দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

করোনা মানেই মৃত্যু নয়

 জাহাঙ্গীর হাফিজ: অনেকের মধ্যেই ধারণা আছে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেই মৃত্যু, এ ধারণাটি একদম ভুল। আজকে সারা বিশ্বে করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) এক বিশ্ব মহামারিতে রূপান্তরিত হয়েছে, যা এর আগে পৃথিবীর মানুষ নিকট অতীতে দেখেনি। আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে স্প্যানিশ ফ্লু এসেছিল, যাতে প্রায় ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এর আগেও প্লেগ গুটিবসন্ত ও অন্যান্য মহামারিতে পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় বহু মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হলে মৌলিক কতগুলো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। প্রথম অবস্থায় সারা বিশ্বের মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়লেও বর্তমানে মানুষ সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। এখন আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, অতীতে পৃথিবীতে মানুষ অনেক বড় বড় মহামারির সম্মুখীন হয়েছে আবার সেটাকে জয় করতেও সক্ষম হয়েছে। কাজেই আমাদের মনোবল ভাঙলে চলবে না। বিশ্বে উন্নত দেশগুলোতেও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে এটা আমরা সবাই জানি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সারাবিশ্বে কভিড-১৯ করোনাভাইরাসে বিশ্বে ২.৫ কোটিরও বেশি মানুষ আক্তান্ত হয়েছে এবং এ পর্যন্ত ৮ লাখ ৫০ হাজারের অধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে; কাজেই পৃথিবীর অন্যান্য দেশের থেকে শিক্ষা লাভ করে বাংলাদেশও করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করছে সর্বাত্মকভাবে।

করোনা মানেই মৃত্যু নয়। করোনা যুদ্ধে নামার আগে একজন মানুষ হিসেবে আপনার করণীয় পাঁচটি ধাপ মনে রাখতে হবে। মনোবল ঠিক রাখা, পরিবারের অন্যদের সুস্থ রাখা, নিজে সুস্থ থাকা (লক্ষণভেদে চিকিৎসা), খারাপ হওয়ার লক্ষণগুলো খেয়াল রাখা এবং নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন।

করোনার লক্ষণগুলোকে তিন ধাপে বিচার করা যায়Ñযেমন প্রথম তিনদিন গলা খুসখুস করা, হালকা হাঁচি, সর্দি-কাশি, হালকা জ্বর অনুভূত হতে পারে। দ্বিতীয় তিনদিন জ্বরের মাত্রা একটু বেশি এবং সঙ্গে কাশি ও শ্বাসকষ্ট হতে পারে। এরপর তৃতীয় তিনদিন আপনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় কাজেই এখন আপনাকে খুবই সতর্ক হতে হবে। যদি খুব বেশি শ্বাসকষ্ট না হয় তাহলে সাধারণ চিকিৎসায় আপনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। এরপরও যদি আপনার শ্বাসকষ্ট, জ্বর, পাতলা পায়খানা ইত্যাদি নানা রকম উপসর্গ দেখা দেয় তাহলেই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রয়োজন। করোনা পজিটিভ হলে আপনি কখনোই অতিরিক্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন না তাতে আপনার মনোবল ভেঙে যেতে পারে। শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিক রাখতে হবে, করোনা আক্তান্তদের সুস্থতায় মানসিক শক্তি খুবই জরুরি। অনেক সময় কোনোরকম লক্ষণ ছাড়াই করোনা হতে পারে।

কভিড-১৯ বা করোনা প্রতিরোধে পুষ্টিকর খাবার একটি জরুরি বিষয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ভিটামিন সি, ডি ও জিংক সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া প্রয়োজন। লেবু, আমলকী এবং টক জাতীয় ফলে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি থাকে। এছাড়া দুধ, ডিম, মাছ, মাংস পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়া প্রয়োজন। এছাড়া শরীরে খোলা হাওয়ায় রোদে অবস্থান করলে ভিটামিন ডি-এর অভাব পূরণ হয়। করোনা আক্রান্ত রোগী ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ বাসায় চিকিৎসা নিয়ে দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠছে। আর পাঁচ শতাংশ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাসায় সুস্থ হয়ে ফিরছে। বাকি পাঁচ ভাগ রোগী আইসিইউ অথবা ভেন্টিলেশনে চিকিৎসা নিতে হয়। এদের মধ্যে যাদের শরীরে আগে থেকেই অন্যান্য ক্রনিক অসুখের জটিলতা আছে তাদের মৃত্যু আশঙ্কা বেশি। আর যাদের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকে এবং ক্রনিক কোনো রোগ নেই তারা তুলনামূলক নিরাপদ। এছাড়া কোনো লক্ষণ ছাড়াও একজন মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। এ ধরনের রোগীরা পরিবার ও সমাজে অন্যান্য মানুষকে করোনা সংক্রমিত করতে পারে।

করোনাভাইরাস কতটা ভয়ঙ্কর সে বিষয়ে কিছু আলোকপাত করা যাক। শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য অসুস্থতার মতোই ভাইরাসের যথেষ্ট মিল খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন সর্দি, কাশি, গলা ব্যাথা এবং জ্বরসহ নানারকম উপসর্গ দেখা দিতে পারে; এর ফলে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং শরীরের বিভিন্ন অরগান বিকল হওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। তবে খুব কম ক্ষেত্রেই এই রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যারা আগে থেকেই কিডনি, লিভার, হার্ট ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত থাকে তাদের জন্য করোনাভাইরাস অনেক বিপজ্জনক ও ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

করোনা প্রতিরোধে আমাদের কী করণীয় এই জরুরি বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করতে গেলে প্রথমেই করোনাভাইরাস খুবই সংক্রামক একটি রোগ বিষয়টি অতি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনতে হবে। সারাবিশ্বে করোনা প্রতিরোধে বিভিন্ন রকম পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। ডঐঙ বা ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশ এই নিয়মগুলো মেনে চলার চেষ্টা করছে। তার মধ্যে মাস্ক পরা অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। ঘরের বাইরে গেলে ছোট, বড় প্রতিটি মানুষের বিশেষত ১২ বছরের ওপরে সব মানুষের মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী মাস্ক পরা অতি উত্তম। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে মাস্ক পরার ব্যাপারে সচেতনতার অভাব যথেষ্ট পরিমাণে পরিলক্ষিত হলেও বর্তমান সরকারের নানামুখী প্রচারণামূলক উদ্যোগ নেওয়ার ফলে  মাস্ক পরার প্রতি মানুষ আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন।

বর্তমান সরকারের মোটিভেশনাল প্রোগ্রামের কারণে এখন সাধারণ মানুষ আগের তুলনায় অনেক সচেতন। পৃথিবীর অন্য উন্নত দেশগুলো যেখানে করোনা প্রতিরোধে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ অনেকাংশে সফলতা অর্জন করেছেÑএ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। করোনা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩১ দফা নির্দেশনা প্রদান করেছেন। ওই নির্দেশনার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বলেছেন; এছাড়া করোনা উপসর্গ দেখা দিলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।

করোনাকে প্রতিহত করতে দেশের আপামর প্রতিটি মানুষেকে সচেতন হতে হবে আরও বেশি। অনেকের মধ্যেই করোনা নিয়ে অনেক ভুল ধারণা আছে সে বিষয়গুলো আরও বেশি কাউন্সেলিং ও মোটিভেশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করাও করোনা প্রতিরোধে সহায়তা করবে। আশার বাণী হলো পৃথিবীর কয়েকটি দেশে করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণায় প্রায় সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১৫০ প্রতিষ্ঠান করোনা ভ্যাকসিন তৈরির কাজ করছে। চীনের সিনোফার্মসহ ৩টি প্রতিষ্ঠান, ইংল্যান্ডের অ্যাস্ট্রাজেনেকা, ইম্পেরিয়াল কলেজ আমেরিকার নোভাভ্যাক্স ও মর্ডানা, জার্মানির বায়োএসটেক, ফাইজারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ফেজ-২ ফেজ-৩ ও অনুমোদন পর্যায়ে রয়েছে। ইতোমধ্যে চীনের প্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে। আশার কথা এই যে, বাংলাদেশ ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য বিশ্বের নামিদামি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে।

করোনা মানেই মৃত্যু নয়, এ প্রসঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গ্লোবাল অ্যাডভাইজারি বোর্ডের প্রধান নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিত বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, করোনা মানেই মৃত্যু নয়। এক ভিডিও বার্তায় অভিজিৎ বলেছেন, উপসর্গ তেমন না থাকলে বাড়িতে বা সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে বা হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নেওয়া ভালো। তিনি বলেন, করোনা যুদ্ধে আমাদের জয় নিশ্চিত যে বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা ও উদার মানসিকতার জন্য বাংলার মানুষ বিশ্বনন্দিত, সেটা হারালে চলবে না।

সবকিছু পর্যালোচনা করলে এটা বলতেই হয় করোনা মানেই মৃত্যু নয় বা রোগটি নিয়ে আতঙ্কেরও কিছু নেই; তবে আমাদের সাবধানতার জন্য কিছু নিয়ম অবশ্যই মেনে চলতে হবে। গণপরিবহন বা ভাড়াচালিত যানবাহন যতদূর সম্ভব এড়িয়ে চলতে পারলে ভালো। হাঁচি, কাশি দিলে টিস্যু ব্যবহার করতে হবে এবং এ টিস্যু পুনরায় ব্যবহার করা যাবে না। কেউ যদি রুমাল ব্যবহার করেন তাহলে সেই রুমাল ও হাত সাবান দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। বাইরে থেকে ঘরে ঢুকে সাবান দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধুয়ে নিতে হবে। করমর্দন বা কোলাকুলি থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে। যথাসম্ভব বাড়িতে থাকতে পারলে ভালো। খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়া ভালো। দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রতিদিন সুষম খাবার, টাটকা শাকসবজি ও ফলমূল খেতে হবে এবং নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে। ধূমপান ও মদ্যপান সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে। খাবার ভালোভাবে সিদ্ধ করে খেতে হবে। যেখানে সেখানে কফ, থুতু ফেলা যাবে না।

পরিশেষে এ কথা বলাই যায় সাধারণ মানুষের সার্বিক সচেতনতা ও সহযোগিতা থাকলে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বই করোনাকে জয় করতে পারবে। সচেতনতায় থাকবে দেশ, করোনা হবে নিরুদ্দেশ।

   পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..