মত-বিশ্লেষণ

করোনাভাইরাসের বিস্তার: বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার স্বরূপ

. নাদিম আকতার: নভেল করোনাভাইরাস নামেই কভিড-১৯ অধিক পরিচিত। এটি নতুন করে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার স্বরূপ আমাদের সামনে উম্মোচন করল। আমরা যখন বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ, জলবায়ু পরিবর্তন, শরণার্থী সমস্যা, আঞ্চলিক সংঘাত, কিংবা যুদ্ধপরিস্থিতি নিয়ে বৈশ্বিক নিরাপত্তার গণ্ডি নির্ধারণ করছি, ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের সামনে আসে ভয়ংকর প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের খবর। এই নতুন ভাইরাসটির উৎপত্তি ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের শেষে মধ্যচীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান শহরে। বলা বাহুল্য, পড়াশোনার সুবাদে এই উহান শহরে আমার তিন বছর থাকার সুযোগ হয়েছে। সেখানে থাকার কল্যাণে অনেক চীনা নাগরিক এবং সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি অনেকের সঙ্গেই নিয়মিতভাবে যোগাযোগ ছিল।

শুরুতে চীন সরকারের তাৎক্ষণিক উদ্যোগ ও কর্মচাঞ্চল্য আশাবাদ জাগালেও কিছুদিনের মধ্যে যখন ভাইরাসটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চীনের বিভিন্ন শহরে ছড়াতে থাকে, তখনই নড়েচড়ে বসে চীন কর্তৃপক্ষ এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে চীনে বসবাসরত উহান শহরের স্থায়ী বাসিন্দাসহ নানা পেশায় নিয়োজিত বিদেশিদের মধ্যে। এর ফলে তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিজ নিজ দেশ দ্রুত তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশও দ্রুততার সঙ্গে উহানে বসবাসরত বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল লক্ষ করার মতো। যেকোনো আকস্মিক মহামারি কিংবা সংঘাতের ঘটনায় তাদের স্বভাবজাত তৎপরতার মতো ভ্রমণ-সতর্কতা জারি এবং তড়িঘড়ি করে তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়াসহ নানা ধরনের আলোচনায় তাদের স্বভাবগত শুচিবায়ুসুলভ স্বভাব পরিলক্ষিত হয়। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, উহান থেকে নিজেদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে এক ধরনের প্রতিযোগিতায় নামে ইউরোপের শিল্পোন্নত দেশগুলো। এ প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজের দেশের নাগরিকদের প্রতি যেমন দায়বদ্ধতা ছিল, একই সঙ্গে নিজেদের জ্ঞান, বিজ্ঞান ও চিকিৎসায় শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের আকাক্সক্ষাও তাদের ছিল। এক্ষেত্রে চীনের প্রতি তাদের স্বভাবজাত অবজ্ঞার দিকটি পরিস্ফুট হয়। এ কথা আজ পরিষ্কার যে, অন্য দেশগুলো এই ভাইরাসটির মহামারি হিসেবে নিয়ে গভীরভাবে হিসাবনিকাশ করেনি এবং সমস্যাটিকে চীনের সমস্যা হিসেবেই দেখেছে। আর তাই বেশিরভাগ দেশই তড়িঘড়ি করে তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার মধ্যেই এই সমস্যার চটজলদি সমাধান খুঁজে নিয়েছিল। এজন্য এখন তাদের চড়া মূল্য চুকাতে হচ্ছে। নিজের দেশের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে তাদের ফিরিয়ে নিতে কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু সমস্যা হয়েছে ভাইরাসটির ব্যাপক সংক্রমণের বিষয়ে ভুল সমীকরণবশত গা-ছাড়া ভাব, অবহেলা ও অতি আত্মবিশ্বাসের দরুন। ইতালির বর্তমান পরিস্থিতি তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে খোলনলচে পাল্টে গেছে এবং বিশ্ব এক নতুন বাস্তবতায় উপনীত হয়েছে। বর্তমানে প্রাণঘাতী ভাইরাসটি আর চীনের সমস্যা নয়, সমস্যা সমগ্র মানবসভ্যতার। এখন প্রশ্ন শুধু চীনের সক্ষমতা নিয়ে নয়, প্রশ্ন গোটা বিশ্বের সক্ষমতা নিয়ে।

এরই মধ্যে ভাইরাসটি হানা দিয়েছে ইউরোপ-আমেরিকাসহ পৃথিবীর ১৮৩টি দেশে। এই মহামারিতে এরই মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে দুই লাখ ৫৮ হাজার ৪৩৯ জন এবং মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ৫৪১ জন, যার মধ্যে ইতালিতে তিন হাজার ৪০৫ জন, চীনে তিন হাজার ২৪৮ জন ও যুক্তরাষ্ট্রে মারা গেছে ২১৯ জন। আজ বৈশ্বিকভাবে করোনা এতটাই ভয়ংকর রূপ পরিগ্রহ করেছে যে এটি মোকাবিলায় পরাক্রমশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত হিমশিম খাচ্ছে। এর কারণ তাদের অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র, কিংবা যুদ্ধবিমান পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে অবস্থিত মানুষকে নিশানা করে খতম করতে পারলেও করোনাভাইরাসের মতো এত বড় শত্রুকে পরাস্ত করতে পারছে না। এই না পারার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার স্বরূপ। আজ এই সংকটে সম্মুখসমরে নেই গোলাবারুদভর্তি সামরিক যানে অস্ত্রসজ্জিত বাহিনী কিংবা ন্যাটোর মতো কোনো আঞ্চলিক বাহিনী; পক্ষান্তরে আছে চিকিৎসক, সেবিকা, ফার্মাসিস্ট, শিক্ষক, গবেষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মালিক ও কর্মচারী, যাদের পেছনে আমাদের সামরিক কিংবা অন্যান্য খাতের থেকে বিনিয়োগ নেহাত কম।

আজ এই বাস্তবতার সম্মুখীন আমরা হয়েছি যে, নিজেদের সবদিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ জাতি হিসেবে দাবি করা রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজেদের দেশ ভ্রমণে অন্যদের প্রতি কোনো সতর্কতা জারি করছে না, বরং তাদের নিজের দেশকেই সেই ঘোষণার আওতায় আনতে হয়েছে। এছাড়া কভিড-১৯ ভাইরাসের সবচেয়ে চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হলো এটি এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রতি হাতছানি দিচ্ছে, যা উন্নত, উন্নয়নশীল, স্বল্পোন্নত ও অনুন্নত প্রত্যয়ে বিভক্ত বিশ্বের মধ্যে কোনো বৈষম্য করছে না। চীনের মতো দ্বিতীয় অর্থনীতির দেশ, যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তি, কিংবা ইতালি, জাপান ও জার্মানির মতো শিল্পোন্নত দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় উদ্ভূত পরিস্থিতি বৈশ্বিক মানবনিরাপত্তার জন্য সর্বজনীন উদ্যোগ নেওয়া যে জরুরি, তার প্রতি ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমরা যতই উন্নত, উন্নয়নশীল, শিল্পোন্নত, কিংবা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা করে আমাদের মধ্যে বিভাজন রেখা টেনে দিই না কেন দিন শেষে আমাদের সবার সমস্যা এক ও অভিন্ন। বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবায় ঝুঁকি মোকাবিলা তথা নতুন নতুন রোগের সংক্রমণ মোকাবিলায় সক্ষমতা তৈরিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মতো সর্বজনীন বিষয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। এই দুটি বিষয় একটি আরেকটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এ কথা বলার সময় এসে গেছে যে, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামরিক উৎকর্ষ, উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক পরিকল্পনা, উচ্চ মাথাপিছু আয়, কিংবা ব্যাপক উৎপাদনশীলতাই শেষ কথা নয়। যেখানে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ নিজেদের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিধানের অজুহাতে বিলিয়ন ডলার সামরিক খাতে বিনিয়োগ করে, সেখানে করোনাভাইরাসের মতো প্রাণঘাতী ভাইরাস মোকাবিলায় কতটুকু প্রস্তুতি রয়েছে তাদের? এ প্রশ্নটি আজ বড় আকারে দেখা দিয়েছে, কারণ এ প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বৈশ্বিক নিরাপত্তা তথা মানবনিরাপত্তা ব্যবস্থার শুভংকরের ফাঁকির দিকটি।

আমাদের উপলব্ধিতে আসা জরুরি যে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় করপোরেট ক্যাপিটালিজমের মাধ্যমে আমরা যেভাবে নিজেদের জিডিপি, জিএনপি, ডলার ও পাউন্ডে আবদ্ধ করে ফেলেছি, সেখানে করোনাভাইরাসের মতো মহামারির সংক্রমণ এই চরম বাস্তবতার দিকটিতেই ইঙ্গিত করে যে, আমাদের ব্যাংকের ভোল্টে রক্ষিত ডলার, আমাদের অত্যাধুনিক অস্ত্রভাণ্ডার, কিংবা অত্যাধুনিক প্রযুক্তিÑকিছুই এই মহামারি মোকাবিলায় খুব একটা কাজে লাগছে না। এই সত্য যত তাড়াতাড়ি আমরা অনুধাবন করতে পারব, তত তাড়াতাড়ি এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার সন্ধান পাব, যে ব্যবস্থায় সব বিনিয়োগের উৎস হবে মানুষÑসর্বোপরি পৃথিবী হবে বাসযোগ্য।

ফ্রিল্যান্স লেখক, গবেষক

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..