মত-বিশ্লেষণ

করোনায় অর্থনৈতিক মুক্তাঞ্চল হিসেবে গ্রাম: সম্ভাবনা ও বাস্তবতা

নাদিম মাহমুদ: সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ আমার দৃষ্টিগোচর হয়। ‘করোনায় গ্রাম হতে পারে অর্থনৈতিক মুক্তাঞ্চল’ শীর্ষক ওই লেখায় প্রবন্ধকার ফারুক ওয়াসিফ গ্রামনির্ভর কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি যে এই সংকটকালে একটা ভরসার জায়গা হতে পারে, তা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তার এই তথ্যবহুল লেখায় শহরের বিপরীতে গ্রাম যে জাতির ক্রান্তিলগ্নে সব সময় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেই ইতিহাসের আলোকপাতও আছে। এই লেখাটি পড়ার পর প্রথম যে প্রশ্নটি আমার মাথায় এসেছে তা হলো, যে গ্রাম আর গ্রামের কৃষি আমাদের শেষ ভরসাস্থল, এই সংকটকালে যেটি হতে পারে আমাদের উত্তরণের অন্যতম পথ সেই গ্রামের কৃষি ও কৃষকের অবস্থা কেমন? অর্থনৈতিক মুক্তাঞ্চল গড়ে তুলতে যে সার্বিক কাঠামো তথা সুষ্ঠু বাজার ও বিপণন ব্যবস্থার দরকার, সেটি কি আদৌ গড়ে উঠেছে?

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা মাটি, আর মাটি কামড়ে পরে থাকা কৃষক, গৃহস্থ ও দিনমজুর বছরের পর বছর কীভাবে দিনাতিপাত করছে, সেটা জানার জন্য আমাদের নজর দিতে হবে সংবাদপত্রের কিছু খবরের শিরোনামে। কৃষক কি ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে এ বিষয়ে পাঠক প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হয়েছিল ওই দৈনিকে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বেশিরভাগ পাঠক জানিয়েছিলেন চালের দাম বেশি হলেও ধানের দাম পাচ্ছেন না কৃষক। ২০১৯ সালের মে মাসের দিনগুলোয় পত্রিকাটির কয়েকটি সংবাদের শিরোনাম‘ধানের দামের সঙ্গে কমছে কৃষকের ঈদ আনন্দ উৎসব’, ‘দাম না পেয়ে পাকা ধানে আগুন দিলেন কৃষক’, ‘হাওরে ধানে খুশি কৃষক’, ‘দাম নিয়ে চরম হতাশা’। এসব শিরোনাম শুধু কালির আঁচড়ে লেখা কিছু বাক্য নয়, হাজারো মানুষের স্বপ্নভঙ্গের আলেখ্যগাথা। চলতি বছরের চিত্র আরও ভয়ানক। শুধু কৃষি খাত নয়, এবার গ্রামীণ অর্থনীতির সব খাতেই মার খাচ্ছে কৃষক, খামারি, গ্রামীণ উদ্যোক্তা ও শ্রমজীবী মানুষ। লকডাউনে অচল পাইকারি বাজার থেকে শুরু করে গ্রামের হাটগুলো। হাজার হাজার পরিবহন শ্রমিক বেকার বসে আছে। কৃষক তার উৎপাদিত ফসল, সবজি, ফল, দুধ ও বিক্রি করবেন কোথায়, সেই চিন্তায় দিশাহারা। উত্তরাঞ্চলে সবজির মধ্যে টমেটোর দাম কেজিপ্রতি পাঁচ টাকা, মরিচ তিন টাকা, বেগুন তিন টাকা ও শসা কেজিপ্রতি ৫০ পয়সা। স্থানীয় বাজারে কোনো সবজি পানির দরে বিক্রি হলেও ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাতে সেটির দাম দ্বিগুণ কিংবা তিনগুণ হয়ে যাচ্ছে।

‘কৃষকের স্বপ্ন বিক্রি হচ্ছে দুই টাকায়’ এ শিরোনামে ৩০ এপ্রিল প্রকাশিত সংবাদে আমরা জানতে পারি, রুনা আক্তার নামে এক সাহসী মহিলার কথা, যিনি পোশাক কারখানার চাকরি ছেড়ে গ্রামে এসে গ্রামীণ কৃষি নিয়ে বিস্তর স্বপ্ন বুনেছিলেন। ৩০ হাজার টাকা আর এনজিও ঋণ নিয়ে দুই বিঘা জমি বন্ধক নিয়ে চাষ করেছিলেন উচ্চ ফলনশীল করোলা। সেই করোলা তিনি বিক্রি করেন মণপ্রতি ৮০ টাকায়। এর ফলে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রুনার সংগ্রামী জীবন। এমন বিপাকে রয়েছেন রুনাসহ হাজার হাজার কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তা। ‘গ্রীষ্মকালীন সবজি এখন কৃষকের গলার কাঁটা’ শিরোনামের আরেকটি খবরে দেখা যায়, দেশের মোট সবজির ৩০ শতাংশ উৎপাদিত হয় গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে, যার পরিমাণ ৫০ লাখ টন এবং বাজারমূল্য ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই গ্রীষ্মকালীন সবজিই এখন কৃষকের গলার কাঁটা।

এ গলার কাঁটা যে কেবল এ বছরের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সৃষ্টি হয়েছে এমনটি নয়, এ চিত্রই স্বাভাবিক সাধারণ চিত্র এদেশের সবজিচাষির কাছে। এ তো গেল সবজিচাষির কথা। এ মৌসুমে কৃষকের সবচেয়ে আশা ভরসার জায়গা তার উৎপাদিত বোরোধান। এ ধানের ন্যায্যমূল্য যে কৃষক এ বছর পাবেন বা পাচ্ছেন, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। যদি বিগত বছরের মতো কৃষক তার ধানের ন্যায্যমূল্য না পায়, সেক্ষেত্রে তার প্রভাব সমগ্র অর্থনীতিতে পড়তে বাধ্য। কৃষকদের সামগ্রিক জিম্মিদশার চিত্র পাওয়া যায় কিছুদিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে, যেখানে একজন পুলিশ কর্মকর্তা অভয় দিচ্ছিলেন বরগুনার তরমুজ চাষিদের, আর শাসাচ্ছিলেন আড়তদার মধ্যস্বত্বভোগী একজনকে। যে কৃষক মাসের পর মাস হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ফসল ফলিয়ে লাভের মুখ দেখতে হিমশিম খান, সেখানে কোনো ফড়ে, দালাল বা আড়তদার কীভাবে কৃষকদের জিম্মি করে নিমিষেই কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান, এ ঘটনা তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। পরিস্থিতি যখন এই, তখন দশকের পর দশক ক্রমাগত লোকসান গুনেও কৃষক নিরলসভাবে ফসল উৎপাদন করে যাচ্ছেন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার পরিসংখ্যান, ২০১৯ অনুযায়ী বাংলাদেশের কৃষক ২০১৭ সালে যে কৃষিপণ্য উৎপাদন করেছিল, তার আর্থিক মূল্য প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা। ২০ বছর আগে কৃষক যে অবদান কৃষিতে রাখতেন, এখন তার দ্বিগুণ রাখছেন। কিন্তু কৃষকরা কী পেয়েছেন? তাদের ঘামের ফসলের লভ্যাংশ যাচ্ছে ফড়ে, দালাল, অসাধু ব্যবসায়ী আর মধ্যস্বত্বভোগীদের ভাগে। কৃষক নিঃস্ব হচ্ছেন ঋণের জালে আটকে, একদিন কৃষিজমিটুকুও বিক্রি করে পাড়ি জমাচ্ছেন শহরে। এর ফলে ক্রমাগত মানুষের চাপ বাড়ছে শহরে। এভাবে একদিকে কৃষকদের নিঃস্ব হওয়া, অন্যদিকে শহরে মানুষের চাপ বাড়াÑএ দুইয়ের পেছনে দায়ী গত পাঁচ দশকে সামগ্রিক কৃষিবান্ধব নীতিমালা গ্রহণ করতে না পারা।

ফারুক ওয়াসিফ তার লেখায় উল্লেখ করেছেন, এই সংকটকালে হাজার হাজার মানুষ ঝুঁকি নিয়ে মাছের ড্রামে করে গ্রামের দিকে ছুটছেন। এর মাধ্যমে তিনি শহর থেকে গ্রামকে অধিক নিরাপদ বলে জ্ঞান করেছেন। তিনি যথার্থ বলেছেন, সবাই এই মুহূর্তে গ্রামের দিকে ছুটছেন বটে, তবে এটি চরম হতাশা ও শঙ্কা থেকে। তারা কোনো স্বপ্ন নিয়ে গ্রামে ফিরছেন না। যে স্বপ্ন নিয়ে রুনা ফিরেছিলেন, সেই স্বপ্ন নেই কারও চোখে। তারা ফিরছেন নিতান্ত বাঁচার তাগিদেÑগ্রামের শাক, কচু ও লতাপাতা খেয়ে কোনোমতে বাঁচতে। কারণ যারা শহরে গিয়েছিলেন, কাজে তারা রুনার মতো পোড় খাওয়া। তারা সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে অভিমান নিয়ে গ্রাম ছেড়েছেন। তারা গ্রামে ফিরে আবার কৃষিকাজে শ্রম, সময় ও পুঁজি দেবেন, এমন আশা করা অমূলক। বরং তারা অপেক্ষায় থাকবেন পরিস্থিতির স্বাভাবিক হওয়ার। শহরে ফিরলে প্রিয়জন আর মাটি ছেড়ে থাকার কষ্ট আছে, কিন্তু পেটপুরে চারটে খেয়ে কিছু সঞ্চয়ের সুযোগ আছে। গ্রাম যে তাদের আশা-ভরসা দিতে পারছে না, তার বড় প্রমাণ পায়ে হেঁটে দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রা পোশাক শ্রমিকদের। মৃত্যু আর পেটের ক্ষুধার মধ্যে তারা পেটের ক্ষুধার তাগিদ বেশি অনুভব করেছেন, তাই মৃত্যুভয় পায়ে ঠেলে রওনা দিয়েছেন কর্মস্থল ঢাকা শহরে। সুতরাং আমরা যতই গ্রামীণ অর্থনীতি নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা আর উচ্চাকাক্সক্ষা প্রকাশ করি না কেন আমাদের মূল সমস্যায় ফিরতে হবে। নিঃস্ব-রিক্ত কৃষকদের সামান্য ঋণ দিয়ে এ অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে না। তাদের জন্য দরকার সামগ্রিক কৃষি এবং কৃষকবান্ধব জাতীয় নীতিমালা। আমার এ লেখার বক্তব্য স্পষ্টÑএদেশের যে কৃষক তাদের পুঁজি, ঘাম ও শ্রম দিয়ে দেশকে খাদ্যের জোগান দিয়ে যাচ্ছেন, যারা দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে বিপ্লব এনে দিয়েছেন, তাদের আমরা কিছুই দিতে পারিনি? তারা আশাবাদী ফসলের উৎপাদন নিয়ে, কিন্তু হতাশ ফসলের দাম নিয়ে। তারা বছরের পর বছর ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে নিঃস্ব হয়ে পেটে-ভাতে বেঁচে আছেন। তাদের এ বাঁচা বাঁচা নয়, এ বাঁচায় স্বপ্ন নেই, নেই আঁধার কেটে আলোর পথের দিশা। এমন পরিস্থিতিতে গ্রামকে অর্থনৈতিক মুক্তাঞ্চল হিসেবে ভাবতে দোষ হয়তো নেই, তবে তা বাস্তবতার নিরিখে কতটা যুক্তিসংগত, তা আলোচনার দাবি রাখে নিশ্চয়ই।

ফ্রিল্যান্স লেখক

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..