দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

করোনার অতীত, আজ ও আগামী

মোশারফ হোসেন: কভিড-১৯-এর আগেও ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত বহু প্রাণঘাতী মহামারিতে আক্রান্ত হয়েছে বিশ্ব। কভিড-১৯-এর পূর্ববর্তী অতি-সাম্প্রতিক ও অন্যান্য নতুন ভাইরাসের মধ্যে এইচআইভি/এইডস (১৯৮১), সার্স (২০০৩), সোয়াইন ফ্লু (২০০৯), ইবোলা (২০১৪) ও জিকা (২০১৬) বহু দেশে কামড় বসালেও বাংলাদেশে এগুলোর উল্লেখযোগ্য প্রাদুর্ভাব ঘটেনি। এজন্য অনেকটাই প্রকৃতির ওপর আশ্বস্ত থেকে আমরা ভেবেছিলাম, কভিড-১৯ও হয়তো বাংলাদেশকে আক্রান্ত করতে পারবে না। তাই কভিড-১৯ বাংলাদেশের আগে চীন, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রযুক্তি ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে উন্নত দেশকে নাস্তানাবুদ করলেও আমরা সে অর্থে সতর্ক হইনি, সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিইনি। কারণ মহামারি মোকাবিলার পূর্ব-অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও প্রস্তুতি সবকিছুর সম্মিলিত অভাবে আমরা কভিড-১৯-এর মতো ভয়ানক ভাইরাসের আগমনকালেও নির্ভার থেকেছি এবং নির্ভয় থেকে ভেবেছি, ‘এই ভাইরাসটি আমাদের দেশ পর্যন্ত আসবে না, আর এলেও আমাদের কিছু করতে পারবে না!’

সবার মাঝে ভয়ের বাঘ ঢুকিয়ে দিয়ে ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবমতে, ৪ আগস্ট পর্যন্ত বিশ্বে কভিড-১৯-এ আক্রান্ত দেশ ও এলাকার সংখ্যা ২১৬, আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এক কোটি ৮৪ লাখ ৬৮ হাজার ৭৫ এবং মৃতের সংখ্যা ছয় লাখ ৯৭ হাজার ৯১২। একই সময়ে বাংলাদেশে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা যথাক্রমে দুই লাখ ৪৪ হাজার ২০ এবং তিন হাজার ২৩৪।

করোনাভাইরাস আমাদের প্রত্যেকের জীবন-জীবিকা, দৈনন্দিন জীবনাচরণ, সামাজিকতা, অর্থনীতি, রাজনীতি ও চিন্তা-চেতনাকে যেভাবে প্রভাবিত করেছে, মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কালো সময় বাদ দিলে গত ৫০ বছরে দেশি বা বিদেশি, প্রাকৃতিক বা অপ্রাকৃতিক কোনো শক্তিই তেমনটা করে দেখাতে পারেনি আমাদের দেশে।

দেশে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত মানুষ যেখানে কর্মব্যস্ত থাকত, সেখানে দিনের পর দিন মানুষ গৃহবন্দি থেকেছে, সাধারণ ছুটি দেখেছে দেশ প্রায় দেড় মাস। হাজার হাজার বিয়ে আটকে গেছে। বাতিল হয়েছে বহু সামাজিক, রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক ও ধর্মীয় প্রোগ্রাম। দেশে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন করা যায়নি। বিশ্ব মুসলমানদের হƒৎস্পন্দন পবিত্র মক্কা ও মদিনায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ওমরাহ হজ ও ধর্মীয় কার্যক্রম, নিত্যদিনের উপাসনালয় মসজিদ-মন্দির-গির্জায় যেতে পারেনি মানুষ।

অনেক কর্মজীবী বাবা-মা দিনের পর দিন যেতে পারেনি নিজের বুকের ধন সন্তানের কাছে, পারেনি বুকে নিয়ে আদর করতে, নিষ্পাপ গালে চুমু খেতে। তবে কেউ কেউ অতি সচেতনতার নামে করেছে অমানবিকতাওÑভাইরাস-আতঙ্কে নিজের মাকে জঙ্গলে ফেলে দিয়েছে সন্তান, মুমূর্ষু স্বামীর কাছে যায়নি স্ত্রী! শেষ বিদায়েও অনেকেই পায়নি তার শেষ প্রাপ্যটুকুÑকরোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তিটি নিজের জানাজায় পায়নি তার স্বজনদের, কবরস্থ হতে পারেনি পারিবারিক কবরস্থানে তারই বাবা-মায়ের পাশে, এমনকি তার কবরে নামতে পারেনি তার সন্তানও!

নানা অমানবিকতার ভিড়ে মানবিকতাও প্রত্যক্ষ করেছি আমরা। করোনার শুরুতে সরকারের পাশাপাশি দেশের প্রায় প্রতিটি এলাকায়ই সামর্থ্যবান ব্যক্তি ও সংগঠনকেই দেখেছি ত্রাণ নিয়ে কর্মহারানো ও নিন্ম আয়ের মানুষের পাশে দাঁড়াতে। বাসাভাড়া মওকুফ করেছে অনেক বাড়িওয়ালা। কিন্তু করোনার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সবাই কেমন জানি নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। এখন হাজার হাজার মানুষ কাজ হারালেও কাউকে তাদের পাশে কাজ, অর্থ বা ত্রাণ নিয়ে সহায়তা করতে দেখা যাচ্ছে না। কর্মীদের দিয়ে বছরের পর বছর মুনাফা করে সম্পদের পাহাড় গড়া অনেক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিই তিন মাসের ধাক্কাতেই কর্মীদের বেতন কমিয়েছে এবং ছাঁটাই করেছে অনেক কর্মীকেই।

করোনা আক্রান্তের প্রতি এখন কিছুটা সহানুভূতিশীল আচরণ চোখে পড়ে। শুরুর দিকে আমরা যেমনটা দেখেছি, কারও করোনার লক্ষণ থাকলেই তার প্রতি সামাজিক অবজ্ঞার ঢল নেমে এসেছে। তবে আগের মতো এখন করোনা রোগীকে অবজ্ঞার শিকার হতে হচ্ছে না। কারণ করোনার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মাঝে বিদ্যমান কুসংস্কার ও আতঙ্ক কমেছে, একইসঙ্গে করোনার বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে কিছুটা শারীরিক ও মানসিক শক্তি-সাহস সঞ্চিত হয়েছে। কেউ কেউ আবার জীবিকার তাগিদেও নিরুপায় হয়ে করোনার সামনে বুক চিতিয়ে দিচ্ছে। মাস্ক না পরার কারণে লাখ টাকার জরিমানা ও জেলের ভয় দেখিয়েও অনেককেই আর এখন মাস্ক পরানো যাচ্ছে না। প্রতিদিন করোনা তীব্রতর হওয়া সত্ত্বেও জনসমাগম ধীরে ধীরে সেই আগের অবস্থানেই চলে যাচ্ছে।

নিজের মাঝেও কেমন জানি একটা ঢিলেঢালা ভাব লক্ষ করছি। টানা দেড় মাসের লকডাউনে পরিবারের সঙ্গেই ছিলাম। চাকরিজীবনের অবসরের আগে এমন অবসর হয়তো আর কখনোই জুটবে না। চাইও না এমন অবসর! তবে উৎকণ্ঠিত পরিবারের চেহারা এখনও চোখের সামনে ভাসে। দিনে ও রাতে কয়েকবার করে লেবু, আদা, এলাচ, লবঙ্গ, দারুচিনি ইত্যাদি দিয়ে চা বানিয়ে খাওয়াতেন আমার স্ত্রী। গরম পানির ভাপ নেওয়া থেকে শুরু করে ভিটামিন-সি, জিংক ও ভিটামিন-ডি-যুক্ত ট্যাবলেট খাওয়াসহ আরও কত কিছু! মাঝে শরীরে তিন-চার দিন ম্যাজম্যাজ করা ভাব দেখে আমার মায়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা গেছেÑ‘খোদা না করুক, আর যা-ই হোক, করোনা যেন না হয়!’

লকডাউন শেষে পুরোদমে অফিস শুরু হলে পরিবার ছেড়ে আবারও কর্মস্থলে। স্ত্রীর সতর্কবাণীর যেন শেষ নেই। তাই বাসার মতো করেই কর্মস্থলের ব্যাচেলর বাসায়ও নিয়মিত নিজেই বানিয়ে খেতাম সেই বিশেষ চা। কিন্তু এখন যেন হাঁপিয়ে উঠেছি, আর যেন পারছি না, করোনা প্রতিরোধী কর্মে যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছি; তাই বিশেষ সেই চা আর খাওয়া হচ্ছে না নিয়মিত। অফিস শেষে বা বাইরে থেকে বাসায় এলে আগের মতো করে সব জামাকাপড় গরম পানিতে ডিটারজেন্ট দিয়ে এখন আর ভিজিয়ে দেওয়া হয় না, মাস্ক ছাড়াও দু-একবার বেরিয়ে পড়েছি, যা এক মাস আগে কল্পনাও করা যেত না। বাসায় মেহমান আসাও চালু হয়েছে আবার। বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিও যেন পাল্টাচ্ছে।

আগে কেউ করোনা-আক্রান্তের সংস্পর্শে গেলেই তাকে ১৪ দিনের জন্য কোয়ারেন্টাইনে চলে যেতে হতো। আক্রান্তের বাড়ি, ব্যবসাস্থল বা অফিস লকডাউন করা হতো। আর এখন এক অফিসে একাধিক কভিড-১৯ পজিটিভ মানুষ থাকা সত্ত্বেও অফিস লকডাউন করা তো দূরের কথা, আক্রান্ত বাদে বাকি কেউই কোয়ারেন্টাইনে যাচ্ছে না। অফিস চলছে দিব্যি। মানুষও আর ‘এখানে করোনা রোগী ছিল’ এই ভয়ে ভীত হচ্ছে না। মিডিয়ার করোনাবিষয়ক সংবাদ, আইইডিসিআরের ব্রিফিং সবই যেন স্তিমিত হয়ে গেছে বা মানুষের আগ্রহে নেই আর।

ভয়ের বিষয় হচ্ছে, আমরা ক্লান্ত হয়ে হাঁপ ছেড়ে দিলেও করোনা কিন্তু ক্লান্ত হয়নি। অনেকটা জ্যামিতিক হারেই একের পর এক কামড় বসিয়ে যাচ্ছে। তাই দিন দিন যেভাবে আক্রান্ত মানুষের সারি দীর্ঘ হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে আগামীতে হয়তো করোনা রোগীরাও আর কোয়ারেন্টাইনে যাওয়ার সুযোগ পাবে না। কারণ বর্তমানে জীবিকার তাগিদে অতি সতর্ক অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হচ্ছে। আগামীতে একই কারণে করোনা রোগীরাও শরীরে ভাইরাস নিয়েই দিব্যি কাজ করবে! কোলাকুলি, করমর্দন প্রভৃতি সামাজিক সংস্কৃতিগুলো হয়তো আর ফিরে নাও আসতে পারে। গণকাপে ও গণগ্লাসে চা-পানি খাওয়া ছাড়বে অনেক মানুষই। আগামীতে ঘরের বাইরে বা ভ্রমণে গেলে চা-পানি পানের জন্য মানুষ নিজের ব্যক্তিগত কাপ-গ্লাস নিয়ে বের হবে। সেলুনে না গিয়ে নিজের চুল-দাড়ি নিজেই কামিয়ে নেবে কেউ কেউ।

হাঁচি-কাশি ও নাক ঝাড়ার শিষ্টাচার আমাদের জীবনের খুব সাধারণ, তবে অতি প্রয়োজনীয় শিষ্টাচার, যা আমরা ৯০ শতাংশের অধিক মানুষই মানি না। সভ্যতার এ যুগেও মানুষকে হাত ধোয়ায় অভ্যস্ত করতে প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর পালিত হয় ‘বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস’। জীবিকার তাগিদে সামাজিক দূরত্বের ধারণা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলেও করোনাকাল ও করোনা-পরবর্তী কালে সাধারণ এসব শিষ্টাচারের চর্চা আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে এবং পারিবারিকভাবে এ শিষ্টাচারগুলোর শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

আশাবাদী হতে চাই, একটি সোনালি ভোর নিশ্চয় আসবে, যেদিন করোনার কাক্সিক্ষত ওষুধ বা টিকার সফল আবিষ্কারে প্রতিটি মানুষ করোনা জয়ের শক্তি অর্জন করবে, অথবা করুণাময় স্রষ্টা তার করুণাবর্ষণে পৃথিবীকে করোনামুক্ত করবেন। কিন্তু সেদিন আমরা যেন করোনা থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলো ভুলে না যাই, অস্বীকার না করি প্রকৃতির শক্তিকে।

ব্যাংকার ও ফ্রিল্যান্স লেখক

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..