আজকের পত্রিকা মত-বিশ্লেষণ

‘করোনা শেষে উদ্ভাসিত হবে প্রতিচ্ছবি’

এম নুরুল আলম, সিজিআইএ, সিসিইপি-আই, এফসিএস

করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) বৈশ্বিক মহামারির রূপ ধারণ করেছে। বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনাভাইরাস-আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়, যদিও ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান রাজ্যের একটি মাছের বাজার থেকে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি হয়। মাছের বাজারে আক্রান্ত দোকানি কয়েক দিন রোগে ভোগার পর নিজেই উহানের একটি সংক্রামক ব্যাধির হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ওই রোগীর চিকিৎসকরা করোনাভাইরাস ব্যাপক ছোঁয়াচে বলে রিপোর্ট করা শুরু করলে তা সংবাদমাধ্যমে আসে। কথিত আছে, চীন সরকার ওই হাসপাতাল-সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশে গোপনীয়তা আরোপ করেছিল।

এরপর কভিড-১৯ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক সংক্রমণ শুরু হয় ফেব্রুয়ারি-মার্চে। যুক্তরাষ্ট্রে মার্চে সংক্রমণ শুরু হয়। এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, ৮০ হাজারের বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের পরই অন্যান্য দেশের মধ্যে যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, ব্রাজিল, বেলজিয়াম, জার্মানি ও ইরানে মৃতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সারা বিশ্বে ১০ মে পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ ৮০ হাজারের বেশি মৃত্যু হয়েছে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে।

চীন এ ভাইরাসকে উহানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিল। চীনের অন্য কোনো অঞ্চলে এটি তেমনভাবে ছড়ায়নি এবং মৃতের সংখ্যা সাড়ে চার হাজারের মতো। এদিকে বাংলাদেশে প্রথম সংক্রমিত রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ এবং ১০ মে পর্যন্ত মোট মৃতের সংখ্যা দুইশ’র বেশি এবং মোট আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৫ হাজারের কাছাকাছি। বাংলাদেশ সরকার অফিস-আদালত, কলকারখানা সবকিছু ২৬ মার্চ থেকে বন্ধ ঘোষণা করেছে। অদ্যাবধি লকডাউন চলছে। আগামী ১৬ মে পর্যন্ত লকডাউন চলবে বলে ঘোষণা রয়েছে।

করোনা মহামারি থেকে মানুষ অনেক শিক্ষা অর্জন করেছে, যেমন-পৃথিবীর শক্তিধর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করেছে সমরাস্ত্রের মজুত বাড়াতে। চিকিৎসাসেবায় বরাদ্দ ছিল অল্প। এই বৈশ্বিক মহামারির বিরুদ্ধে ওই সমরাস্ত্র কোনো কাজে আসছে না, বরং চিকিৎসা সরঞ্জামের অপ্রতুলতা বিশ্বকে ভোগাচ্ছে। করোনা-আক্রান্ত রোগী বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করছে। অতি প্রয়োজনীয় অক্সিজেন, ভেন্টিলেটর ও আইসিইউ অত্যন্ত অপ্রতুল। এ নিয়ে বিশ্বনেতাদের দ্বিতীয়বার ভাবার সময় হয়েছে।

অতি প্রিয় সাত বন্ধু একইসঙ্গে নারায়ণগঞ্জে একটি সাততলাবিশিষ্ট দালান তৈরি করেন। সাত বন্ধু মিলেমিশে একই ভবনে একেক ফ্লোরে প্রত্যেকে পরিবারসহ বসবাস করেন। তাদের মধ্যে এক বন্ধু তার স্ত্রী ও ছোট দুই মেয়েসহ চারতলায় থাকতেন। তিনি নারায়ণগঞ্জ শহরের গলাচিপা এলাকার স্বনামধন্য ব্যবসায়ী খোকন সাহা।

এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তার পরিবারের সদস্যরা অন্যান্য ফ্লোরে থাকা বন্ধুদের কাছে খবর দেন এবং হাসপাতালে নিতে সহযোগিতা করার জন্য অনুরোধ করেন। অসহায় পরিবারটি তাদের স্বজনদেরও খবর দিয়ে সহযোগিতা চায়। কিন্তু কেউ খোকন সাহাকে হাসপাতালে নিতে এগিয়ে আসেনি। অবশেষে তার মেয়েরা তাকে হাসপাতালে নিতে চারতলা থেকে নামানোর চেষ্টা করেন।

কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে খোকন সাহা সিঁড়িতেই মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃতদেহ সিঁড়ি থেকে নামাতে এবং সৎকারের জন্যও কোনো আপনজনের সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। অসহায় দুই মেয়ে ও খোকন সাহার স্ত্রীর আহাজারির শেষ নেই। এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জ ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার এগিয়ে আসেন।

ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার তার লোকজন নিয়ে এসে লাশ নিচে নামান এবং সৎকারের ব্যবস্থা করেন। এমনকি খোকন সাহার মুখাগ্নির জন্যও তার কোনো স্বজন এগিয়ে আসেননি। খোকন সাহার পরিবারের অনুমতি নিয়ে মাকসুদুল আলম খন্দকার নিজেই সৎকারের উদ্দেশ্যে মৃতদেহে মুখাগ্নি করেন গত ২৭ এপ্রিল। এমন বিপদে কোনো বন্ধু এগিয়ে এলো না। আমরা জানি, ‘বিপদের বন্ধুত্বই প্রকৃত বন্ধুর পরিচয়।’

গাজীপুর, ঝিনাইদহ প্রভৃতি স্থানে বৃদ্ধ মা-বাবাকে নিজ সন্তানেরা বাড়ির বাইরে ফেলে যায় করোনাভাইরাসের ভয়ে। এ কেমন নিষ্ঠুরতা! মানুষ এত নির্দয় হতে পারে? নিজের মা-বাবাকে ফেলে দেয় রাস্তায়! পুলিশসদস্য বৃদ্ধা আর বৃদ্ধকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন।

এই করোনা মহামারি চলে যাবে। মহামারি চিরস্থায়ী হয় না। স্বাভাবিক হয়ে যাবে সবকিছু। কোথায় যাবে এই ছেলেমেয়েরা, যারা বৃদ্ধ বয়সের কারণে মা-বাবাকে রাস্তায় ফেলে দিয়েছিল? এ মা-বাবাই তাদের জন্ম দিয়েছেন এবং লালনপালন করে দুনিয়াতে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। অকৃতজ্ঞ ও বেঈমান এসব কলঙ্কিত ছেলেমেয়েদের ধিক্কার!

এ মহামারি শেষে পৃথিবী অনেক ক্ষেত্রে বদলে যাবে। অস্ত্র বানানোর খরচ হয়তো চলে যাবে রোগের প্রতিষেধক ও ওষুধ তৈরি এবং গবেষণা করে। এই মহামারিতে মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাপী কোনো দেশই এই করোনাভাইরাসের আক্রমণ ঠেকাতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন শত শত মানুষ মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে। আক্রান্ত হচ্ছে হাজার হাজার। ১০ মে পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে মোট করোনায় মৃত্যু হয়েছে প্রায় দুই লাখ ৮০ হাজার এবং আক্রান্ত মোট ৪০ লাখ!

কভিড-১৯ তথা করোনাভাইরাস বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিকে সাংঘাতিকভাবে আঘাত করেছে। তাই অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ব্যস্ত দেশের সরকারপ্রধানরা। পর্যায়ক্রমে লকডাউনও তুলে নেওয়া হচ্ছে। চীন, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র, এমনকি বাংলাদেশেও করোনা মোকাবিলায় সরকার ঘোষিত ছুটি, যা দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে, তা পর্যায়ক্রমে শিথিল করা হচ্ছে।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকরা কারখানা চালু করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। রপ্তানির বাধ্যবাধকতাসহ নানা অজুহাতে অনেক কারখানা খুলে দেওয়া হয়েছে। পোশাকশিল্প মালিকদের কারণে বিপুলসংখ্যক গার্মেন্ট শ্রমিক একবার গ্রামে, একবার ঢাকায়, আবার গ্রামে এবং আবার ঢাকায় আসা-যাওয়ার মাধ্যমে অনেক ভোগান্তিতে পড়েছে।
এই মহামারিতে সবাই জীবন নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত। এ অবস্থায় কেউ পরম আত্মীয়কেও দূরে ঠেলে দিচ্ছে। আবার কেউ নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে সবার সেবা করছে। এইদিন একদিন ইতিহাস হবে, তখন কেউ পাবে বীরের মর্যাদা, আর কেউ নিজ কর্মের কারণে লজ্জাবোধ করে নিজেকে ঘৃণা করবে।

এমন অসংখ্য ঘটনা আমাদের মনে চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবে-ছোট্ট ছেলে ডাক্তার বাবাকে পা জড়িয়ে ধরে হাসপাতালে ডিউটিতে যেতে বাধা দিচ্ছে, কিন্তু বাবা কর্তব্য পালনে ছেলের বাধা অতিক্রম করে চলে যাচ্ছেন। নিউ ইয়র্কে করোনা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা শত শত নাগরিক করোনা রোগীর চিকিৎসা করা এক ডাক্তারের বাসার সামনে দিয়ে গাড়িমিছিল করে তাকে সম্মান প্রদর্শন করেছেন। অন্য এক ডাক্তার হাসপাতালে ডিউটি শেষে বাসায় ফিরলে অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকার দরজায় দেখতে পান ‘স্বাগত বীর’ অথবা ‘গর্বিত তোমাদের জন্য’ লেখা প্ল্যাকার্ড। সিঁড়ির ধাপে ধাপে বিভিন্ন ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীরা স্বাগত জানান এবং সেলিব্রেট করে বলেন, ‘তুমি আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দা, তাই আমরাও সম্মানিত বোধ করি।’

অন্যদিকে আক্রমণের ভয়ে বাড়ির মালিক একজন সেবিকাকে বাসা ছেড়ে দিতে বলেন। ডাক্তার ও সেবিকাকে নিজ এলাকায় প্রতিবেশীরা ঢুকতে বাধা দেন।
উন্নত দেশে প্রতিষেধক আবিষ্কারের লক্ষ্যে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, মৃত্যুর সংখ্যা কমে আসছে। কভিড-১৯-এর যাওয়ার সময় এসেছে। নিশ্চয় ভালো দিন আসবে, আর করোনা শেষে উদ্ভাসিত হবে তার প্রতিচ্ছবি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..