিও ডিসেম্বর পর্যন্ত আয়কর আহরণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এসব খাতে করহার হ্রাস করা না হলে প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের ওপরে যেত।

এ বিষয়ে এনবিআর সদস্য (করনীতি) মো. আলমগীর হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘করদাতাদের সহায়তা করার জন্যই এসব পরিবর্তন এনেছে এনবিআর। আমরা করমুক্ত আয়সীমা, করপোরেট করসহ বেশ কিছু খাতে কর কমিয়েছি। তবে কর বেড়েছে মূলত পরিবীক্ষণ জোরদার করার কারণে। করোনার মধ্যেও দায়িত্ববোধ থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর আহরণে অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..