দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

করোনাকালের ব্যাংকিং

আজিমা বেগম: চলতি বছরের শুরু থেকে কভিড-১৯-এর মতো একটি প্রাণঘাতী রোগ ছড়িয়ে পড়ায় পুরো বিশ্ব নজিরবিহীন কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আকার ও শ্রেণি নির্বিশেষে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কঠিন সময় পার করছে। প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে সবার জন্য সহনীয় পরিস্থিতি তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ন্যায্য ও সময়মতো ব্যাংকিং ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের জন্য অনেক উদ্দীপক প্যাকেজ সরবরাহ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক সব ব্যাংককে নির্দেশনা দিয়েছে। উদ্দীপক প্যাকেজগুলো প্রতিটি খাত, যেমন ছোট, মাঝারি বা বড় ও অন্যান্য ধরনের সেবা, বাণিজ্য, পোশাক, কৃষি প্রভৃতিকে আওতাভুক্ত করেছে। এর পরিমাণ প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। এখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সময় এসেছে কৌশল অবলম্বন করে ঋণগ্রহীতাদের শনাক্তকরণ, তাদের প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ ও ঋণ পুনরুদ্ধারের সুরক্ষা নিশ্চিত সাপেক্ষে ঋণ ব্যবস্থাপনা।

আমরা সময়কে ফাঁকি দিতে পারি না। প্রতি ঘণ্টার ব্যবহারে আমরা আমাদের কাজের প্রতি অধিকতর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকা ছাড়া সামনে এগোতে পারব না। বর্তমান বাস্তবতায় যে কোনো ব্যাংকের প্রধান কাজ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগের আওতাধীন। এ বিভাগকে কীভাবে ঋণ ঝুঁকি, বাজার ঝুঁকি, তারল্য ঝুঁকি ও পরিচালনা ঝুঁকি কমাতে হবে, তার ব্যাখ্যাসহ প্রতিবেদন শীর্ষ ব্যবস্থাপনা ও বোর্ডকে জমা দিতে হবে। তারা দূষণের ঝুঁকি-সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদনও তৈরি করতে পারে।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বড়সংখ্যক ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে এবং নন-ফান্ডেড ব্যবসা অর্ধেক হারে কমে যাবে। এ থেকে উত্তরণের উপায় কী? ঘাটতি পূরণে আমাদের কী ব্যবস্থা নিতে হবে? অনেক প্রতিষ্ঠান উদ্দীপনা প্যাকেজের জন্য আবেদন করবে। ঋণগুলো কারা পাবে, যদি লভ্যাংশ বিতরণ না হয় বা বিলম্বিত হয়, তবে এর সঙ্গে সম্পর্কিত করের কী হবে এসব ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগের উদ্বেগের বিষয়। আমরা জানি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা মানে ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়া নয়, বরং সতর্কতার সঙ্গে ঝুঁকি গ্রহণ করা। যাহোক, বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে ঝুঁকি নেওয়ার সময় এসে গেছে। ব্যাংকগুলোতে বিসিপি (ব্যবসায় কন্টিনজেন্সি/কনটিনিউইটি প্ল্যান) থাকতে হবে, অর্থাৎ তাদের প্রাথমিক বই ও নথিগুলোর অবস্থান (মুদ্রিত ও ইলেকট্রনিক কপি) এবং ব্যাক-আপ বই ও নথিগুলোর অবস্থান (মুদ্রিত ও ইলেকট্রনিক কপি) শনাক্ত করতে হবে। উপরন্তু ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই প্রস্তুত থাকতে হবে এ ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য যে, কীভাবে তারা ডেটা ব্যাকআপ করে ও উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক ব্যত্যয় ঘটলে তারা কীভাবে ডেটা পুনরুদ্ধার করবে।

ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যে বিষয়গুলো আবশ্যকীয় সদস্যদের ব্যবসায়িক প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীলতা এবং দ্রুত ও নির্ভুল সিকিউরিটি লেনদেন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। এছাড়া অন্তর্ভুক্ত থাকবে অর্ডার গ্রহণ, অর্ডার লিপিবদ্ধকরণ, সম্পাদন, তুলনাকরণ, বণ্টন, ছাড়পত্র দান ও সিকিউরিটি লেনদেন নিষ্পত্তিকরণ, গ্রাহকের হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ, গ্রাহকের হিসাবে প্রবেশ এবং তহবিল ও জামানত অর্পণ।

আর্থিক ও পরিচালনা মূল্যায়নের জন্য লিখিত পদ্ধতি থাকবে, যা কোনো ব্যাংককে তার পরিচালনা এবং আর্থিক এবং ঋণ ঝুঁকির পরিমাণ পরিবর্তন শনাক্তে/নির্ধারণে সম্মতি দেয়। পরিচালনা ঝুঁকি ব্যাংকের গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং তার মিশন ক্রিটিকাল সিস্টেমের মাধ্যমে মূল ক্রিয়াকলাপের রেকর্ড পুনরুদ্ধারের ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে হয়। আর্থিক ঝুঁকি হলো আয়-উপার্জন অব্যাহত রাখা এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও পর্যাপ্ত ইক্যুইটি ধরে রাখা বা অর্জনের সঙ্গে সম্পর্কিত। ব্যাংকগুলোও ঋণঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারে (যেখানে এর বিনিয়োগ বৃহত্তর বাজারে তারল্যের অভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে), যা ব্যাংকের কাউন্টার পার্টিকে তাদের বাধ্যবাধকতাগুলো সম্পাদন করার ক্ষমতাকে বাধা দেয়।

বিকল্প যোগাযোগ ব্যাবস্থা থাকতে হবে, যাতে কোনো ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক ব্যত্যয় ঘটলে তারা গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। একইভাবে একটি ব্যাংক অনুরূপ ক্ষেত্রে তার কর্মীদের সঙ্গে বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করবে।

ব্যবসায়িক ক্রিয়াকলাপ আবার শুরু করার জন্য মূল কর্মী ও সহকর্মীদের বিকল্প অবস্থানগুলো অবশ্যই নির্ধারণ করতে হবে। উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক ব্যত্যয়ের কার্যকারিতা ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক উপাদান, ব্যাংক ও কাউন্টার পার্টি এবং তার প্রভাব মোকাবিলার সঙ্গে সম্পর্কিত। উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক ব্যত্যয় ঘটলে ব্যাংক গ্রাহকের তহবিল ও জামানত গ্রাহকদের জন্য সহজলভ্য করার ব্যবস্থা নেবে।

নজিরবিহীন কভিড-১৯ মহামারী বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য, ব্যবসা ও শিক্ষা খাতে বাধা সৃষ্টি করেছে। এতে বাংলাদেশও সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের দরুন অর্থনৈতিক বিপর্যয় সামলানো কঠিন, কারণ বিশ্বব্যাপী পরিবহনব্যবস্থা বন্ধের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ বিঘিœত হয়েছে। তবে উদ্দীপক প্যাকেজগুলোর সুষ্ঠু সম্পাদনা নিশ্চিত করার জন্য অর্থ বাজারের তারল্য প্রবাহ নিরবচ্ছিন্ন বা পর্যাপ্ত হতে হবে। এটি মাথায় রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে রেপো রেট কমিয়ে নগদ রিজার্ভ প্রয়োজনীয়তা (সিআরআর) হ্রাস করে ও আমানতের তুলনায় আরও ঋণের পরিমাণ সমন্বিত করতে এডিআর বাড়িয়ে ব্যবস্থা নিয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৯ সালের আর্থিক প্রকাশের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোর দ্বারা শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ ঘোষণা নিষিদ্ধ করেছে।

আরএমজিতে কভিড-১৯-এর প্রভাব: এখন পর্যন্ত, বাংলাদেশ তৈরি পোশাকশিল্প (আরএমজি) প্রায় তিন বিলিয়ন ডলারের কার্যাদেশ বাতিল করেছে। এতে প্রায় দুই মিলিয়ন শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রায় চার মিলিয়ন মানুষ আরএমজি খাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। যেমন পশ্চাৎ সংযোগ শিল্প, আনুষঙ্গিক ও প্যাকেজিং কারখানা এবং পরিবহন খাত (উৎস: বিজিএমইএর ওয়েবসাইট)। আরএমজি খাতে লোকসান হ্রাস করতে সরকার এরই মধ্যে পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। তবে এ প্রাদুর্ভাব দীর্ঘায়িত হলে সরকারের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে ও রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশের বেশি আরএমজি খাতের মাধ্যমে আসে বলে এর পরিণতি বিপর্যয়কর হবে।

উল্লেখযোগ্য বিষয়: ২০২০ সালের এপ্রিলে মহামারির কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ অর্ধেকে নামে। প্রবাসী (মজুরি উপার্জনকারী) বাংলাদেশিরা এ মাসে এক দশমিক শূন্য আট বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছে। উল্লেখ্য, রেমিট্যান্স বাংলাদেশের জিডিপির ১২ শতাংশ। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা ৫২০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, যা রেমিট্যান্সের অর্ধেকের বেশি। প্রাক-মহামারি যুগে রপ্তানি আয় সাধারণত রেমিট্যান্সের তুলনায় দুই থেকে তিনগুণের বেশি হতো। গত বছরের জুলাইয়ে রেমিট্যান্স ছিল প্রায় এক দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলার এবং রপ্তানি ছিল প্রায় তিন দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলার। মহামারির প্রভাবে কয়েক হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন, কারণ বিশ্বজুড়ে চাকরি সংকুচিত হয়েছে।

ধারণা করা হয়, মজুরি উপার্জনকারী প্রবাসী বাংলাদেশিরা মহামারির মধ্যে উপার্জন থেকে নয়, বরং তাদের সঞ্চয় বা ঋণ থেকে অর্থ পাঠাচ্ছেন। এপ্রিলে দেশের তৈরি পোশাক (নিট, ওভেন) রপ্তানি করেছে মাত্র ৩৬৯ মিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে দুই দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার ছিল।

এ বছর শুধু এপ্রিল মাসটি বিবেচনা করে দেখা যায়, আমরা এরই মধ্যে একই সময়ে গত বছরের রপ্তানির তুলনায় দুই বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ বাংলাদেশি টাকায় ১৭ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি আয় হারিয়ে ফেলেছি। দীর্ঘকাল ধরে আমরা নেতিবাচক বাণিজ্যিক ভারসাম্য বয়ে চলেছি, মহামারি চলাকালীন পরিস্থিতি কেবল এ চিত্রকে আরও ভয়ংকর করে দেবে। তবে রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে আরএমজির ভূমিকা সব সময় ক্রমবর্ধমান। যদি দীর্ঘদিন লকডাউন পরিস্থিতি বিরাজ করে, তাহলে বাংলাদেশ কঠিন পরিস্থিতিতে পড়বে।

আমাদের অর্থনীতি পুরোপুরি ব্যাংকনির্ভর ও প্রতিটি কার্যক্রম ব্যাংক কর্মচারী বা কর্মকর্তার সহায়তায় পর্যবেক্ষণ করা উচিত। সুতরাং এটি এখানে উল্লেখ্য, ব্যাংকের কর্মচারী-কর্মকর্তাদের আরও দক্ষ হতে হবে। আমরা এমন একটি দেশে বাস করি যেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি, অসংখ্য নিরক্ষর মানুষের বসবাস এবং মধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্তরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এসব কারণে দীর্ঘদিন বাড়িতে থাকা কঠিন। আমাদের কাজ হলো, স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত সব নির্দেশনা মেনে চলা ও সবার উন্নতির জন্য আমাদের অর্থনীতি সচল রাখা।

সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, অর্থনীতি বিভাগ

শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ, ঢাকা

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..