মত-বিশ্লেষণ

করোনাসংকটে দরিদ্র প্রতিবেশীদের পাশে দাঁড়ান

মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য। আপদবিপদে একে অন্যের পাশে দাঁড়ানো মানবিক ও মহৎ কাজ। ধর্মীয়ভাবেও মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করে বিধায় প্রতিবেশীদের সুখে-দুঃখে তাদের পাশে থাকা প্রয়োজন। আর করোনাকাল বিপদগ্রস্ত ও দরিদ্র শ্রেণির প্রতিবেশীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের দুঃখের সাথী হওয়ার সর্বোত্তম সময়। বিপদে প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানোর মাঝেই একজন মানুষের মানবিকতার উৎকৃষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। মানুষের বিপদে সাধ্যমতো সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার চেয়ে মানবিক কাজ আর কিছুতেই হতে পারে না।

চীনের উহান প্রদেশ থেকে খোলা চোখে দেখা যায় না, এমন একটি ভাইরাসের কাছে অসহায় পৃথিবী, বিপর্যস্ত অর্থনীতি। খাদ্য ও সুচিকিৎসা পাওয়ার লড়াইয়ে লিপ্ত পৃথিবীর সব মানুষ। চিকিৎসার অভাবে কিংবা চিকিৎসা পেয়েও মানুষজনের মৃত্যুর সংবাদগুলো প্রকাশ হলেও করোনাকালে কর্মহীন হয়ে বহু মানুষ কোনো সহায়তা পাওয়া ছাড়াই নীরবে নিভৃতে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বাংলাদেশে করোনার প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লকডাউন শুরুর পর সরকার, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, বিত্তবান ও স্বেচ্ছাসেবী নাগরিকদের প্রদত্ত সহায়তার মাধ্যমে দরিদ্র ও অসহায় নাগরিকরা কিছুদিনের ভরণপোষণ হলেও তা যথেষ্ট ছিল না, পাশাপাশি লকডাউন তোলে দেওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় সহায়তা। কিন্তু কাজে ফেরা হয়নি বহু চাকরিজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।

আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর ইবাদত করো। তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না। পিতা-মাতার সাথে ভালো ব্যবহার করো। নিকটাত্মীয়, এতিম-মিসকিনদের সাথে সদ্ব্যবহার করো। আত্মীয়-সম্পর্কীয় প্রতিবেশী, আত্মীয়তাবিহীন প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সহচর, তোমাদের মালিকানাধীন বাদী ও গোলামদের প্রতি সদয় ব্যবহার করো।’ (সুরা আন নিসা: আয়াত ৩৬)। তিনি আরও বলেছেন, এবং তাদের ধন-সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতের হক (সুরা যারিয়াত, আয়াত ১৯)।

অন্যদিকে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জিবরাইল (আ.) আমাকে প্রতিবেশী সম্পর্কে এত বেশি অসিয়ত করছিলেন যে, একপর্যায়ে আমার ধারণা হয়েছিল যে, আল্লাহ তায়ালা মনে হয় প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী করে দেবেন।’ হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ওই ব্যক্তি মুমিন নয়, যে পেটপুরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে (মুসনাদে আবু ইয়ালা, মুফরাদ, হাদিস)। করোনাকালে মধ্যবিত্ত ও নিন্ম মধ্যবিত্তসহ  দরিদ্র শ্রেণির মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছে। সরকার লকডাউন তোলে দিলেও করোনা পরিস্থিতি দিনদিন খারাপ হচ্ছে। ফলে দিন এনে দিন খাওয়া বহু মানুষ তাদের কাজে যোগ দিতে পারছে না। বাংলাদেশে বহু পেশাজীবী আছেন, যারা শহরের অলিগলি, রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ব্যবসা করেন। করোনাকালে এসব ভাসমান ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া অন্যান্য ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং ক্ষুদ্র চাকরিজীবীরা কাজে যোগ দিতে না পারায় অর্থকষ্টে ভুগছেন। সেই সঙ্গে কাজ করেও বেতন পাচ্ছেন না অনেকে। যে কোনো পেশাজীবীই হোক, যাদের মাসের পর মাস বসে খাওয়ার মতো সঞ্চয় নেই, তারাই কঠিন সময় পার করছেন এখন। যাদের অনেকের চুলায় আগুন না জ্বললেও কারও কাছে সহযোগিতা চাইবে না সম্মান বজায় রাখতে। এই অবস্থায় একজন আদর্শ মুসলিম কিংবা সুনাগরিকের কাজ হলো সেসব প্রতিবেশীদের খোঁজ নেওয়া। সবসময় তাদের পাশে দাঁড়ানো দরকার হলেও করোনাকালীন কঠিন সময়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো বেশি প্রয়োজন।

প্রত্যেক সম্পদশালী প্রতিবেশীর ওপর হক আছে দরিদ্র ও অসহায় এবং বিপদগ্রস্ত প্রতিবেশীর। প্রতিবেশীকে দুঃখে-কষ্টে রেখে কোনো প্রতিবেশী ভাবনাহীন সুখী জীবনযাপন পারে না, বিবেককে জাগ্রত করে তাদের পাশে দাঁড়াতেই হবে। মানুষের দুঃখ-কষ্ট অনুভব করে তাদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের দুঃখ-কষ্টকে ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমেই করোনা পরিস্থিতি থেকে উত্তোলনের চেষ্টা করতে হবে। যে কোনো পরিস্থিতিতে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমেই আদর্শ সমাজ ও দেশ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।

জুবায়ের আহমেদ

শিক্ষার্থী

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম অ্যান্ড ইলেকট্রনিক মিডিয়া (বিজেম) ঢাকা

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..