মত-বিশ্লেষণ

করোনাকালে বন্ধ হোক নারী নির্যাতন

বর্তমানে বহুল আলোচিত বিষয় হচ্ছে নভেল করোনাভাইরাস। করোনাভাইরাসজনিত রোগ (কভিড) প্রথমে চীনে থাকলেও বর্তমানে এ রোগের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। বাংলাদেশও একপ্রকার স্থবির। কভিড সংক্রমণ কমাতে বন্ধ রাখতে হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য। তাতে হতদরিদ্র ও নি¤œ আয়ের লোকজননের দুর্ভোগ বাড়ে। জনস্বার্থে সীমিত পরিসরে খোলা হয়েছে কিছু প্রতিষ্ঠান। কাজের চাপ কম। তাই ঘরেই থাকতে হয় অধিকাংশ মানুষ বিশেষ করে পুরুষদের। কারণ অধিকাংশ পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি পুরুষÑস্বামী, ভাই কিংবা ছেলে। তাদের ঘরে অবস্থান যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে নারীদের জন্য। 

নারী নির্যাতন আমাদের দেশে যেন নিত্যদিনের ঘটনা। খবরের কাগজ বা টেলিভিশনে চোখ পড়লেই দেখা যায় নারী নির্যাতনের ঘটনা। কখনও বা স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন, কখনও বা শ্বশুরবাড়ির লোকজন দ্বারা নির্যাতন, নিগ্রহের শিকার। আশাবাদী ছিলাম লকডাউনে নারী নির্যাতন কমবে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, তার উল্টো।

বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনমের মতে, এই লকডাউনে নারী নির্যাতন ২০ শতাংশ বেড়েছে। তাহলে কি এই লকডাউনেও মুক্তি নেই নারীদের। প্রতিনিয়তই বেড়ে চলছে দেশে নারী নির্যাতন। 

এমজেএফ ২৭টি জেলায় একটি জরিপ পরিচালনা করে। তাতে উঠে এসেছে এসব জেলায় চার হাজার ২৪৯ জন নারী সহিংসতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৮৪৮ জন, মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে দুই হাজার ৮ জন, যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৮৫ জন, অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩০৮ জন। জরিপে অংশ নেওয়া এক হাজার ৬৭২ জন বলেন, এর আগে তারা কখনও নির্যাতনের শিকার হননি। এ জরিপ থেকে স্পষ্ট বলা যায়, এই লকডাউনে নারী নির্যাতন বেড়েছে।

করোনাকালে পুরুষরা ঘরে অবস্থান করছেন। ফলে তাদের মাঝে মানসিক অবসাদ, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার অবক্ষয়, পারিবারিক কলহ, অর্থনৈতিক সংকট, যৌতুকের প্রবণতা, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব প্রভৃতি বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে নারীর ওপর।

গবেষকদের ধারণা, এই লকডাউনে পুরুষের আর্থিক সংকট, ভয়, হতাশা, নিদ্রাহীনতা প্রভৃতি বেড়েছে আর যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পরিবার ও নারীর ওপর। মুখ বুজে সব সহ্য করছে নারীরা। পরিসংখ্যান যা তথ্য দিচ্ছে তার থেকে আরও বেশি হচ্ছে নারী নির্যাতন। আমাদের দেশের নারীরা মানসম্মান খোয়ানোর আশঙ্কায় নিজের নির্যাতিত হওয়ার কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করেন না।

নারী নির্যাতনের হাতেগোনা ঘটনাই গণমাধ্যমে আসছে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পাশে দাঁড়ানো বিভিন্ন সংগঠনের সহায়তায়। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের নিজস্ব অনুসন্ধানেও নারী নির্যাতনের খবর উঠে আসছে। তবে কি নিস্তার নেই নারীদের! লকডাউনেও শুনতে হচ্ছে নারী নির্যাতনের ঘটনা। এটি দুঃখজনক। দেশের উন্নয়নে নারীরও ভূমিকা রয়েছে। সরকার নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্ব দিচ্ছে, নারী উদ্যোক্তাদের বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করছে। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। তাদের উন্নয়নের বাইরে রেখে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই নারীর অসম্মান হয়, এমন কাজ থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। আইন করে নারী নির্যাতন বন্ধ করা হয়তো সম্ভব। কিন্তু তার চেয়ে প্রয়োজন পুরুষের মানবিকতা। 

খন্দকার নাঈমা আক্তার নুন

শিক্ষার্থী

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..