দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

করোনায় বন্ধ হয়েছে ২১% ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান

আইএফসির জরিপ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানের (এমএসএমই) অবদান ২৫ শতাংশ। এজন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালক হিসেবে বিবেচনা করা হয় এমএসএমই খাতকে। করোনাকালে এ খাতের ২১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে ছয় শতাংশ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়। উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে কবে নাগাদ এসব প্রতিষ্ঠান চালু হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

বাংলাদেশে এমএসএমই খাতে করোনার প্রভাব নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) এক জরিপে উঠে এসেছে এমন তথ্য। গতকাল আইএফসি বাংলাদেশ অফিসের পক্ষ থেকে জরিপটি প্রকাশ করা হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনলাইন ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির।

বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশস্থ ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত রবার্ট চ্যাট্টারটন ডিকসন। জরিপের বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করেন আইএফসির সিনিয়র অপারেশন অফিসার অনন্যা ওয়াহিদ কাদের। জরিপের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, সারা বিশ্বে করোনার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সর্বোচ্চ চারটির একটি হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানের অবদান অনেক বেশি। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ের জন্য পণ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও কর্মসংস্থানে ব্যাপক অবদান রাখে।

এ খাতের ওপর প্রভাব জানতে সম্প্রতি সারা দেশের ৫০০টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে টেলিফোনে জরিপ চালানো হয়। জরিপে ফ্যাশন হাউস, কাপড় উৎপাদন ও বিপণন, কুটির শিল্প, কৃষিপণ্য উৎপাদন, মৎস্য চাষ, খুচরা ও পাইকারি দরে পণ্য বিক্রয়কারী খাতের উদ্যোক্তাদের করোনায় বন্ধ হয়েছে ২১% ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান রাখা হয়। আইএফসির পরিচালিত এ জরিপটির অংশীদার ছিল যুক্তরাজ্যের ফরেইন কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস।

এসব প্রতিষ্ঠানের তথ্য পর্যালোচনায় উঠে আসে এমএসএমই খাতের মাত্র ২৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণরূপে খোলা রাখতে পেরেছেন উদ্যোক্তারা। ৪৫ শতাংশ আংশিক খোলা রেখেছেন, ছয় শতাংশ বন্ধ প্রতিষ্ঠান চালাতে না পেরে বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন এবং ১৫ শতাংশ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছেন।

শুধু মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ২৬ শতাংশ সম্পূর্ণরূপে খোলা রাখতে পেরেছেন। অবশিষ্টদের মধ্যে ৪৫ শতাংশই আংশিকভাবে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন, ২৪ শতাংশ উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করেছেন আর পাঁচ শতাংশ প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন।

আংশিক ও সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৭০ শতাংশই পুরো মাত্রায় ঝুঁকিতে আছে। এসব উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ও পণ্য চাহিদা কমে গেছে। ফলে এ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ৩৭ শতাংশের কর্মসংস্থান স্থায়ী ও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

জরিপে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে ৭০ শতাংশের চাকরি হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। চাকরি হারানোরা কবে নাগাদ ফিরতে পারবেন তার কোনো লক্ষণ এখনও দেখা যাচ্ছে না। শুধু উৎপাদনই কমেনি। প্রতিষ্ঠানগুলোর নগদ অর্থের প্রবাহ বা আর্থিক সক্ষমতা কমে গিয়েছে ৯৪ শতাংশ। ৮০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এখনও লোকসানে রয়েছে। করোনায় সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফ্যাশন ও কাপড় খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, ‘সিএমএসএমই খাতে করোনার বিপর্যয় রোধে সরকারের নির্দেশনায় বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে দুই মাসের সুদ মওকুফ, ঋণ কিস্তি সাময়িক স্থগিতাদেশ, ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তা ও ক্রেডিট রিক্স গ্যারান্টি চালু করেছে। সময়ের আলোকে আরও সুবিধা দেওয়া হবে। আমরা সর্বোচ্চভাবে চেষ্টা করছি অর্থনীতিকে স্বাভাবিক আচরণে ফিরিয়ে আনতে।’

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রবার্ট ডিকসন বলেন, ‘করোনার এই সময়ে নাগরিক সুবিধা ও সেবা নিশ্চিত এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে নিতে বাংলাদেশের প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হবে। কিন্তু রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে না। সরকারকে করের দিকে বেশি নজর দিতে হবে। সরকারের জন্য একটি ভালো দিক হচ্ছে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দর কমলেও বাংলাদেশে কমানো হয়নি। এতে ভালো রাজস্ব আদায় হয়েছে। অর্থের সংস্থান বাড়াতে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বড় উৎস হতে পারে।’

স্বাগত বক্তব্যে আইএফসির বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের কান্ট্রি ম্যানেজার ওয়েন্ডি ওয়ার্নার বলেন, ‘করোনার পূর্ববর্তী থেকেই বাংলাদেশের এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনাগত দিক দিয়ে একটু নড়বড়ে ছিল। কারণ হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান খুবই কম মুনাফায় ব্যবসা করে থাকে। করোনায় তারা আরও সমস্যায় পড়েছে। এজন্য অর্থনীতির পুনরুদ্ধার করতে হলে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।’

সভাপতির বক্তব্যে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর মারসি মিয়াঙ তেবন বলেন, ‘এমএসএমই খাতের সঙ্গে দুই কোটি মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। করোনায় তাদের কঠিনতম সময় পার করতে হচ্ছে। তাদের আয় কমে গিয়েছে। অর্থনীতির জন্যই তাদের সহায়তা করতে হবে সরকারকে।’

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিসের লিড ইকোনমিস্ট ইউতাকা ইউশিনোর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত হয় ওয়েবিনারটি। এতে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব অরিজিত চৌধুরী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আবু ফারাহ মো. নাসের।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..