মত-বিশ্লেষণ

করোনাকালের অসৎ ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করতে হবে

মোহাম্মদ আবু নোমান: চীনের উহান শহরের জনৈক ব্যক্তির পোষা কুকুরটি পাঁচ দিন হাসপাতালের সামনে ক্ষুধার্ত অবস্থায় পড়ে ছিল মনিবের অপেক্ষায়। অবশেষে লোকেরা বিষয়টি বুঝতে পেরে তাকে উদ্ধার করে। কিন্তু না, সুস্থ হয়ে সে আবার ছুটে আসে হাসপাতালের সামনে, কেননা কুকুরটি জানে না যে তার মনিবের মৃত্যু হয়েছে আগেই। কুকুরসহ নানা হিংস্র প্রাণীর মনিবের জীবনরক্ষার কাহিনি লিখতে গেলে বড় একটি কিতাব হয়ে যাবে। একটি কুকুরেরও তার মনিব তথা মানুষের প্রতি ভালোবাসা রয়েছে। কিন্তু ‘মানবরূপী অমানুষ’ বেসরকারি রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজি হেলথ কেয়ার কর্তৃপক্ষের তাও নেই। প্রশ্ন হলো, আমরা মানুষ কেন? কুকুরও ওদের চাইতে ভালো! প্রকৃত মানুষ তো নিজে না খেয়ে অন্যকে খাওয়ায়, বাঁচায়। সে ত্যাগের মধ্যেই তৃপ্তি পায়। বর্তমানে কতিপয় ‘মানুষই’ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শত্রু। বাঙালির হীনম্মন্যতা আর সংকীর্ণতার নগ্নরূপ দেখেই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি।’ করোনাভাইরাসের প্রকোপে গোটা পৃথিবী এখন বিপর্যস্ত। করোনাভাইরাস বিশ্বের সব পরাশক্তিকে হারিয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে এই ডিজাস্টার বড়। ভালো নেই আমাদের প্রিয় বাংলাদেশও। প্রতিদিনই স্বরূপ বদলিয়ে, চেহারা পাল্টিয়ে, বংশবিস্তার করায় পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিশ্চিত হওয়া কিংবা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা। এরই মধ্যে প্রমাণিত হয়ে গেছে, এই ভাইরাস পরমাণু বোমার চেয়েও ভয়ংকর। মহাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোও এই ভাইরাসের কাছে অসহায় হয়ে কাঁপছে।

মূল্যবোধ দায়িত্ববোধের অবক্ষয়: মহামারির এই মহাবিপদও আমাদের অনেকের সম্প্রীতি ও মানবিকতাবোধ জাগাতে পারেনি। জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতালের দুর্নীতি স্পষ্টতই আমাদের মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেমের অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। করোনা পরিস্থিতিতে যখন গরিব আরও গরিব, সহায়হীন আরও অসহায় হতে চলল, তখনও তা অনেকের বিবেকে টনক নাড়াতে পারেনি। প্রবাদে আছে, ‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি।’ মহামারি, মৃত্যু বা সংকট কোনোটিই কতিপয় মানুষরূপী পশু ও স্বার্থপর সামর্থ্যবানদের বিবেক একটুও টলাতে পারেনি। তারা চিকিৎসাপ্রার্থীর কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং সরকারি বিল উত্তোলনের মাধ্যমে গাছেরটা যেমন খেতে চেয়েছে, তেমনই কুড়াতে চেয়েছে তলারটা। করোনা যেন ওদের জন্য আশীর্বাদ! কিন্তু মহাবিস্ময়ের ব্যাপার হলো, পরীক্ষা দূরে থাক, করোনা সন্দেহভাজনদের নমুনা সংগ্রহ করে ফেলে দিয়ে মনগড়া রিপোর্ট দিয়েছে। এর মাধ্যমে হাসপাতাল দুটি যা করেছে, তা নিছক প্রতারণা বা দুর্নীতি নয়, এটা নিঃসন্দেহে সমাজ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। করোনা-আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতাল যাদের নেগেটিভ রিপোর্ট দিয়েছে, তারা স্পষ্টতই করোনা ছড়িয়েছে।

মনুষ্যত্ব ও মানবিকতার কাছে পরাজিত মানুষ: কতখানি পাশবিক হলে বাবার লাশের অপেক্ষায় থাকা কিশোরীকে একা পেয়ে ধর্ষণ করতে পারে হায়েনার দল! দুঃস্বপ্নেও ভাবা যায় পিপিই পরে ওয়ার্ডবয় করোনারোগী নারীর শ্লীলতাহানি করতে পারে! এসব নির্মম সব চিত্র সমাজের মধ্যে ওতপ্রোতভাবে থাকা ভয়ংকর জানোয়ারদের সামনে নিয়ে এসেছে। রাস্তায় মা-বাবাকে ফেলে যাওয়া সন্তানদের দেখার সুযোগ করে দিয়েছে এই করোনাকাল। মরতে যাওয়া মানুষটার মুখে একটু পানি তুলে দেওয়ার মানুষ মেলে না। মৃতদেহ সম্মানের সঙ্গে বিদায় দেওয়া দূরের কথা, দাফন করতে দেওয়া হয়নি বহু জায়গায়। করোনার ভয়ে রোগীকে ঘরে উঠতে দেয়নি স্ত্রী ও সন্তানেরা। মৃত সন্তানের লাশ এনেছে অন্য ছেলেরা পরিবারের সদস্যদের শেষবারের মতো দেখানো ও কাফন-দাফনের জন্য। হ্যাঁ, এখানেই বাবা ও পরিবার পরাজিত হয়েছে মনুষ্যত্ব ও মানবিকতার কাছে। পক্ষান্তরে ওই অচেনা যুবকগুলো নৈতিকতা ও মনুষ্যত্বকে উড্ডীন করেছে। এছাড়া অনেককেই দেখা গেছে আক্রান্ত মানুষের সঙ্গে বাঁকা চোখে অমানবিক আচরণ করতে, যা একদমই অপ্রত্যাশিত।

আক্রান্তের পরিবারকে করা হচ্ছে সামাজিক ও মানসিকভাবে অসম্মান।

সিলগালা রিজেন্ট হাসপাতাল: বাংলাদেশ যেন চোর-বাটপাড়ের একটি অত্যাধুনিক ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। ২০১৪ সালে অর্থাৎ ছয় বছর আগে রিজেন্ট হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কীভাবে তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে সনদ নিয়েছে? ভাবা যায়, দেশের স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা! স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত ‘সাহেবরা’ রিজেন্ট ও জেকেজি হেলথ কেয়ারকে প্রতিরোধ করতে পারলেন না কেন? নিশ্চয়ই কোনো না কোনোভাবে তাদের কাছ থেকে ‘লাভের গুড়’ খেয়েছেন! অথবা কমিশনভোগী ছিলেন! কী ভয়াবহ প্রতারণা! মানুষ যাবে কোথায়! কে দেবে কাকে এ কৈফিয়ত? মহাবিপর্যয়ের মধ্যেও কিছু অসাধু মানুষ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে যেভাবে অসংখ্য ব্যক্তির জীবনকে বিপদের মধ্যে ফেলছে, তা খুবই লজ্জা ও বেদনাদায়ক। রিজেন্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সরকারের সঙ্গে চুক্তি ছিল ভর্তি রোগীদের তারা কভিড পরীক্ষা করবে বিনা মূল্যে। তারা আইইডিসিআর, আইটিএইচ ও নিপসম থেকে চার হাজার ২০০ রোগীর বিনা মূল্যে নমুনা পরীক্ষা করিয়ে এনেছে। কিন্তু রোগীদের কাছ থেকে তারা নমুনা পরীক্ষা বাবদ এক কোটি ৪৭ লাখ টাকা আদায় করেছে। এতেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, নমুনা পরীক্ষা না করেই আরও তিনগুণ লোকের ভুয়া করোনা রিপোর্ট তৈরি করেছে। এ প্রতারকরা এতটাই বেপরোয়া ছিল যে, তারা বিদেশে গমনরত বাংলাদেশিদের অর্থের বিনিময়ে করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেটের জোগান দিচ্ছিল।

হায়রে মুনাফাখোর: করোনাকালে যখন দুনিয়াজুড়ে মানবতার আর্তচিৎকার পাষাণেরও মন গলিয়েছে, তখন প্রতারকরা এটিকে অর্থ আয়ের সুযোগ হিসেবে ভেবেছে। তাজ্জব করার মতো তথ্য হলেও সত্যি, দেশের রাজধানীতে করোনা টেস্টের নামে হাসপাতাল দুটো যা করেছে, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। করোনা চিকিৎসা আর টেস্টের নামে রিজেন্টের ভয়ংকর অপকর্মের তথ্য বেরিয়ে আসে। করোনার উপসর্গ থাকা হাজার হাজার মানুষের কাছ থেকে বাসায় গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করেছে তারা। সেই নমুনার কোনো ধরনের টেস্ট ছাড়াই নিজেদের কম্পিউটারে বানিয়েছে ভুয়া রিপোর্ট। হাজার হাজার রোগীর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে এ ধরনের ভুয়া সনদ। বিনিময়ে হাতিয়ে নিয়েছে টাকা। হায়রে মুনাফাখোর! হায়রে মুখোশধারী ‘চেতনাবাজ’ রিজেন্টের মালিক মোহাম্মদ সাহেদ। মানহীন অখ্যাত এসব প্রতিষ্ঠানকে করোনার চিকিৎসা ও পরীক্ষার জন্য মনোনয়নের পেছনে বড় ধরনের অসাধু চক্রের আর্থিক বাণিজ্য ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। জেকেজির বিস্ময়কর তথ্য হলো, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে কোনো পরীক্ষা না করেই প্রতিষ্ঠানটি ১৫ হাজার ৪৬০ জনকে করোনার টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট সরবরাহ করেছে।

হৃদয় ছুঁয়েছে ছাত্রের কান্না: বিপদে-আপদে মানুষের প্রতি ভালোবাসা, দরদ ও অনুভূতি যার যত তীব্র, তার নৈতিকতা ও মনুষ্যত্ব তত উন্নত। করোনা মহামারির এ দুঃসময়ে সংবাদপত্রের পাতাজুড়ে যেমন মানবিকতার বিভিন্ন খবর দেখা গেছে, তেমনি কিছু অমানবিকতার খবরও। রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় ৫০ ছাত্রের শিক্ষাসনদ, আসবাবপত্রসহ সবকিছুই ফেলে দেওয়া হয়েছে। এসব বাড়িওয়ালা কেবল নগদ স্বার্থ দেখেছে। আর তাই মানুষ ও মনুষ্যত্ব কোনোটাই এদের কাছে নিরাপদ নয়। কলাবাগানেও বাসাভাড়া পরিশোধে দেরি করায় আট ছাত্রের ল্যাপটপ, আসবাবপত্র ও শিক্ষাসনদ ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দেওয়ার একটি খবরও দেখা গেছে। টেলিভিশনের পর্দায় ‘সজীব’ নামের এক ছাত্রের কান্না হৃদয় ছুঁয়ে গেছে সবার। মানুষ মরে যায়, কিন্তু বেঁচে থাকে তার মনুষ্যত্ব। যুগ যুগ ধরে মানুষ তাকে স্মরণ করে দোয়া করে। এজন্য বলা হয়, মানুষ বড় নয়; বরং মনুষ্যত্ব বড়। কেবল অর্থ ও বস্তুকেই এসব বাড়িওয়ালা মুখ্য গণ্য করেছে। মনুষ্যত্ব ও নৈতিকতা তাদের কাছে গৌণ। তাদের কাছে পরাজিত হলো মনুষ্যত্ব ও ন্যায়বিচার। ইতিহাসে ঘৃণার আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হলো তারা। বৈশ্বিক এ দুর্যোগে আমাদের ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে একে অপরের বিপদে এগিয়ে আসা জরুরি। বকেয়া ভাড়ার দাবিতে শিক্ষাসনদ ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দেওয়ার মতো অমানবিকতার খবর আমরা আর দেখতে চাই না।

কার কখন মৃত্যু হবে: আজ আমার পাশের লোকটি রোগাক্রান্ত হয়েছেন, আগামীকাল তো আমিও হতে পারি। আমি অসুস্থ হলে অন্যদের কাছে যেমন আচরণ প্রত্যাশা করি, রোগীদের প্রতি তেমন আচরণ করা আমার কর্তব্য। মৃত্যু কার কখন হবে, তা কেউ জানে না। তবে ন্যূনতম চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার সবার রয়েছে। করোনা কিংবা স্বাভাবিক রোগব্যাধি যা-ই হোক, অসুস্থ হওয়ার পর সেবা পাওয়া রোগীর মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ অনুযায়ী অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান মৌলিক চাহিদা। পৃথিবীর সব ধর্মেই বিপদগ্রস্তের ওপর জুলুম না করার নির্দেশনা রয়েছে। রোগীর সেবার ব্যাপারে গুরুত্ব থাকার পরও করোনায় আক্রান্ত সন্দেহে রোগীকে রাস্তায় ফেলে যাওয়ার নির্মম খবর দেখতে পাই আমরা গণমাধ্যমে। সব ধর্মই বিপদে সাহায্যের হাত প্রশস্ত করার আদেশ দেয়, কিন্তু ধর্মপরায়ণ বলে দাবি করা এই জনগোষ্ঠীতে কেউ কেউ সেই শিক্ষার ধারেপাশেও নেই; উল্টো সুযোগের অপেক্ষায় থাকে অন্যের পোড়া ঘরে আলু পুড়ে খাওয়ার। কভিড মহামারি চলাকালে সেই নির্মম সত্যটাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতাল।

ভাড়াটিয়াদের প্রতি মানবিক হোন: করোনার এ দুর্যোগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মেস কিংবা বাসার মালিকদের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য ভাড়া মওকুফের খবরও আমরা দেখেছি। তাদের সাময়িক দয়া যেকোনো মানুষের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। কিছু জেলায় মেসের ভাড়া শতাংশের হিসাবে ছাড় দেওয়ার খবরও আমরা দেখেছি। মানবিকতার উদাহরণ সৃষ্টি করা এই খবরগুলো মনে আনন্দের সৃষ্টি করে। এমন মানবিক বাংলাদেশই তো আমরা সব সময় চেয়ে এসেছি। করোনাভাইরাসের প্রভাবে নানা রকম অপরিকল্পিত এবং অকল্পনীয় আতঙ্ক ও হতাশার মধ্যে দিন পার করছে নি¤œ ও নি¤œমধ্যবিত্ত মানুষ। কেউ হারাচ্ছেন একমাত্র উপার্জনক্ষম প্রিয় মানুষকে, যা কোনো মানুষের কাছে খুবই বেদনাদায়ক। কেউ বা কর্মহীন হয়ে পড়ছেন, আবার কেউ কর্মহীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন। গত কয়েক মাসে আয় রোজগার কমে এমনকি কর্মস্থান হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে নি¤œমধ্যবিত্ত ও নি¤œ আয়ের মানুষগুলো। হতদরিদ্ররা হয়ে পড়েছে আরও অসহায়। জীবিকার এমন সংকট দেখা দেওয়ায় নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে ঢাকা শহর ছাড়তে শুরু করেছে অনেক মানুষ। বর্তমান পরিস্থিতিতে সার্বিক দিক বিবেচনা করে বাড়িওয়ালাদের উচিত ভাড়াটিয়াদের প্রতি মানবিক হওয়া।

গবেষক, ফ্রিল্যান্স লেখক

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..