৮০০ কোটি টাকা নতুন বিনিয়োগ করেছে দেশবন্ধু গ্রুপ

রহমত রহমান: মহামারি করোনায় সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। এই মহামারিতে ছোট-বড় অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার কর্মী কাজ হারিয়েছেন। এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম এখনো বন্ধ রয়েছে। ব্যতিক্রম দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান দেশবন্ধু গ্রুপ। করোনার শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত কোনো কর্মীর কাজ হারাতে হয়নি। উল্টো শত শত নতুন কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে দেশবন্ধু গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

করোনার গত দুই বছরে দেশের অর্থনীতির গতি ঠিক রাখতে ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি নিজেদের ব্যবসা বাড়াতে উৎপাদমুখী নানা প্রকল্প হাতে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে দেশবন্ধু গ্রুপ। এই লক্ষ্যে গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠান দেশবন্ধু সুগার মিলস, দেশবন্ধু বেভারেজ, দেশবন্ধু প্যাকেজিং ও দেশবন্ধু টেক্সটাইল মিলসসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও উৎপাদন বাড়াতে ৮০০ কোটি টাকা নতুন করে বিনিয়োগ করেছে দেশবন্ধু গ্রুপ। এতে নতুন করে আরো ২০ শতাংশ কর্মসংস্থান বাড়ছে।

দেশবন্ধু গ্রুপের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রুপের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তাফার লক্ষ্যই হলো দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। একইসঙ্গে দেশের গতিময় অর্থনীতির চাকা সচল রাখা। চলমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন শিল্প স্থাপন অব্যাহত রেখেছে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার। এতে করে বেসরকারি খাতে ব্যাপক অবদানসহ কর্মসংস্থান, উন্নতমানের পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে দেশবন্ধু গ্রুপ আরো অগ্রসর হবে বলে আশা করছেন কর্তৃপক্ষ।

দেশবন্ধু গ্রুপের কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, দেশবন্ধু গ্রুপের নরসিংদীর চরসিন্দুর পলাশ শিল্প এলাকায় অবস্থিত সব কারখানায় চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। এ সময় সাংবাদিকরা কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মঙ্গে মতবিনিময় ও সার্বিক পরিবেশ-পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।

দেশবন্ধু গ্রুপের পরিচালক (প্রশাসন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাকির হোসেন বলেন, করোনায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রতিটি দেশই বিপর্যস্ত। এমন বাস্তবতায় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন অব্যাহত রেখে দেশ ও দেশের মানুষের সেবায় কাজ করে যাচ্ছে দেশবন্ধু গ্রুপ। তিনি বলেন, শুধু ব্যবসায়িক লাভের জন্য নয়, দেশের মানুষের পাশে থাকার জন্য চিনি, কনজ্যুমার ফুড, বেভারেজসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদন করে যাচ্ছে। শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, রপ্তানিকৃত সব ধরনের পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে দেশবন্ধু।

তিনি বলেন, ‘দেশবন্ধু চিনিকলটি পুরনো এবং দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী চিনিকল। এটি ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠত হয়। বর্তমানে মিলটির দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ১৫০০ টন। অর্থাৎ বছরে সাড়ে চার লাখ টন চিনি উৎপাদিত হচ্ছে কারখানায়।’ তিনি জানান, ‘দেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশবন্ধু চিনিকল ইউরোপীয় কমিশনের ‘ইবিএ’-এর আওতায় ইউরোপে সর্বপ্রথম দেশি চিনি রপ্তানি শুরু করে এবং তা অব্যাহত রয়েছে। ২০০২ সালে নতুন ব্যবস্থাপনায় আসার পরে বিশ্বের শীর্ষমানের গুণমান এবং প্যাকেজিংয়ের সুখ্যাতি অর্জন করে দেশবন্ধু সুগার মিলস। সরকারের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের নির্দেশনাও মেনে এসব কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের বাজার সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে নিজস্ব লজিস্টিকের মাধ্যমে।’ জাকির হোসেন বলেন, ‘দেশবন্ধু গ্রুপ একটি মানবিক ও কর্মীবান্ধব প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ২০ হাজারের বেশি শ্রমিক-কর্মচারি কর্মরত রয়েছেন। ’

এদিকে খুব অল্প সময়েই দেশবাসীর মন জয় করেছে দেশবন্ধু বেভারেজের সব ধরনের পণ্য। বিশেষ করে দেশবন্ধু মিনারেল ওয়াটার সারাদেশে ব্যাপক চাহিদা তৈরি করতে পেরেছে। ফলে চলতি বছরে দেশবন্ধু বেভারেজ কারখানার নতুন সেকশনসহ সার্বিক উন্নয়নে করোনার মধ্যেই ২০০ কোটি টাকার বেশি নতুন বিনিয়োগ করেছে। কারখানায় উন্নত প্রযুক্তির ইটালিয়ান মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এ বছরের মধ্যেই উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বাজারে দেশবন্ধু বেভারেজের বাজার প্রায় ১১ শতাংশ। কারখানার নতুন মেশিনারিজে উৎপাদন শুরু হলে আগামী বছরের মধ্যে ২৫ শতাংশ বেভারেজ বাজারের দখল নেবে দেশবন্ধু বেভারেজ।

দেশবন্ধু বেভারেজের কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক মারুফ হোসেন বলেন, দেশবন্ধু ফুড অ্যান্ড বেভারেজ দেশবন্ধু গ্রুপের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। দেশবন্ধু গ্রুপ হলো দেশ ও জনগণের বন্ধু। এ ধারণা থেকেই প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পণ্য নিয়ে জনসেবায় হাজির হচ্ছে দেশবন্ধু গ্রুপ। সামনের দিনগুলোতে আরো নতুন নতুন অনেক পণ্য দেশবাসীর সেবায় হাজির করা হবে। তিনি বলেন, কোনো অবস্থাতেই পণ্যের মানের বিষয়ে ছাড় দেওয়া হয় না। শতভাগ কোয়ালিটি বজায় রেখে নিজস্ব কারখানায় উৎপাদন পণ্যের মাণ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। দেশবাসী আমাদের প্রতি আস্থা রেখেছে। আমরা তাদের আস্থার প্রতিদান অবশ্যই দেব। তিনি বলেন, বেভারেজ তৈরিতে যেসব কাঁচামাল ব্যবহৃত হয়, তার সবই আমরা অস্ট্রেলিয়া, ইতালি ও ব্রাজিলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে থাকি।

তিনি আরো বলেন, ‘দেশবন্ধু বেভারেজের নিজস্ব কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে দেশবন্ধু মিনারেল ওয়াটার, দেশবন্ধু কোলা, ফ্রেন্ডস আপ, দেশবন্ধু লিচি, দেশবন্ধু জিরা, দেশবন্ধু অরেঞ্জ, দেশবন্ধু ম্যাংগো জুস, গুরু ও নিয়নসহ মোট ১৮টি ফ্লেভার। দেশবন্ধু বেভারেজে উৎপাদিত পণ্য দেশে বিক্রি ছাড়াও দুবাই, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, মালয়েশিয়া, গ্রিসেও রপ্তানি হচ্ছে।

দেশবন্ধু প্যাকেজিং ও পলিমার লিমিটেডের প্রধান (বৈদেশিক বিপণন) মো. শফিউল আজম তালুকদার বলেন, দেশ ও জনগণের বন্ধু হিসেবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে দেশবন্ধু গ্রুপ। তৈরি করে চলেছে কর্মসংস্থান। দেশের গন্ডি পেরিয়ে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করে আনছে বৈদেশিক মুদ্রা। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করতে পালন করছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সবসময়ের মতো বর্তমানে করোনা ভাইরাস মহামারিতেও হাত গুটিয়ে বসে নেই। দেশ ও জনগণের প্রয়োজনে অবিরাম কাজ করে চলেছে শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান দেশবন্ধু গ্রুপ। দেশের এমন দুর্যোগময় সংকটে অবিরাম চিকিৎসাসেবা প্রদানসহ ও খাদ্যজাত পণ্য উৎপাদন করে যাচ্ছে দেশবন্ধু গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো। একইসঙ্গে নিশ্চিত করছে বাজারে সরবরাহ। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সরকারের স্বাস্থ্যবিধি শতভাগ মেনে নিরলসভাবে কাজ করেছেন শ্রমিক-কর্মচারীসহ কর্তা ব্যক্তিরা। দেশবন্ধু গ্রুপের চেয়ারম্যান দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি গোলাম মোস্তফা নিজে সার্বক্ষণিক তদারকি করে চলেছেন স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা। লাভ-লোকসানের হিসাব কষে নয়, দেশব্যাপী আক্রান্ত মহামারিতে মানুষের পাশে দাঁড়াতেই ঝুঁকি জেনেও খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করছে দেশবন্ধু গ্রুপ।

এদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত গ্রুপের একমাত্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান দেশবন্ধু পলিমার। সরেজমিনে দেখা গেছে, পলিমারের উৎপাদন কার্যক্রম বেশ গোছালো ও আন্তরিকতার সঙ্গে করছেন কর্মীরা। করোনায় সরকারের স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ করছেন তারা। দেশবন্ধু পলিমারের মহাব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার সাখাওয়াত হোসেন জানান, দেশবন্ধু সুগার মিলস চালু হওয়ার পর মোড়কের জন্য প্রতি বছর ৩৫ থেকে ৩৬ লাখ চিনির ব্যাগ প্রয়োজন হয় সেই প্রেক্ষিতে ২০০৬ সালে দেশবন্ধু পলিমার কারখানা স্থাপন করা হয়। প্রথমে তাইওয়ানের মেশিনারি দিয়ে স্বল্প পরিসরে অর্থাৎ বার্ষিক এক কোটি ব্যাগ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন মিল স্থাপন করা হয়। ২০১১ সালে প্রথম সম্প্রসারণ কাজ করে উৎপাদন ক্ষমতা বার্ষিক তিন কোটি ব্যাগ উৎপাদন এর উন্নীত করা হয়। পরবর্তী সময়ে আরো মেশিনারিজ সংযোজনের মাধ্যমে ২০১৩ ও ২০১৬ সালে আরো উৎপাদন বৃদ্ধি করে সিমেন্ট ব্যাগসহ বর্তমানে এর উৎপাদন ছয় কোটি ব্যাগে উন্নত করা হচ্ছে বলে জানান সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে দেশবন্ধু পলিমার ও দেশবন্ধু প্যাকেজিংয়ের ডব্লিউপিপি ব্যাগ, ওয়ান এবং সিমেন্ট ব্যাগ, বিওপিপি (সুইং এবং পেস্টিং) এবং এফআইবিসি ব্যাগ।

১৯৮৯ সালে ট্রেডিং ও সার আমদানির মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে দেশের অন্যতম শিল্প গ্রুপ ‘দেশবন্ধু’। তারপর থেকে দেশের এই প্রতিষ্ঠিত শিল্প গ্রুপটিকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। হাঁটি হাঁটি পা পা করে এ বছর গ্রুপটি অগ্রগতির ৩২ বছর উদযাপন করবে। বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এছাড়া নতুন প্রকল্পগুলো চালু হলে বেকারত্বদূরীকরণ ও কর্মসংস্থানে দেশবন্ধু গ্রুপ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে বলে কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মনে করছেন। দেশবন্ধু পলিমার, দেশবন্ধু সিমেন্ট, সাউথইস্ট সোয়েটার, দেশবন্ধু শিপিং, জিএম হোল্ডিংস, সাহেরা অটো রাইস মিলস, দেশবন্ধু সিকিউরিটি সার্ভিসেস, ট্রেডিং কোম্পানিজ, দেশবন্ধু পাওয়ার পস্ন্যান্ট, দেশবন্ধু টেক্সটাইল, দেশবন্ধু ফাইবার, দেশবন্ধু কনজ্যুমার অ্যান্ড অ্যাগ্রো, সাহেরা ওয়াসেক হাসপাতাল, দেশবন্ধু পার্সেল অ্যান্ড লজিস্টিকস এবং দেশবন্ধু মিডিয়া দেশের বেসরকারিখাতে সগৌরবে কাজ করে যাচ্ছে।

###

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯২  জন  

সর্বশেষ..