দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

করোনা-পরবর্তী শিক্ষাখাতের চ্যালেঞ্জ

তাসনিম হাসান আবির: দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস ধরে বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে করোনাভাইরাসের কারণে। বৈশ্বিক এই মহামারির কারণে বাংলাদেশের সব সেক্টর ধীরে ধীরে খুলে দিলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে এবং সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে এই শিক্ষা খাতে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কবে খোলা হবে, সে বিষয়টা এখনও অনিশ্চিত।  সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বলা হচ্ছে করোনাভাইরাসের প্রকোপ সর্বনিন্ম পর্যায়ে না আসা পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। প্রশ্ন আসে করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষা খাতে সামনে কী চ্যালেঞ্জ আসবে? সহজেই অনুমেয় করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষা খাতকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এরই মধ্যে প্রাইমারি ও মাধ্যমিক পর্যায়ে কিছু নীতিমালা তৈরি হয়েছে যে কীভাবে সংকট মোকাবিলা করা যায়। সেখানে অক্টোবরে খুললে একরকম সিলেবাস তৈরি করেছেন এবং নভেম্বরে খুললে আরেক রকম সিলেবাস তৈরি করেছেন। আর এ বছরে যদি খোলা সম্ভব না হয়, তবে অটোমেশন ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। এসএসসি নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনও দূর হয়নি। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা পর্যায় এবং শিক্ষা-পরবর্তী চাকরি বাজারের কী হবে, সে বিষয়টা নিয়ে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। প্রথমত, সেশনজটের প্রবল সম্ভাবনা আছে। কারণ দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস ধরে বন্ধ আছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বছরের একটি সেমিস্টারও নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এখন সেপ্টেম্বর মাস চলছে। সামনে এ বছরের আর মাত্র তিনটি মাস বাকি আছে। এই তিন মাসে খুলবে কি না, সেটাও নিশ্চিত নয়। আবার অক্টোবরে খুললেও দুই সেমিস্টার নেওয়া সম্ভব নয়। তাই কয়েক মাসের সেশনজট হয়তো অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠছে। আর শিক্ষার্থীরা সেশনজটে পড়লে সব ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হবে। দ্বিতীয়ত, চাকরির বয়স প্রসঙ্গ। সরকারি চাকরির বয়স ৩০ বছর পর্যন্ত। সেক্ষেত্রে আমরা দেখছি এরই মধ্যে প্রায় এক বছর সময় নষ্ট হয়ে গেল প্রত্যেকের জীবন থেকে। বিশেষ করে যারা গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে চাকরিপ্রত্যাশী ছিল তাদের জন্য এটা অনেক বড় ক্ষতি। আমরা সবাই জানি সরকারি চাকরি প্রাপ্তি বা নিয়োগের জন্য অনেকটা সময়ের ব্যাপার পুরো প্রসেস শেষ হতে। তাই যাদের বয়স ২৮-২৯ ছিল বা হয়তো আর কয়েক মাস বাকি ছিল চাকরির বয়স শেষ হতে তারা সমস্যায় পড়ে যাবে। এক্ষেত্রে এরই মধ্যে সরকারি চাকরির বয়স ৩২ বা ৩৫ করার দাবি উঠেছে এবং পরিকল্পনামন্ত্রীর কথাতেও একটা আশা জেগেছে যে হয়তো করোনা-পরবর্তী সময়ে চাকরির বয়স বৃদ্ধি করা হবে। এটা করা উচিত অন্তত যেসব ব্যাচের গ্র্যাজুয়েশন শেষ হয়েছে তাদের জন্য হলেও। তৃতীয়ত, করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে। কারণ যদি প্রাইমারি বা মাধ্যমিক লেভেলে অটোমেশন করা হয়, তবুও পরবর্তী ক্লাসে তাদের সিলেবাসে পূর্ববর্তী ক্লাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ বিষয়টা এরই মধ্যে অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছেন। তখন চলমান ক্লাসের সিলেবাসের পাশাপাশি পূর্ববর্তী বিষয় শেষ করা শিক্ষার্থীদের বাড়তি চাপ হয়ে যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও দুটো সেমিস্টার শেষ করার তাড়া থাকবে। তখন তাদেরও বাড়তি চাপ সামলাতে হবে। চতুর্থত, বাংলাদেশে গবেষণায় বিরূপ প্রভাব পড়বে। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি গবেষণাও বন্ধ আছে। গবেষকরা বেশিরভাগ ঘরে অবস্থান করছেন। তারা গবেষণার জন্য বাইরের কোনো দেশে আপাতত যেতে পারছেন না। প্রতিবছরই অনেক গবেষক বাইরে থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে আসেন এবং অনেক গবেষক গবেষণার জন্য বাইরে যান। এখন এসব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এমনিতেই বাংলাদেশে গবেষণার মান বা গবেষণার হার নিয়ে সবসময় একটা প্রশ্ন, সমালোচনা বা বিতর্ক থেকেই যায়। সেখানে প্রায় এক বছর বন্ধ থাকার ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গবেষণা খাতে বিরূপ একটা প্রভাব পরবে। পঞ্চমত, শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে অসুস্থ হওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। কারণ শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটাই উপযুক্ত জায়গা। কিন্তু এই দীর্ঘ সময় তারা প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে ঘরবন্দি অবস্থায় আছে। হঠাৎ এই পরিবর্তনে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।  সবসময় ঘরে থাকার ফলে তাদের মনোজগতে বিরাট একটা পরিবর্তন হচ্ছে, সেটা নেতিবাচক পরিবর্তন এবং এর ফলে তাদের আত্মহত্যার পরিমাণ বেড়ে গেছে। কয়েক দিন আগেও আমরা দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা। তাছাড়া এই কয় মাসে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সাত-আট শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যেক উপজেলায় একজন করে চাইল্ড সাইকোলজিস্ট নিয়োগের কথা চিন্তা করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে প্রতিটি জেলায় এবং পরে প্রত্যেক উপজেলায় নিয়োগ দেওয়া হবে। এটা খুবই ভালো উদ্যোগ এবং বাস্তবায়িত হলে সেটা শিক্ষার্থীদের জন্য কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসবে। ষষ্ঠত, করোনা-পরবর্তী সময়ে বেকারত্বের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। বাংলাদেশে এমনিতেও বেকার সমস্যা অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। প্রতি বছরই গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে অসংখ্য শিক্ষার্থী বেকারত্বের খাতায় নাম লেখায়। তার ওপর করোনার সময় দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বন্ধ থাকা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মী ছাঁটাই বিষয়টাকে আরও জটিল করবে। এর প্রভাব অর্থনীতিতেও পড়বে। সপ্তমত, শিক্ষার্থীদের মোবাইল ও ইন্টারনেটের প্রতি অতি আসক্তি। এই করোনার সময় স্বাস্থ্যবিধির অন্যতম একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ঘরে অবস্থান করা। কিন্তু বাচ্চাদের হঠাৎ করে ঘরে অবস্থান করাতে গিয়ে বাবা-মা তাদের হাতে মোবাইল তুলে দিচ্ছে। সময় কাটানোর অজুহাতে তখন বাচ্চারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফ্রি ফেয়ার ও পাবজির মতো গেম খেলছে। এতে তাদের চোখ, মাথা ও ব্রেনে যেমন সমস্যা হচ্ছে, তেমনই মোবাইল বা ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি বেড়ে যাচ্ছে। অনেকে অনলাইন ক্লাসে যোগদানের নাম করে ইউটিউবে সময় কাটাচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের ওপর নেতিবাচকভাবে প্রভাব পড়ছে। অষ্টমত, করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষাকে আমূল পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষাকে কীভাবে আরও কর্মমুখী করা যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা মোটেই কর্মমুখী নয়। স্নাতক পর্যায়ের বেশিরভাগ ডিপার্টমেন্টের পড়াই বাস্তব জীবনে কোনো কাজে লাগে না। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকেই সরকারি চাকরির জন্য একই সিলেবাস পড়তে হয় এবং তখন নতুন করে নতুন আঙ্গিকে আবার পড়া শুরু করতে হয়, যা অনেকটা সময় নষ্ট করে।

পড়ালেখা শেষ করে তরুণ-তরুণীরা বাজারের গাইড পড়ে চাকরির পরীক্ষায় বসে। আবার এখন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়াররা তাদের নিজস্ব পেশা ছেড়ে দিয়ে বিসিএসের দিকে ঝুঁকছে। আসলে আমাদের বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষাকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এখানে কর্মমুখী শিক্ষার কোনো মূল্য নেই। কিন্তু আমরা যদি বাইরের দেশের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব সেখানে তাদের শিক্ষা পুরাপুরি কর্মমুখী।  উন্নত দেশগুলো, যেমন চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা, জার্মানি, রাশিয়াÑএসব দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পুরাপুরি কর্মমুখী, যার ফলে তারা আজকে উন্নত দেশ। এই করোনার সময় আমরা আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করেছি যে কর্মমুখী শিক্ষার গুরুত্বটা আসলে কতখানি। তাই করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষাকে কর্মমুখী করার উদ্দেশ্যে শিক্ষা খাতের আমূল পরিবর্তন করে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যার ইঙ্গিত শিক্ষামন্ত্রী দিয়েছেন। কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং সমাজে এটার সম্মানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাছাড়া এই করোনা মহামারি থেকে আমাদের শিক্ষা খাতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও অনেক কিছু শেখার আছে। ভবিষ্যতে এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে আমরা যেন সব রকম প্রস্তুতি রাখতে পারি সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশের নেটওয়ার্ক ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে। যাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রয়োজন হলেও শিক্ষার্থীরা যেন ঘরে বসে ক্লাস করতে পারে অনলাইনে। ডেটা প্যাকের মূল্য কমাতে হবে। বাংলাদেশের মতো এত বেশি ডেটা খরচ আর কোনো দেশে নেই। সব দেশে ডেটা প্যাক খুবই স্বল্পমূল্যে দেওয়া হয়। অথচ এদেশে উচ্চমূল্যে ডেটা কিনেও দুর্বল নেটওয়ার্কের জন্য উপযুক্ত কাজটি করা যায় না। উচ্চপর্যায়ের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর হাতে যেন স্মার্টফোন থাকে সেটা নিশ্চিত করতে হবে এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাতে ভবিষ্যতে এমন অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও আমরা শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারব।

এখন আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কীভাবে শিক্ষা খাতের এই ক্ষতিকে পুষিয়ে নেওয়া যায়। শিক্ষার্থীদের যাতে অতিরিক্ত কোনো চাপ না দেওয়া হয়, সে বিষয়টা খেয়াল রাখতে হবে, আর যথোপযুক্ত বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শিক্ষা খাতকে কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ এখান থেকেই বের হয় এবং ভবিষ্যৎ নির্ধারণও হয় শিক্ষা খাতের সফলতা, ব্যর্থতার ওপর। করোনা একদিন চলে যাবে, কিন্তু যে শিক্ষাটা আমাদের দিয়ে যাচ্ছে, সেটা যেন আমরা সবাই বিবেচনায় রাখি। করোনা-পরবর্তী সময়ে সবাই মিলে শিক্ষা খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..