প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

কর্ণফুলী টানেলের ব্যয় বাড়ার দায় নেবে না চীন

 

ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্ব………………

ইসমাইল আলী: চীনের অর্থায়নে চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণ করা হবে টানেল। এজন্য ব্যয় ধরা হয়েছে আট হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। ২০১৫ সালের নভেম্বরে প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়। আর বাণিজ্যিক চুক্তি সই হয়েছে গত বছর জুনে। তবে এখনও টানেল নির্মাণ শুরু হয়নি। এছাড়া গত অক্টোবরে ঋণচুক্তি সই হলেও তা কার্যকর হয়নি। এতে ঝুলে আছে টানেল নির্মাণ। ফলে প্রকল্প ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যদিও ব্যয় বাড়ার দায় নিতে রাজি নয় চীন সরকার।

সম্প্রতি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) পাঠানো চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়। সেতু বিভাগের পাঠানো সে চিঠিতে বলা হয়, সরকারি কনসেশনাল ঋণ চুক্তির ৯.১ অনুচ্ছেদ ও ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর স্বাক্ষরিত অগ্রাধিকার ঋণ চুক্তির শর্তানুসারে প্রকল্পের ব্যয় বাড়া চীন সরকার বহন করবে না। বাংলাদেশ সরকারকে এসব ব্যয় বহন করতে হবে। একইভাবে টানেল নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন ব্যয়ও বহন করতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। এজন্য ঋণচুক্তি কার্যকরে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। না হলে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ব্যয় সরকারকে বহন করতে হবে।

জানতে চাইলে সেতু বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, চীনের ঋণচুক্তি এখনও কার্যকর হয়নি। এতে টানেলের নির্মাণ শুরু বিলম্বিত হচ্ছে। এছাড়া ঋণচুক্তির শর্ত ছিল প্রকল্পের ব্যয় বাড়া তারা বহন করবে না। বাংলাদেশ সরকারকে এ ব্যয় বহন করতে পারে। তাই বিষয়টি জানিয়ে ইআরডিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে, যাতে দ্রুত প্রকল্পটি শুরু করা যায়।

তথ্যমতে, সম্ভাব্যতা যাচাইশেষে টানেল নির্মাণ প্রকল্প চূড়ান্তে দুই বছর পেরিয়ে যায়। এতে অনুমোদনের আগেই প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে গেছে দুই হাজার ৮৪৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা যাচাইশেষে ২০১৩ সালে টানেল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় পাঁচ হাজার ৬০০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ২০১৫ সালে এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় আট হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। গত বছর জুনে এ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত চুক্তি সই করা হয়। এরপর দেড় বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। এতে প্রকল্প ব্যয় আবারও বাড়ার শঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সেতু বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রসঙ্গে বলেন, ২০১৫ সালের মার্চে টানেল নির্মাণে চূড়ান্ত প্রস্তাব দেয় সিসিসিসি। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ছাড়া অন্যান্য নির্মাণ উপকরণের ব্যয় বেড়েছে। দেশেও দুই বছরে পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুসারে রেট সিডিউল বেড়েছে। এতে টানেল নির্মাণে ব্যয় আবারও বাড়তে পারে। তাই দ্রুত এটি নির্মাণ শুরু করা উচিত।

সূত্র জানায়, টানেল নির্মাণে ৭৬ কোটি ডলার বা প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা বায়ার্স ক্রেডিট হিসেবে দেবে চীন। চায়না এক্সিম ব্যাংকের ২০ বছর মেয়াদি এ ঋণে গ্রেস পিরিয়ড থাকবে পাঁচ বছর। আর লন্ডন আন্তঃব্যাংক অফার রেটের (লাইবর) সঙ্গে ২ শতাংশ যোগ করে যে হার পাওয়া যায়, তা হবে ঋণের সুদহার। এছাড়া ১ শতাংশ ম্যানেজমেন্ট ফি ও ২ শতাংশ কমিটমেন্ট ফি পরিশোধ করতে হয়। এতে নির্মাণকালীন সুদ পরিশোধ বাবদ প্রায় ৪২৯ কোটি টাকা ব্যয় হবে। টানেলটি নির্মাণে বাকি প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহ করা হবে।

এদিকে টানেল নির্মাণ ব্যয়ে বেশ কিছু অপ্রয়োজনীয় ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি গাড়ি কেনায় ১০ কোটি ও সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণে ছয় কোটি টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। এর পুরোটাই চীনের ঋণে বহন করা হবে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার সরবরাহ করবে সিসিসিসি। এতে ব্যয় হবে ২৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা। অথচ পদ্মা সেতুর জন্য একই ধরনের সফটওয়ার কেনা হয়েছে দুই কোটি ১৭ লাখ টাকায়।

যদিও প্রাথমিকভাবে ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার সরবরাহে কোনো প্রস্তাব করেনি সিসিসিসি। ২০১৫ সালের মার্চে টানেল নির্মাণে আর্থিক প্রস্তাব দেওয়ার সময়ও সফটওয়্যার কেনার প্রস্তাব ছিল না সিসিসিসির। তবে গত বছর জুনে প্রকল্প ব্যয় চূড়ান্ত করার সময় সফটওয়্যার ও টাগবোট কেনা অন্তর্ভুক্ত হয়। চীনের ঋণে টাগবোট কেনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ৭১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।

প্রকল্পটির সার্ভিস এরিয়া ভাড়াও অস্বাভাবিক মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সম্ভাব্যতা যাচাইকালে এ খাতে ব্যয় ধরা হয় মাত্র ৫০ কোটি টাকা। অথচ বাণিজ্যিক চুক্তিতে নির্মাণ এলাকা ভাড়া বাবদ ৩৭৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এ অর্থও চীনের ঋণে বহন করা হবে। এর বাইরে প্রকল্প অফিস নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, গাড়ি চালকদের বেতন ও গাড়ি রাখার শেড নির্মাণ, বিনোদন বাবদ ব্যয়, গৃহকর্মীদের বেতন, কম্পিউটার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি ক্রয়, পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ বিল ইত্যাদি খাতে ব্যয় হবে ১৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এসব ব্যয়ও চীনের বায়ার্স ক্রেডিটের অন্তর্ভুক্ত। ফলে এ অর্থ সরকারকে সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।

প্রকল্পটির চুক্তিপত্রে দেখা গেছে, সিসিসিসির প্রস্তাবনায় ১২টি অংশে ব্যয় বিশ্লেষণ করা ছিল। এর বাইরে পরিশিষ্ট অংশে অতিরিক্ত পাঁচ কোটি ৯৮ লাখ ডলার বা ৪৯১ কোটি টাকা ব্যয় নতুন করে যুক্ত করেছে সেতু বিভাগ। এ ব্যয় পুরোটাই বায়ার্স ক্রেডিটের আওতায় বহন করা হবে। সবমিলিয়ে টানেল নির্মাণে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে চীন।

জানতে চাইলে প্রকল্পটির বর্তমান পরিচালক ইফতেখার কবির ও সাবেক প্রকল্প পরিচালক কবির আহমেদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।