Print Date & Time : 12 April 2021 Monday 6:25 am

করোনায় চাকরি হারিয়েছেন সাড়ে ৩ লাখ পোশাক শ্রমিক

প্রকাশ: January 23, 2021 সময়- 11:43 pm

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত কভিড-১৯-এর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে যাচ্ছে। মহামারির সময়ে দেশের সাড়ে তিন লাখ পোশাক শ্রমিক চাকরি হারিয়েছে, যা এই খাতের মোট শ্রমিকের ১৪ শতাংশ। এ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াটি হচ্ছে ধীরগতিতে। ছোট আকারের দুর্বল হয়ে পড়া ও পোশাক সংগঠনের সদস্য নয় এমন প্রতিষ্ঠানগুলোই পুনরুদ্ধারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে এক সংলাপে মতামত দিয়েছেন আলোচকরা।

গতকাল এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় একটি জরিপে পাওয়া এ তথ্য তুলে ধরা হয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) ও ব্র্যাকের ম্যাপড ইন বাংলাদেশ প্রকল্প যৌথভাবে এ ভার্চুয়াল আলোচনা সভা আয়োজন করে। ‘কভিড-১৯ বিবেচনায় পোশাক খাতে দুর্বলতা, সহনশীলতা এবং পুনরুদ্ধার: জরিপের ফলাফল’ শীর্ষক সংলাপে জরিপের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংকট শুরুর সাত মাস পর গত অক্টোবরে জরিপ পরিচালনা করে শ্রমিকদের বেকারত্বের এ চিত্র পায় সিপিডি। জরিপের তথ্য তুলে ধরে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এই সময়ে ২৩২টি বা সাত শতাংশ কারখানা বন্ধ হয়েছে। লে-অফ ঘোষণা করেছে মাত্র দুই দশমিক দুই শতাংশ কারখানা। বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব কারখানার মধ্যে ৭০ শতাংশ তাদের শ্রমিকদের বেতন দিতে পেরেছে। আর কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে শ্রমিকদের আরও যেসব সুবিধা দেয়ার কথা, তা দিতে পেরেছে মাত্র চার শতাংশ।

মহামারিতে বন্ধের পর কারখানা পুনরায় খুললেও ৬০ শতাংশ কারখানায় নতুন শ্রমিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের বড় কারখানাগুলোতে এ সমস্যা দেখা গেছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব কারখানার উদ্যোক্তাদের কীভাবে আবার ব্যবসায় ফিরিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার আশা করছে সিপিডি।

কারখানা কর্তৃপক্ষ শুরুতে শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য মাস্ক, স্যানিটাইজার ও তাপমাত্রা পরিমাপের উদ্যোগ নিলেও ধীরে ধীরে তা হারিয়ে গেছে।

সিপিডির জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ১৩ শতাংশ কারখানা এখন মহামারি প্রতিরোধে কোনো ধরনের নিয়ম মানছে না। এই সংখ্যা আস্তে আস্তে বেড়ে যাচ্ছে। সরকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছে, সেখান থেকে ঋণ পেতে ৫২ শতাংশ কারখানা আবেদনই করেনি বলে সিপিডির জরিপে উঠে এসেছে।

মোয়াজ্জেম বলেন, ৩৩ শতাংশ কারখানা ঋণ পাওয়ার উপযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও আবেদন করেনি। ছোট একটি অংশ বলেছে, ঋণ পরিশোধে কিস্তি পরিশোধ করতে না পারার শঙ্কায় তারা আবেদন করেনি। এখনও ৫০ শতাংশ কারখানা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে শ্রমিকদের বেতন দিচ্ছে না। জরিপের দেখা গেছে, দেশের ৪৪ শতাংশ পোশাক কারখানার নিশ্চিত অর্ডার থাকে। ৫৬ শতাংশ কারখানার থাকে না।

মহামারির প্রভাবে পাঁচ শতাংশ কারখানা তাদের ব্যবসার আকার ছোট করার কথা বলেছে। তবে মাত্র চার শতাংশ ব্যবসার নতুন সুযোগ পাওয়ার কথা বলেছে।

সভায় বিকেএমইএর প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. হাতেম বলেন, সরকার পোশাক খাতের জন্য যে বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছে, তা পাওয়া ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুসম্পর্কের ওপর নির্ভর হয়ে পড়েছে। যাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তার ভালো যোগাযোগ রয়েছে তারাই ওই ঋণ পাচ্ছেন আবার যাদের সঙ্গে নেই তারা পাচ্ছে না।

সিপিডি চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান এ মহামারির সময়েও কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এক জায়গা থেকে কাঁচামালের উৎস হলে এটা করবেই। তাই কাঁচামালের উৎসে বৈচিত্র্য আনতে হবে।

ম্যাপড ইন বাংলাদেশ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক সৈয়দ হাসিবুল হোসাইনের সভাটি সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংলাপে সূচনা বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, মোট ৬১০টি পোশাক কারখানায় জরিপটি পরিচালনা করা হয়। যার ফলে কভিড-১৯ বিবেচনায় পোশাক খাতে দুর্বলতা, সহনশীলতা এবং পুনরুদ্ধারকে বিশ্লেষণ করা সহজতর হবে। এ গবেষণার মাধ্যমে পোশাক খাতকে পুনরুদ্ধারে মধ্যমেয়াদি পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য প্রণোদনার আবেদন প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে হবে। সদস্য নয় এমন কারখানাগুলোকে অনতিবিলম্বে অ্যাসোসিয়েশনের সদ্যস্যভুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে শ্রমিকদের বেতন দেয়ার প্রক্রিয়াটিকে কমপ্লায়েন্সের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) ও বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) দায়িত্ব নিয়ে সামনে এসে শ্রমিকদের তালিকা সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। কারাখানার শ্রমিকদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার দিকে আরও জোর দেয়ার কথাও উঠে আসে এ উপস্থাপনায়। তিনি বলেন যে পোশাক খাতের ভবিষ্যতের বিকাশের জন্য ভ্যালু চেইনের বিভিন্ন বিভাগে আরও বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) বিবেচনা করা উচিত।

বিশেষ অতিথি শিরীন আখতার বলেন, কভিডের সময়কালে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে চলছে। আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে খাতটি। বুঝতে পারছি আপদকালীন সময়ের জন্য আমাদের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। সরকার ঘোষিত বিভিন্ন প্রণোদনা সবার কাছে সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে সুশাসনের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। যারা কাজ হারিয়েছেন বা যেসব কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে তাদের দিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে।

ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক একে এনামুল হক বলেন, শ্রমিকদের করোনা পরীক্ষার অপর্যাপ্ততা রয়েছে। বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার বলেন, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিকে কতটুকু গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তা সর্বাগ্রে ভেবে দেখতে হবে।

সংলাপের সভাপতির দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, কভিড পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শ্রমিকদের জন্য একটি সামাজিক সুরক্ষা বিমা করা যেতে পারে। যেখানে মালিক, শ্রমিক, সরকার, ক্রেতা এবং উন্নয়ন অংশীদাররা অংশ নেবে। সংলাপে সাংবাদিক, গবেষক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পেশাজীবীরা মতামত তুলে ধরেন।