দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

করোনাকালে নারীর প্রতি সহিংসতা: মিলবে মুক্তিও

. জাভেদ ইকবাল: সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ। উন্নয়নের সূচকগুলো ছিল ঊর্ধ্বমুখী। উন্নয়নের রানওয়ে অতিক্রম করে ছুটে চলেছিল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা। ঠিক সেই মুহূর্তে এক অদৃশ্য অনুজীব করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী হানা দিয়ে অগ্রযাত্রায় বড় একটা ধাক্কা দিল। মাসের পর মাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকল। দিনের পর দিন জরুরি পরিষেবা বাদে অফিস-আদালত বন্ধ রাখতে হলো। ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ল। কর্মসংস্থানের ওপরও আঘাত পড়ল। কর্মহীন হয়ে পড়লেন অনেক কর্মীসহ অনেক শ্রমিক। গৃহকর্মে নিয়োজিত নারীরাও তাদের কর্মের গৃহে প্রবেশের অনুমতি হারালেন। রুদ্ধ হলো তাদের আয়ের পথ। এর প্রভাব যেমন পেটের ওপর পড়ল, তেমনি প্রভাব পড়ল মন ও মানসিকতায়ও। এসব ধকল সামলাতে নারীর প্রতি অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতা শুরু হলো। এই সহিংসতা শুধু গৃহে সীমাবদ্ধ না থেকে কর্মস্থলেও সংক্রমিত হলো।

গার্লস অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্সের সহযোগিতায়ও জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল যৌথভাবে এক জরিপ পরিচালনা করে জানিয়েছে, করোনাকালে নিজ কর্মস্থলে আট দশমিক ৮৯ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৯ শতাংশ নারী ছয় থেকে ১০ বার যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। দেখা গেছে কোনো না কোনোভাবে শতভাগ নারীই যৌন হয়রানির শিকার হন। তাদের মধ্যে ৪১ দশমিক ৪৮ শতাংশ নারী দুই থেকে তিনবার, ২৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ নারী চার থেকে পাঁচবার এবং ২২ দশমিক ৯৬ শতাংশ নারী দুই থেকে তিনবার করে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

নারী নির্যাতনের প্রধান কারণ নারীদের মানুষ হিসেবে গণ্য না করা। করোনার সময়ে নারী-পুরুষ সবাইকে ঘরবন্দি অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। যেকোনো ধরনের দুর্যোগ নারী ও পুরুষকে ভিন্ন মাত্রায় প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের মতো সমাজব্যবস্থায় নারীর জীবন ও স্বাধীনতা শুধু পরিবার নয়, বরং গোটা সমাজই নির্ধারণ করে। স্বাভাবিক সময়ে পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী নির্যাতনের শিকার হন। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, করোনাকালে এই সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। করোনায় নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার কারণে জাতিসংঘ একে কভিড-১৯-এর ছায়া মহামারি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সারা বিশ্বে স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত কাজে নিয়োজিত লোকবলের মধ্যে ৯০ শতাংশই নারী। কিন্তু দুঃখের বিষয়, নারী যেমন একদিকে ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে নিজেরাই নির্যাতন নামক ভাইরাসের শিকার হচ্ছে। অর্থাৎ এই দুর্যোগেও আমরা নারীর প্রতি মানবিক হতে পারছি না।

বেসরকারি সংস্থা ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’-এর তথ্যমতে, গত এপ্রিল মাসে লকডাউন চলাকালে দেশের ২৭টি জেলায় চার হাজার ২৪৯ নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে এক হাজার ৬৭২ নারীর ক্ষেত্রে এমন ঘটনা প্রথম। ৮৪৮ নারী তার স্বামীর দ্বারা নির্যাতিত এবং এর বাইরেও ধর্ষণ, নারী হত্যা ও যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনা তো রয়েছেই। এপ্রিলের চেয়ে মে মাসে নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে ৩১ শতাংশ। করোনাকালে নারী নির্যাতন শুধু দরিদ্র নয়, বরং উন্নত দেশগুলোকেও প্রভাবিত করছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা বেড়ে গেছে।

সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের তথ্যমতে, লকডাউনের প্রথম মাসে ভারত ও তুরস্কে নারী নির্যাতনের ঘটনা দ্বিগুণ বেড়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম মাসে ৯০ হাজার লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার অভিযোগ এসেছে। অস্ট্রেলিয়ার সরকারের কাছে অনলাইনে সাহায্য প্রার্থনার হার বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। ফ্রান্সে ঘরোয়া নির্যাতন বেড়েছে ৩২ শতাংশ। যুক্তরাজ্যে সরকারি হটলাইনে নারীদের নির্যাতনের অভিযোগ ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। এদিকে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নারীদের অবস্থা তো আরও শোচনীয়। অথচ আমাদের ধারণা হয়েছিল, দৈনন্দিন ব্যস্ততা ছেড়ে লকডাউনের কারণে দাম্পত্য জীবনে পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার ফলে পরিবারের পারস্পরিক বোঝাপড়ায় উন্নতি ঘটবে, কিন্তু বাস্তবতা উল্টো।

পুরুষেরা অধিকাংশ সময় ঘরে থাকার ফলে তাদের প্রতি দিনের স্বাভাবিক কর্মে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। অনেকেরই জীবন ও জীবিকা নিয়ে দুশ্চিন্তা বেড়ে গেছে। অনেকে কর্মহীন হয়ে পড়েছে এবং কর্মসংস্থান না থাকায় অর্থ সংকটে ভুগছে। ফলে তাদের মধ্যে অবসাদ, মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা বেড়ে যাচ্ছে। অনেকে তখন মেজাজ হারিয়ে নারীর প্রতি নির্যাতন করছে। আবার অনেকে এসব কিছুর জন্য নারীকেই দায়ী করছে। গ্রামে এ অবস্থা আরও খারাপ। অনেক পরিবার চরম খাদ্য সংকটে ভুগছে। আর্থিক দুরবস্থার ফলে তারা অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। তারা ভাবছে, একটা বোঝা অন্তত কমে গেল, যার ফলে করোনাকালে বেড়ে গেছে বাল্যবিয়ের ঘটনাও। এভাবে সবকিছুর জন্যই নারীদের নির্যাতিত হওয়ার পেছনে মূলত কাজ করছে যুগ যুগ ধরে চলা প্রচলিত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি।

করোনাকালে নারীর প্রতি সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। নারী-পুরুষ দুজনেই মানুষÑএই সত্যটি মাথায় রেখে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সবার দৃঢ় পদক্ষেপ ও পুরুষদের বলিষ্ঠ ভূমিকা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। নারী নির্যাতন একটি অপরাধ। এ বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা দরকার। করোনার স্বাস্থ্যবিধি-বিষয়ক সচেতনতার পাশাপাশি পারিবারিক সম্প্রীতি ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ বিষয়ক বার্তা ব্যাপকহারে প্রচার করতে হবে। নারী শিক্ষার যে অগ্রগতি এতদিন হয়েছে, তা ধরে রাখার জন্য কন্যাশিশুদের বিদ্যালয়ে ফেরত আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। তথ্যচিত্র, নাটক প্রভৃতির মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। করোনাকালে অনেক কন্যাশিশু বিদ্যালয় থেকে ঝরে গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। পারিবারিক সহিংসতা ও বাল্যবিয়ে রোধ করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও জোরদার ভূমিকা রাখতে হবে।

ধর্মীয় অনুশাসন মেনে নারীকে সঠিক মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে এখন সময় এসেছে মন-মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার। নারী নির্যাতন বন্ধে অভিভাবক মহলের সংকীর্ণ মানসিকতায় পরিবর্তন আনা জরুরি। পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসা জাগ্রত রাখতে হবে। প্রচলিত আবদ্ধ সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও চর্চা পরিবর্তনের মাধ্যমে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করতে হবে। বৈষম্যের মূল কারণ বের করে সমাধান করতে হবে এবং মেয়েদের প্রকৃত স্বাধীনতা দিতে হবে। পুরুষ যেমন নারীর প্রতিপক্ষ নয়, তেমনি নারীও পুরুষের প্রতিপক্ষ নয় পরিবারের সবার মধ্যে এই উপলব্ধি জাগ্রত করতে হবে। সহিংসতা বন্ধে ৯৯৯ ও ৩৩৩ নম্বরগুলোকে আরও জনপ্রিয় করার জন্য প্রচার চালাতে হবে। নারী উদ্যেক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ এবং প্রয়োজনে প্রণোদনার ব্যবস্থা করে নারীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে তরুণ প্রজš§কে উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন।

কভিডকালে বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বেড়েছে বাল্যবিয়েও। গত চার মাসে ৩০৭ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। মোট সহিংসতার শিকার হয়েছে ৭৮৮ জন। তাদের মধ্যে রয়েছে ৪৫৭ নারী ও ৩৩১ শিশু। এছাড়া এই সময়ে ১৮টি বাল্যবিয়ের ঘটনা ঘটেছে। এদিকে করোনাকালে সংশ্লিষ্টদের কাছে অভিযোগ করতে না পারায় সংহিসতা বাড়ছে বলে একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম।

বিশিষ্টজনরা বলেন, পৃথিবীর সব সমাজে যৌন হয়রানিসহ নারীর প্রতি খারাপ আচরণ বিদ্যমান। তবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এর ব্যাপকতা বেশি। নারীর প্রতি পুরুষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মনোভাবই এর মূল কারণ। তাই মানুষের মানসিকতার মনোভাব পরিবর্তন করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া বলেন, নারীর প্রতি যৌন হয়রানি সারা বিশ্বে একটি ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। আমরা একটি সমন্বিত আইন প্রণয়নের চেষ্টা করে যাচ্ছি। আশা করছি এই বছরের মধ্যে আইনটি সংসদে উপস্থাপন করতে পারব। বাংলাদেশে নারীদের প্রতি যৌন হয়রানি, বিশেষ করে করোনা মহামারিকালে আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মজীবী নারীদের যৌন হয়রানির বিষয়ে ওয়েবিনারে জরিপের ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে ডেপুটি স্পিকার এ কথা বলেন। গত আগস্ট মাসে এটি অনুষ্ঠিত হয়। আইনটি প্রণয়ন করা হলে নারীর প্রতি সহিসংসতা অনেকাংশে কমবে বলে আমরা আশা রাখি। আমরা আশা রাখি, এর ফলে মিলবে মুক্তিও। পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..