প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

কর্ণফুলী টানেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই কর্মকর্তার দ্বন্দ্ব

ধারাবাহিকের শেষ পর্ব…………..

 

ইসমাইল আলী: কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে ঠিকাদার ও পরামর্শক নিয়োগে চুক্তি সই করেন সেতু বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী। প্রকল্পটির সব ধরনের নিয়ন্ত্রণও তার হাতে। এর মধ্যে গত ২২ ডিসেম্বর টানেল নির্মাণে পৃথক প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেয় সেতু বিভাগ। তবে প্রকল্পের কোনো ধরনের ক্ষমতা তার হাতে দেওয়া হয়নি। বিষয়টি জানতে সম্প্রতি চিঠি দিয়েছে প্রকল্পটির পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো। এ নিয়ে সেতু বিভাগের সচিবের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন প্রকল্প পরিচালক। এতে সেতু বিভাগের দুই কর্মকর্তার মধ্যে দেখা দিয়েছে দ্বন্দ্ব।

সচিবকে পাঠানো চিঠিতে প্রকল্প পরিচালক জানান, প্রকল্পটির অনুমোদিত উন্নয়ন প্রস্তাবনাতে (ডিপিপি) একটি অরগানোগ্রাম আছে। সেটি অনুসরণ করেই টানেল প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। এতে দায়িত্ব ও চাকরির জবাবদিহিতা অংশে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাজের সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। সে অনুযায়ী প্রকল্পটি যাতে বাজেট ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন হয় সে ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রকল্প পর্যবেক্ষণ, অর্থ ছাড়করণ ও প্রকল্পের গুণগত বাস্তবায়ন নিশ্চিতের দায়িত্ব প্রকল্প পরিচালকের। এছাড়া প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রকল্প পরিচালক।

এ অবস্থায় প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের জন্য কিছু ক্ষমতা দেওয়া দরকার। তবে প্রকল্পটির ঠিকাদার ও পরামর্শক নিয়োগ চুক্তিতে এ ক্ষমতা সেতু বিভাগের প্রধান প্রকৌশলীকে দেওয়া হয়েছে। তাই প্রকল্প পরিচালকের কোনো ধরনের নির্দেশনা, আদেশ বা অনুরোধ প্রদানের ক্ষমতা নেই। এছাড়া প্রকল্পের আর্থিক ক্ষমতাও প্রধান প্রকৌশলীকে দেওয়া হয়েছে। তাই চুক্তি সংশোধন করে প্রকল্পটির ক্ষমতা পরিচালককে দেওয়ার অনুরোধ করা হয় চিঠিতে।

জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ইফতেখার কবির শেয়ার বিজকে বলেন, সাধারণত প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ পরিচালকের হাতেই থাকে। সব ধরনের ক্ষমতা ও জবাবদিহিতা তার এখতিয়ারভুক্ত। তবে টানেলের ক্ষেত্রে প্রকল্পের সব ক্ষমতা প্রধান প্রকৌশলীার হাতে। চুক্তি সইয়ের সময় প্রকল্প পরিচালক না থাকায় তিনি সই করেন। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে আপত্তি তুলেছে পরামর্শক সংস্থাগুলো। তাই চুক্তি সংশোধন করে ক্ষমতা প্রকল্প পরিচালককে দিতে অনুরোধ করে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, গত ১৪ জানুয়ারি কর্ণফুলী টানেলের প্রকল্প পরিচালকের কাছে চিঠি পাঠায় পরামশর্ক প্রতিষ্ঠান স্ম্যাক ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস। প্রকল্পটির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কার হাতে জানতে চাইলে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) প্রধান প্রকৌশলী প্রকল্পটির প্রতিনিধি। তার হাতে প্রকল্পটির সর্বময় ক্ষমতা রয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আনা হলে বিষয়টি তাদের জানা নেই। তাই বিবিএর পক্ষ থেকে কোনো চিঠি দেওয়া হলে তা প্রধান প্রকৌশলী স্বাক্ষরিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রকল্প পরিচালকের কোনো চিঠি আমরা অনুসরণ করতে বাধ্য নই। তাই প্রকল্পটির ক্ষমতা কার নিয়ন্ত্রণে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও পরামর্শক বিদেশি। সই করা চুক্তিগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের। তাই চাইলে চুক্তি সংশোধন করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হবে। পাশাপাশি লেজিসলেটিভ বিভাগের মতামতও লাগবে। এরপর চুক্তি সংশোধন করতে হবে। চাইলেই চুক্তি সংশোধন সম্ভব নয়। তাই সহজেই প্রকল্পটির জটিলতা মিটছে না।

সেতু বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, পরামর্শকের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে চুক্তি সংশোধনের বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। দ্রুতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তথ্যমতে, টানেল নির্মাণে পর্যাপ্ত লোকবলও নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এতে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন বিঘিœত হচ্ছে বলে মনে করছেন প্রকল্প পরিচালক। সেতু বিভাগের সচিবকে পাঠানো চিঠিতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ডিপিপি অনুযায়ী টানেল প্রকল্পে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিসহ ২৯ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়ার কথা। তবে বর্তমানে মাত্র পাঁচজনকে প্রকল্পটিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে ছয় ভাগের এক ভাগ লোকবল দিয়ে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে প্রকল্পটির সুষ্ঠু বাস্তবায়নে দ্রুত জনবল নিয়োগ দেওয়ার অনুরোধ করা হয়।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে জেলার দক্ষিণাংশের দূরত্ব কমাতে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণ করা হবে দেশের প্রথম টানেল। চীনের অর্থায়নে জিটুজি ভিত্তিতে এটি নির্মাণ করবে চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি) লিমিটেড। টানেলটি নির্মাণ তদারকিতে মূল পরামর্শক হিসেবে কাজ করবে অস্ট্রেলিয়ার স্ম্যাক ইন্টারন্যাশনাল ও ডেনমার্কের সিওডব্লিউআই। এদের সহযোগী হিসেবে থাকছে হংকংয়ের ওভিই অরুপ অ্যান্ড পার্টনারস এবং বাংলাদেশের তিন প্রতিষ্ঠান এসিই কনসালটেন্ট, ডেভেলপমেন্ট কনসালটেন্ট ও স্ট্র্যাটেজিক কনসালটিং কোম্পানি লিমিটেড। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে আট হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।