আজকের পত্রিকা দিনের খবর প্রথম পাতা সারা বাংলা

করোনায় বিপাকে বগুড়ার দুগ্ধ খামারিরা

পারভীন লুনা, বগুড়া: বৈশ্বিক মহামারি করোনা সংকটের কারণে চরম বিপাকে পড়েছেন বগুড়ার দুগ্ধ খামারিরা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, হোটেল রেস্তোরাসহ দোকানপাট বন্ধ এবং হাটবাজারে লোকজনের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকায়দুধ বিক্রি হচ্ছে না। অন্যদিকে কেজি প্রতি দামও কমেছে। দুধের দাম কমেছে, দুধ বিক্রি হচ্ছে না, বলছেন খামারিরা।

গরুর খামার করে ভাগ্য ফিরিয়েছেন বগুড়ার সামছুল আবেদীন। শখের বসে প্রায় দুই যুগ আগে তিনটি গরু নিয়ে খামারের যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে তার খামারে গাভীর সংখ্যা এখন শতাধিক। শহরের রহমাননগরে প্রায় ১ বিঘা জমির উপর গড়ে তোলা এই খামার থেকে প্রতিদিন প্রায় ছয় শতাধিক লিটার দুধ উৎপাদিত হচ্ছে।

দুধে সুদিন হলেও গো-খাদ্যে দুর্দিন যাচ্ছে সামছুল আবেদীন ও তার মতো দুগ্ধ খামারীদের। বর্তমানে চড়া মূল্যে গো-খাদ্য কিনে অনেকের খামারই লোকসানের ভারে নুইয়ে পড়েছে।

সামছুল আবেদীনের খামারে বিদেশি বিভিন্ন জাতের ২০-৩০টি গাভী সারাবছর দুধ দেয়। খামার থেকে সরাসরি দুধ দহন করে ক্রেতাদের হাতে তুলে দেন খামারে মালিক সামছুল আবেদীন। দুধে ভেজাল নেই তাই দাম একটু বেশি হলেও প্রতিদিন স্থানীয় লোকজন থেকে শুরু করে দুরদুরান্ত থেকে আসা ক্রেতারা ভোর থেকে তার খামারে লাইন ধরে অপেক্ষা করে দুধ কেনার জন্য। প্রতি লিটার দুধ বিক্রি করা হয় ৫০ টাকায়। ভোরবেলা ও বিকেল এই দু’বেলা গরুর দুধ দহন করা হয় এখানে।

সামছুল আবেদীনের খামারের গাভীগুলোর পরিচর্যার জন্য নিয়োগ করা হয়েছে ৮জন শ্রমিককে। যারা প্রতিদিন সঠিক সময়ে গাভীগুলোকে খাবার খাওয়ানো, গোসল করানোর কাজ করে থাকে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এই খামারের গাভীগুলো সংগত কারণেই বছরের পুরো সময় জুড়েই সুস্থ থাকে।

প্রতিদিন ভোর এবং বিকেলে দহন করা হয় গাভীগুলো। ১৫ লিটার থেকে শুরু করে কোন কোন গাভী ৫০লিটার পর্যন্ত প্রতিদিন দুধ দেয়। বগুড়া শহরের দুধের চাহিদার একটা বড় অংশ পুরণ হয় সামছুলের খামারের দুধে।

খামারের মালিক সামছুল আবেদীন জানালেন, প্রায় ২ যুগ আগে শখের বসে ৩টি গাভী নিয়ে খামারে গড়লেও তাদের খামারের দুধের সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ায় ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে তিনি বাণিজ্যিকভাবে দুগ্ধ খামার গড়ে তোলেন। বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই তারা দুধের দাম নির্ধারণ করেন।

ইতিপূর্বে দুধে লাভবান হলেও বর্তমানে দুগ্ধ খামারীরা লোকসানের মুখে বলে তিনি জানান। হোটেল-রেস্তোরাঁ ও সামাজিক অনুষ্ঠান বন্ধ থাকায় বিপাকে দুগ্ধ খামারিরা। আবার গো খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধিই লোকসানেরো একটা কারণ।

করনাভাইরাসের কারনে দুধ কম বিক্রি হলেও গরুকে তো খাওয়াতে হয়। আর খামারীরা গরুর দুধ বিক্রি করে, সেই টাকা দিয়েই গরুর খাবার খাওয়ায়।

এভাবে হোটেল-রেস্তোরাঁ সামাজিক অনুষ্ঠান বন্ধ থাকলে খামারিরা খুব বিপদে পড়বো।
বগুড়ার নাটাই পাড়া গ্রামের খামারি মামুন বলেন, আমাদের এখানে রোজার আগেও ৩৫ টাকা লিটার দুধ বিক্রি করেছি। এখন ৪০থেকে ৫০ টাকা দরে প্রতি লিটার দুধ বিক্রি হচ্ছে। তবে গরুর খাবারের দামও অনেক বেড়ে গেছে। আবার যদি দুধের দাম কমে যায় তখন খামারিদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।

আরেক খামারি কনিকা দেবি জানান, করোনাভাইরাস শুরু হওয়ার পর প্রায় দুইমাস অনেক টাকা লোকসান হয়েছে। রোজা এক মাস দুধের চাহিদা বেশি ছিল আর
দুধ ৪৫ থেকে ৫০ টাকা করে বিক্রি করেছি। করোনা ভাইরাসের কারণে দেশে যেভাবে গরুর খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে তা বেশি দামে দুধ বিক্রি করতে না পারলে খামারিদের টিকে থাকা কঠিন হবে।

খামারি সোনা মিয়া বলেন, ‘আমার খামারে ১০টি গাভী আছে এর মধ্যে ৫টি গাভী প্রতিদিন ১৫/২০ লিটার করে দুধ দেয়। এই দুধ আমি বাজারে বিক্রি করি। দুধ বিক্রির টাকা দিয়ে এনজিও কিস্তি, খামারের খরচ, সংসারের খরচ চালিয়েছি। কিন্তু এখন হোটেল গুলি বন্ধ থাকার কারণে বিক্রি কম হওয়ায় বিপাকে পড়ছি।

খামারি দুদু বলেন, ‘দুধ বিক্রির টাকায় আমরা সংসার চালাই। দুধ বিক্রি করতে না পারায় সংসার চালাতে পারছিনা।।’স্থানীয় খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বগুড়া শহরের বিভিন্ন বাজারে প্রতিদিন সকালে কমপক্ষে ৬০ থেকে ৭৫ মণ দুধ বিক্রির জন্য আনেন খামারিরা।

এইসব বাজার থেকে ব্যবসায়ীরা দুধ কিনে জেলার বিভিন্ন মিষ্টির দোকানসহ বাসায় বাসায় সরবরাহ করেন। করোনাভাইরাসের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কায় তাঁরা গত ৫ দিন ধরে দুধ কেনা বন্ধ করে দিয়েছেন। তাঁর মতো অনেক ব্যবসায়ীও দুধ কেনা বন্ধ করেছেন।

বগুড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: সেলিম হোসেন জানান, বগুড়ায় সরকারি দুধের খামার ১টি। বেসরকারি ভাবে উপজেলায় ১৩০/১৩৫ টি খামার গড়ে উঠেছে। মাসে এসব খামার থেকে ৩৫হাজার ৫০০মেট্রিক টন দুধ পাওয়া যায়।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..