Print Date & Time : 20 October 2020 Tuesday 5:59 pm

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সম্পৃক্ততা জরুরি

প্রকাশ: June 2, 2020 সময়- 11:32 pm

এস এম নাজের হোসাইন: নভেল করোনাভাইরাস মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর দিন-রাত নিরবচ্ছিন্নভাবে কঠোর পরিশ্রম করার বিষয়টি পত্রপত্রিকা ও মিডিয়ায় বেশ জোরেশোরে আলোচনায় স্থান পাচ্ছে। দলের নেতাকর্মীরা অনেকেই স্বেচ্ছায় হোম কোয়ারেন্টাইনে চলে যাওয়ার খবর সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে। অতিসম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী করোনা মোকাবিলায় বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। তার মধ্যে অন্যতম হলো দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে ত্রাণ সমন্বয় কমিটি গঠন করা। বিভিন্ন দল ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সর্বদলীয় নাগরিক কমিটি গঠন, আবার ত্রাণ কার্যক্রমে নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বর্তমান সরকারের আমলে পাশকৃত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন-২০১২তে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে দুর্যোগ মোকাবিলা ও প্রস্তুতিতে সরকারের বড় অংশীদার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নানা কারণে সরকারের সঙ্গে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) কিছুটা সম্পর্কের ভাটা পড়ে। অনেকের মতে, এনজিও সম্পর্কে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপনই এই সম্পর্ক অবনতির নেপথ্যের কারণ।

সাদামাটাভাবে Non-‡overnment Organization -এর সংক্ষিপ্ত রূপ হচ্ছে ‘এনজিও’। মুক্তিযুদ্ধের আগে এ ভূখণ্ডে এনজিও নামের উপস্থিতি তেমন ছিল না। তবে সমাজহিতৈষী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এ দেশ ও সমাজে সবসময় ছিল এবং এখনও আছে। এরা মূলত অলাভজনকভাবে চ্যারিটিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত। কিন্তু কখনোই ধারাবাহিকভাবে আর্থসামাজিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এরূপ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাজের ধরন ও চরিত্র প্রয়োজনের তাগিদেই বদলাতে থাকে।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর কাজের সঙ্গে যোগ হতে থাকে উন্নয়নের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ, বৈদেশিক সাহায্য, জন্মাতে থাকে পেশাদারিত্বের তাগিদ এবং উদ্যোগের ধারাবাহিকতা, নিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তার বিধান। সাধারণ অর্থে এনজিও (অলাভজনক বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন) বলতে সেসব সংগঠনকে বোঝায় যারা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ধারাবাহিকভাবে সম্পৃক্ত। তবে দেশে এনজিওদের শীর্ষ সমন্বয়কারী সংস্থার এডাবের মতে, তাদেরকেই এনজিও বলে বিবেচনা করেÑযারা সংগঠন হিসেবে সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত, নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরিচালিত, যাদের নির্দিষ্ট অফিস আছে, পূর্ণকালীন কর্মী আছে, ধারাবাহিকভাবে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি, কর্মএলাকা ও উপকারভোগী বা অংশীজন আছে, ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ও এর প্রয়োগ আছে, বার্ষিক কার্যক্রমের প্রতিবেদন আছে, বার্ষিক বাজেট ও আয়ের উৎস আছে, নিয়মিত বার্ষিক অডিট হয় এবং যাদের উন্নয়ন কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা ও পেশাদারিত্বের ছাপ আছে, আছে কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।

এসব বিবেচনায় সক্রিয় বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন বা এনজিওর সংখ্যা সারা দেশে দুই-আড়াই হাজারের বেশি নয়। অথচ বুঝে বা না বুঝে অনেকেই বলে থাকেন বাংলাদেশে লক্ষাধিক এনজিও কর্মরত আছে। অনেক সময় সমবায় সমিতি, মাল্টিপারপাস সোসাইটি কো-অপারেটিভ সোসাইটি, ক্লাবকেও এনজিও বলে থাকেন। এতে জনগণ বিভ্রান্ত হচ্ছে। ক্ষুণœ হচ্ছে প্রকৃত এনজিওদের ভাবমূর্তি। 

আবার দেশে এই বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মাঝেও দুটি পৃথক ধারা চলমান রয়েছে। একটি অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন ধারা। অন্যটি ব্যবসা-বাণিজ্যভিত্তিক ধারা। অধিকারভিত্তিক ধারায় নারীর ক্ষমতায়ন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, মানবাধিকার, সুশাসন চর্চা, উপানুষ্ঠানিক ও কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ইত্যাদি বিষয় অধিক গুরুত্ব পায়। আর ব্যবসাভিত্তিক ধারায় ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম, বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। সে কারণে এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর আওতায় তিন হাজারেরও অধিক প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হলেও মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনার লাইসেন্সধারী এনজিওর সংখ্যা মাত্র ৭২৪। অথচ সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের কাছে ধারণা হলো এনজিও মানেই ক্ষুদ্রঋণের ব্যবসায়ী।

সে কারণে গ্রামীণ ব্যাংক বিতর্ক শুরুর পর থেকে সরকারের সঙ্গে এনজিও সেক্টরের শীতল সম্পর্ক বহমান রয়েছে। অথচ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী দেশ পুনঃগঠন থেকে শুরু করে স্বৈরচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন, চারদলীয় জোটের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলনে অধিকারভিত্তিক বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনগুলোর অবদান খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। এছাড়া ১৯৯১ সালের প্রলঙ্করী ঘূর্ণিঝড়, ১৯৯৮ সালের শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যা মোকাবিলা, দক্ষিণাঞ্চলে সিডর-আইলা মোকাবিলা, চট্টগ্রামে ২০০৭ সালে ১১ জুনের পাহাড়ধসের ঘটনায় এনজিওদের শীর্ষ সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান এডাব অত্যন্ত সফলভাবে তার প্রধান কার্যালয়ে জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সেল স্থাপন করে সরকার, দাতা সংস্থা ও এনজিওদের মাঝে সমন্বয় সাধন করেছিল।

সর্বশেষ কক্সবাজার জেলায় রোহিঙ্গাদের মানবিক ত্রাণ কাজেও বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনগুলো সরকারের পাশে থেকে মানবিক আবেদনে সাড়া প্রদান করেছে। বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার ওই সময়ে এনজিওদের অধিকারভিত্তিক ধারাকে রুদ্ধ করার জন্য তৎকালীন সমাজকল্যাণমন্ত্রী ও যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মুজাহিদকে দিয়ে অনেকগুলো কুটকৌশল অবলম্বন করেছিল। যার ফলে এনজিওদের শীর্ষ সমন্বয়কারী সংগঠন এডাবকে দ্বিখণ্ডিত করে এফএনবি নামক আরেকটি প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেন। আর এডাবের তৎকালীন চেয়ারপারসন কাজী ফারুক আহমদের বিরুদ্ধে ৫০টিরও অধিক মামলা রুজু করেন।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এনজিওগুলোকে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ঢালাওভাবে বাদ দেওয়া হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলাগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হলে বাতিল হয়। এছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজ উদ্দীনের আমলে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদে কয়েকজন এনজিও নেতাকে উপদেষ্টা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

এ খাতে বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে অধিকারভিত্তিক ধারার নেতৃত্বদানকারী প্রতিষ্ঠান মানবিক সাহায্য সংস্থা (এসএসএস) অন্তর্ধানের পর অপর প্রতিষ্ঠান প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রের কার্যক্রম স্থবির হওয়ার পর থেকে এ ধারাটি ক্রমেই দুর্বল হতে থাকে। আর সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তি ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার সহায়তা পেতে ক্ষুদ্র ঋণের তহবিল থাকা অত্যাবশ্যকীয় শর্ত হিসেবে জুড়ে দেওয়ায় ব্যবসাভিত্তিক ধারাটি রাষ্ট্রীয় ও দাতাগোষ্ঠীর আনুকুল্যে পুরোপুরি সফলভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পক্ষান্তরে অধিকারভিত্তিক ধারাটি দাতা সংস্থার অর্থায়ন সংকুচিত হওয়া ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে পতিত। ফলে এনজিওদের মানবিক উন্নয়ন কার্যক্রম চোখে না পড়ে ক্ষুদ্রঋণের বিষয়টি বারবার আলোচনায় আসে।

আর মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির জন্মের সময় চিন্তা করা হয়েছিল এই অথরিটি থেকে, যারা লাইসেন্স প্রাপ্ত হবেন তারা গ্রামাঞ্চলে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে; যা অনেকটাই বর্তমানে প্রচলিত এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আদলে। মানবিক উন্নয়ন কার্যক্রমটির সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা হ্রাস করা হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে পরবর্তীতে একই এনজিও সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নিয়ে সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করছে। আবার সেই এনজিওই মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির লাইসেন্স নিয়ে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম করছে, সরকারকে ট্যাক্স প্রদান করছে। বিষয়গুলো বৈপরীত্য হলেও সমাজকল্যাণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের নাগরিকদের করোনাভাইরাস মহামারিসহ যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য যা যা করা দরকার, তার সবই করার দায়িত্ব সরকারের। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনার দায়িত্ব সরকারের হাতে এবং তার প্রশাসনিক-প্রাতিষ্ঠানিক সব কর্মকাণ্ডের ব্যয় নির্বাহ হয় জনগণের করের টাকায়। এই গুরুতর জাতীয় দুর্যোগে জনসাধারণ প্রধানত সরকারের ওপরই ভরসা রাখতে চায়। ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ প্রত্যাশা করে, নাগরিকদের জীবন বাঁচাতে সরকার আন্তরিকভাবে সব বিষয়ে তৎপর হবে।

রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন সামাজিক ও নাগরিক সংগঠনগুলো বারবার তাগাদা দিয়ে আসছে এত বড় জাতীয় দুর্যোগ কার্যকরভাবে সামাল দেওয়া সরকারের একার পক্ষে অত্যন্ত দুরূহ কাজ। তবে সরকার নিজে এটা উপলব্ধি করেছে কি না তা বলা কঠিন। কারণ সমাজের অন্যান্য সব শক্তিকে যুক্ত করার তেমন কোনো উদ্যোগ সরকারি তরফে আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। এর একটা কারণ হতে পারে এই যে, রোগ সংক্রমণ, আক্রান্তদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও মৃত্যু সম্পর্কে তথ্যপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ সরকার নিজের হাতে রাখতে চায়। অথবা অন্যান্য রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি সামর্থ্য সম্পর্কেও সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের আস্থার অভাব। যদিও বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনগুলোর অন্যতম গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ইতোমধ্যে করোনা শনাক্তকরণ কিট উৎপাদনের অনুমতি পেয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারি সংগঠন ব্র্যাক এক লাখ লোকের খাবারের দায়িত্ব গ্রহণ, বিভিন্ন স্থানীয় এনজিওগুলোও করোনা আক্রান্ত কর্মহীন লোকের খাবার, স্যানিটাইজার কিট বিতরণসহ নানা উদ্যোগের তথ্য মিডিয়াগুলোতে প্রচার হচ্ছে। তবে সব ধরনের জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সঠিক তথ্যপ্রবাহের অপরিসীম গুরুত্ব দেশে দেশে, কালে কালে দুর্যোগ মোকাবিলায় অধিক গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে সরকারকে একাই করোনার মতো বৈশ্বিক মহামারির পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সমাজের সব পর্যায়ের অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে করোনাযুদ্ধে জয়ী হওয়ার প্রচেষ্টা নিতে হবে। আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ নানা ক্ষেত্রে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) খাতের অবদান দেশে-বিদেশে বিপুল প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নে এনজিও খাতের অবদানের বহু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও মিলেছে। পৃথিবীর বৃহত্তম বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা রয়েছে বাংলাদেশেই। এ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক, নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসসহ নানা ক্ষেত্রে কাজ করছে ছোট-বড় অজস্র বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলায় আমরা তাদের সেই সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিলে বিষয়টি অবশ্যই সহায়ক হবে।

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় অধিকারভিত্তিক এনজিওগুলোকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিতে হলে সরকারকেই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন-২০১২ এ সরকারের অন্যতম সহযোগী হিসেবে এনজিওগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর তাই এখন প্রয়োজন সরকারের পক্ষ থেকে এনজিওগুলোকে আস্থায় নিয়ে আসা। সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ক্ষুদ্র ঋনদান কার্যক্রমে জড়িত এনজিওদের মাধ্যমে বিতরণের জন্য তিন হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছেন। বিশেষজ্ঞ মহল এটাকে ইতিবাচক এবং তৃণমূল পর্যায়ে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল করতে বেশ সহায়ক হবে বলে মনে করছেন।

ঠিক একইভাবে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা, মৎস্য, কৃষি, প্রাণিসম্পদ খাতকে সচল করতে এনজিওগুলোকে সম্পৃক্ত করার সুযোগ রয়েছে। সরকারেরই উচিত এনজিওগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে কোন সংস্থা কোন ক্ষেত্রে সরকারকে কীভাবে সহযোগিতা করতে পারবে, তা নির্ধারণ করে তাদের যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া। জাতীয় পর্যায়ে এনজিওদের শীর্ষ সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান এডাবের সহযোগিতা কাজে লাগাতে পারে। তাদের সদস্য সংগঠন ও সমমনা অনেকগুলো সংগঠন ও ইস্যুভিত্তিক সমন্বয়কারী সংস্থাগুলোর নেটওয়ার্ক পুরো দেশের ইউনিয়ন পর্যায়ে পর্যন্ত বিস্তৃত আছে। আর এসব সংগঠনগুলো তৃণমূল পর্যন্ত করোনাভাইরাসের প্রতিরোধ ও সামাজিক-শারীরিক দূরত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির কাজে সহায়তা করতে পারে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও প্রতিরোধমূলক শিক্ষা এই মহামারি মোকাবিলার ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

ভারত ও পাকিস্তানে করোনাভাইরাস শনাক্তকরণের জন্য প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নমুনা সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তৃণমূল পর্যায়ে ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্র খোলার কাজে এনজিওদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। স্থানীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে কাজ করে এমন সব এনজিও এই কাজে অবদান রাখতে পারে। বাংলাদেশেও এমন উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। ত্রাণ বিতরণে উপকারভোগী নির্বাচন, ত্রাণসামগ্রী বিতরণ, সামাজিক-শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা ও জনসচেতনতামূলক-প্রতিরোধমূলক শিক্ষা কাজে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সহযোগিতা কাজে লাগানো যেতে পারে।

করোনাযুদ্ধে আমাদের বেসরকারি সংস্থাগুলোকে সহযোদ্ধা হিসেবে পেতে হবে। যেরকম এনজিওরা ইপিআইয়ের টিকা প্রদান, দুর্গম এলাকায় জš§ নিয়ন্ত্রণ, শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সেবা, শিক্ষা কার্যক্রমে সহায়কের ভূমিকা পালন করেছিল। এ জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে, বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও নিজ নিজ অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে দিতে এগিয়ে আসতে হবে।

আশার কথা ডায়রিয়ার প্রতিরোধ, শিশু মাতৃমৃত্যুর হার কমানো, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, ভূমিহীনদের মাঝে খাসজমি বরাদ্দ প্রদান, কৃষি উপকরণ, বীজ সার বিতরণ, শিশুর বিদ্যালয় ঝরে পড়া রোধ, শিশুশিক্ষার হার বৃদ্ধিসহ অনেকগুলো সামাজিক অগ্রগতি ও সামাজিক সূচকের উন্নয়নে সরকারের পাশে বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনগুলো সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন। ক্ষুদ্রঋণের সঙ্গে এনজিওরা জড়িত এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মানবজাতির অস্থিত্ব ও জাতীয় ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার কঠিন সংগ্রামে করোনাভাইরাস মহামারি সংক্রমণ রোধ ও সামাজিক অগ্রগতি ধরে রাখতে সামাজিক উন্নয়ন ও তৃণমূলে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার অধিকারভিত্তিক ধারার এনজিওগুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে। সরকারের করোনাভাইরাস মোকাবিলা কর্মকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ত করে জাতির উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখা ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্য আয়ের দেশে উত্তরণের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সহায়ক ক্ষেত্র তৈরিতে সব মহলকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। দুর্যোগ, সংকট ও ক্রান্তিকালে সব মহল ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেÑএটাই আমাদের সবার প্রত্যাশা।

লেখক: ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজুমারস

অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

[email protected]