দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

করোনাকালে এজেন্ট ব্যাংকিং সম্প্রসারণে ঊর্ধ্বগতি

শেখ আবু তালেব: করোনাকালে ব্যাংকিং কার্যক্রমের স্বাভাবিক গতি হারিয়েছিল। ব্যাংকগুলো পড়েছিল আমানত সংকটে। সে সময় তারল্য সংকট মেটাতে এজেন্ট ব্যাংকিং সম্প্রসারণে মনোযোগ দেয় ব্যাংকগুলো। এতে সাড়াও মেলে। গত এপ্রিল-জুন সময়ে দেশে এজেন্ট ব্যাংক ও আউটলেটের সংখ্যা বৃদ্ধির হার অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ।

এজেন্ট ব্যাংকিং নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে এমন তথ্য। জানা গেছে, বাংলাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং শুরু হয় বেসরকারি ব্যাংক এশিয়ার হাত ধরে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক এটির অনুমোদন দেয়।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে মূলত কোনো তফসিলি ব্যাংকের হয়ে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে। ব্যাংক হিসাব খোলা, টাকা উত্তোলন ও রেমিট্যান্স সেবা দিয়ে শুরু হলেও এখন আওতা বৃদ্ধি পেয়েছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের। ব্যাংকের মতো প্রায় সকল কার্যক্রমই এজেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালনা করা যায়। মূল ব্যাংকের কাছ থেকে কমিশন ও সেবা ফি’র মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং চলে। এতে কর্মসংস্থানও হচ্ছে গ্রামের তরুণদের।

তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২৮টি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সারা দেশে ব্যাংকগুলোর আট হাজার ৭৬৪টি এজেন্ট রয়েছে। এর অধীনে ১২ হাজার ৪৪৯টি আউটলেট রয়েছে। জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে হিসাব সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৩ লাখ ৫৮ হাজার ১৯০টি। এর মধ্যে ৪৬ শতাংশই নারীদের। নারী হিসাবধারীর ৮৭ শতাংশই গ্রামীণ এলাকায় বসবাসরত।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জুন পর্যন্ত ১০ হাজার ২২০ কোটি টাকার আমানত সংগ্রহ করেছে ব্যাংকগুলো। অপরদিকে এর মাধ্যমে ৭২০ কোটি ৫৪ লাখ টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়। শুধু আমানত ও ঋণ বিতরণই নয়, রেমিট্যান্স বিতরণেও ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে এজেন্ট ব্যাংক। জুন পর্যন্ত ২৬ হাজার ৬৫০ কোটি টাকার রেমিট্যান্স বিতরণ করা হয়।

যদিও আমানত সংগ্রহেই বেশি মনোযোগ ব্যাংকগুলোর। কিন্তু ঋণ বিতরণের হার এখনও সন্তোষজনক অবস্থায় পৌঁছেনি। জানা গেছে, করোনাকালে (এপ্রিল-জুন ’২০) আগের প্রান্তিকের চেয়ে এজেন্ট ব্যাংকের সংখ্যা বৃদ্ধি হয় ছয় দশমিক ১০ শতাংশ ও আউটলেট বৃদ্ধি চার দশমিক ৮৩ শতাংশ হারে।

করোনাকালে ব্যাংকের মোট হিসাবসংখ্যা বৃদ্ধির ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশই হয় এজেন্টের মাধ্যমে। এজেন্ট ব্যাংকগুলোয় হিসাব খোলার হার বৃদ্ধি হয় ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। এপ্রিল-জুন সময়ে আগের প্রান্তিকের চেয়ে ঋণ বিতরণের হার বৃদ্ধি পায় ছয় দশমিক ৯২ শতাংশ ও আমানত বৃদ্ধি পায় ১৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

মূলত ব্যাংকের শাখা পরিচালনার চেয়ে এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যয় তুলনামূলক অনেক সাশ্রয়ী। গ্রাম ও শহরের অনেক এলাকায় শাখা পরিচালনা করলে লোকসান গুনতে হচ্ছে। সহজে লাভে ফেরা যায় না। কয়েক বছরের মধ্যে শাখার স্থান পরিবর্তন করতে হয় ব্যাংকগুলোর। এতেও খরচ বাড়ে। এসব বিবেচনায় কম জনবল ও ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে এজেন্ট ব্যাংকিং ধারণা চালু করে ব্যাংক এশিয়া।

এজন্য শহরের চেয়ে গ্রামীণ এলাকায় ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম। এতে ব্যাংকগুলোর পরিচিতি ও বিস্তৃতি গ্রামের হাটবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জুনের চেয়ে গত জুন শেষে এক বছরে এজেন্ট বৃদ্ধি পায় ৪৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ। একই সময়ে আউটলেট বৃদ্ধি পায় ৪৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ ও হিসাব দ্বিগুণের বেশি ১১৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

আলোচিত সময়ে আমানত বৃদ্ধি পায় ৯৩ দশমিক ৪০ শতাংশ। সহজলভ্য হওয়ায় ঋণ চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে ২০৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ। বর্তমানে মোট এজেন্টের ৮৬ শতাংশ ও আউটলেটের ৮৮ শতাংশই গ্রামীণ এলাকায়। শহরের চেয়ে গ্রামীণ এলাকায় এজেন্ট সংখ্যা বাড়াচ্ছে ব্যাংকগুলো।

এজেন্ট ব্যাংক ও আউটলেট বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় নেতৃত্ব দিচ্ছে পাঁচটি ব্যাংক। মোট এজেন্ট ও আউটলেটের ৮১ দশমিক ২৫ শতাংশই হচ্ছে পাঁচ ব্যাংকের অধীনেই। এজেন্ট ব্যাংকিং হিসাবের ৯০ দশমিক ৭৬ শতাংশই এসব ব্যাংকের।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংক এশিয়ার হাত ধরে এগোলেও আউটলেট সংখ্যার শীর্ষে রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। বর্তমানে ব্যাংকটির আউটলেটের সংখ্যা হচ্ছে চার হাজার ৫৬টি, যা মোট সংখ্যার ৩২ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এরপরই রয়েছে ব্যাংক এশিয়া। এছাড়া তৃতীয় অবস্থানে ইসলামী ব্যাংক, চতুর্থ দ্য সিটি ব্যাংক ও পঞ্চমে রয়েছে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক।

অপরদিকে আমানত সংগ্রহে শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট। এ মাধ্যমে ব্যাংকটি দুই হাজার ৬১৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা সংগ্রহ করেছে গত জুন পর্যন্ত, যা এজেন্ট ব্যাংকিয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত মোট আমানতের ২৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ। আমানত সংগ্রহে দ্বিতীয় অবস্থানে ডাচ্-বাংলা। এজেন্ট ব্যাংকিয়ের মোট আমানতের ১৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ সংগ্রহ করেছে ব্যাংকটি। এছাড়া ব্যাংক এশিয়া ১৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ ও অগ্রণী ব্যাংক ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ সংগ্রহ করেছে।

আমানত ও আউটলেট সংখ্যায় শীর্ষে না থাকলেও ঋণ বিতরণে প্রথমে রয়েছে ব্যাংক এশিয়া। ব্যাংকটি এজেন্টের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৩৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে। এরপরই রয়েছে ব্র্যাক, দ্য সিটি ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক।

করোনার প্রাদুর্ভাবে বছরের শুরু থেকেই ব্যাংকিং কার্যক্রমের গতি কমেছে। বিশেষ করে শহরে প্রাদুর্ভাব বেশি থাকায় চলাচল কমিয়েছিল মানুষ। এতে আমানত সংগ্রহে ভাটা পরে ব্যাংকগুলোর। কিন্তু গ্রামীণ এলাকায় প্রকোপ তুলনামূলক কম দেখা দেওয়ায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে মনোনিবেশ করছে ব্যাংকগুলো। উদ্যোগের ফলে গ্রামীণ পরিসরে যেমন ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে যাচ্ছে, ঠিক তেমনি ব্যাংকগুলোও আমানত সংকট কিছুটা কাটিয়ে উঠতে পারছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..