প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

কর্ণফুলী দখল ও নাব্য হ্রাসে বেড়েছে জলাবদ্ধতা

 

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: কয়েক দশকের অব্যাহত দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, আবাসিক ও শিল্প বর্জ্য এবং নিয়মিত ড্রেজিং না হওয়ার কারণে বালি-পলি-বর্জ্য জমে কমছে খরস্রোতা কর্ণফুলী নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা। পাশাপাশি কমছে নদীর আয়তন ও গভীরতা। এ নদীর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নগরে প্রবাহিত ২২টি খাল রক্ষণাবেক্ষণ না করায় এক-দুই ঘণ্টার বৃষ্টি বা জোয়ারের পানি নিষ্কাশনের জন্য সময় লাগছে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা। এতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় কয়েক দশক ধরে নাকাল হচ্ছে নগরবাসী।

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি কাদামাটি ও নদীর ওপর তিনটি সেতুর (কালুরঘাট রেলওয়ে সেতু, শাহ আমানত সেতু ও কর্ণফুলী তৃতীয় সেতু) পিলারের কারণে কর্ণফুলীর পানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কর্ণফুলী তৃতীয় সেতুটি ঝুলন্ত বলা হলেও নদীর ওপর বড় বড় চারটি পিলার থাকায় পানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে; যা কর্ণফুলী ভরাট হওয়ার এটা অন্যতম কারণ। এতে পলি জমে নদী গভীরতা হারাচ্ছে। জেগে উঠছে নতুন নতুন চর। প্রতি বছর মে থেকে জুন মাসে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি কাদামাটি এসে নদী দূষণ করছে। অতিবর্ষণে যে পাহাড়ধস হয়, তাও নদীতে এসে জমে। ফলে গভীরতা কমে আর জোয়ারের পানি নগরে ঢোকে। দুই-তিন ঘণ্টার জোয়ারের যে পানি নগরীতে প্রবেশ করছে, তা বের হতে সময় লাগে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা।

অন্যদিকে ২৭টি ছোট-বড় খাল ও ছড়া দিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর পানি নিষ্কাশন করা হয়। এর বাইরে আছে এক হাজার ৬০৫ কিলোমিটার বিভিন্ন আকৃতির নালা। এসব বিদ্যমান খাল ও নালা-নর্দমা দিয়ে ঘণ্টায় ১০ কোটি ঘনমিটার পানি নিষ্কাশন সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। ফলে ভারি বৃষ্টিপাত হলে অর্থাৎ ঘণ্টায় ২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলে নগরীতে ১৪ কোটি ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয়। এ অতিরিক্ত পানি যথাসময়ে নিষ্কাশন অসম্ভব হচ্ছে না। কারণ সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো দীর্ঘদিনের অদক্ষতা ও উদাসীনতায় এসব খাল এবং নালার পানি ধারণ ও প্রবাহের ক্ষমতা কমেছে আশঙ্কাজনক হারে।

জেলা প্রশাসন সূত্রমতে, ১৯৮৫-৮৭ সাল থেকে বেপরোয়াভাবে দখল-দূষণ শিকার হচ্ছে চট্টগ্রামের প্রাণ কর্ণফুলী। ২০১০ সালের ১৮ জুলাই কর্ণফুলী নদীর গতিপথ স্বাভাবিক রাখতে নদী দখল, মাটি ভরাট ও নদীতে যে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। গত বছরের আগস্টে এক রিট মামলার পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট কর্ণফুলী নদীর দুই তীরের অবৈধ দখলমুক্ত করার রায় প্রদান করেন। এসব স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য আদালত ৯০ দিন সময়সীমা বেঁধে দেন। কিন্তু রায় ঘোষণার ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও অবৈধ দখলমুক্তের উদ্যোগ নেয়নি প্রশাসন।

এ নদী তীরের দুই হাজার ১৮৭টি অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেÑসরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি, কনটেইনার ডিপো, দিনমজুর থেকে শুরু করে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা। এ তালিকায় আরএস খতিয়ানমূলে বাকলিয়া থেকে পতেঙ্গা মৌজায় দুই হাজার ১১২ জন অবৈধ দখলদার চিহ্নিত করা হয়েছে। আর বিএস দাগে বাকলিয়া, মাদারবাড়ী, গোসাইডাঙ্গা, মনোহরী খাল, ফিরিঙ্গীবাজার মৌজায় বেশি দলখদার রয়েছে। অবৈধ দখলদাররা সেমিপাকা, আধাপাকা-পাকা ঘর, দালান, গোডাউন, কারখানা ও বস্তিঘর নির্মাণ করেছে।

অন্যদিকে চবক সূত্রমতে, ২০১১ সালে মালয়েশিয়ান মেরিটাইম অ্যান্ড ড্রেজিং করপোরেশনকে ২২৯ কোটি টাকায় কর্ণফুলী নদীর নাব্য বাড়াতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের কাজ দেয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। আর এ কাজ ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে পুরো কাজ শেষ না হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ বন্ধের নির্দেশ দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। অর্থাৎ গত চার বছরের ধরে কর্ণফুলীতে ড্রেজিং বন্ধ থাকায় পলি জমে অনেক চর জেগে ওঠে। বন্দরের এক নম্বর জেটি থেকে কর্ণফুলী সেতু পর্যন্ত এলাকায় পলি জমার হার তুলনামূলকভাবে বাড়ছে।

গত ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে বন্দরের এক জরিপে ড্রেজিংয়ের জন্য নির্ধারিত স্থানে ৩৩ দশমিক ৮৮ লাখ ঘনমিটার মাটি জমার প্রমাণ পাওয়া যায়। বর্তমানে পরিমাণ আরও অনেক বেড়েছে। নদীর সঙ্গে যুক্ত খাল দিয়ে বৃষ্টির সময় লাখ লাখ টন পলিথিন এসে জমা হয়। এসব পলিথিনের সঙ্গে ড্রেজার আটকে যেত।

গতকাল সোমবার দুপুরে ভাটার সময় চাক্তাই এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, চাক্তাই খালের যে অংশটি কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে মিশেছে সেই অংশটি পর্যন্ত কাদা, সেখানে পানির কোনো চিহ্ন নেই। খাল থেকে নালার মতো একটি ধারায় কিছু পানি বের হয়ে যাচ্ছে। পায়ে হেঁটে একেবারে নদীর মাঝ পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগও রয়েছে। আর কর্ণফুলী সেতুর তিনটি পিলার নদীর পানিতে রয়েছে। চাক্তাই অংশের একটি পিলার পার হয়ে মাঝ নদীর পিলার পর্যন্ত মাটির দেখা যাচ্ছে।

বোটচালক আলী আকবর বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে মাটি কাটা বন্ধ থাকায় পলি ভরাটের হার বেড়ে গেছে। এখন জোয়ার ছাড়া বোট বা জাহাজ কিছুই চলতে পারে না।’

সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ইদ্রিস আলী শেয়ার বিজকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহরের প্রায় ৫০ লাখ বাসিন্দা, হাটবাজার ও শিল্প-কারখানায় প্রতিদিন বর্জ্য বের হয় প্রায় তিন হাজার টন। এসব বর্জ্যরে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন অপসারণ করলেও অবশিষ্ট বর্জ্য বিভিন্ন খাল ও নালার মাধ্যমে কর্ণফুলী নদীতে এসে পড়ছে। ফলে কর্ণফুলী তার গভীরতা দিন দিন হারাচ্ছে। এছাড়া পাহাড় ন্যাড়া করে ঝুম চাষ, পাহাড় কাটা এবং পাহাড়ি ঢলের শাখা নদী ও খালগুলোর মাধ্যমে বালি-পলি আসার কারণে নদীটি নাব্য হারাচ্ছে। পাশাপাশি কর্ণফুলীতে বিভিন্ন কারণে পানির গতিপথ রোধ হয়েছে। পানির গতি কমে যাওয়ায় নদীতে পলি জমে গভীরতা কমছে। ফলে বৃষ্টি কিংবা জোয়ারের সময় পানি শহরের প্রবেশ করছে। আর গভীরতা বাড়তে হলে অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) প্রধান হাইড্রোগ্রাফার লে. কমান্ডার এম আরিফুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় সবগুলো জেটিতে সমস্যা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চার মিটার গভীরতা কমেছে। তবে দ্রুত আমরা ড্রেজিং শুরু করবো।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম খালেদ ইকবাল বলেন, ‘‘আইনি জটিলতায় এত দিন খননকাজ করা যায়নি। ড্রেজিংয়ের যে স্থগিতাদেশ ছিল তা উঠে গেছে। এখন ড্রেজিংয়ে আর কোনো বাধা নেই। সরকার আমাদের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। নৌবাহিনীর মাধ্যমে তাদের সুপারভিশনে (তত্ত্বাবধানে) বিদেশি কোম্পানি দিয়ে কাজটি করছি। সদরঘাট থেকে বাকলিয়া চর পর্যন্ত যে জায়গাটা ‘সিলেট্রশন’ হয়ে আছে তার পুরোটাই ‘ক্লিয়ার’ হয়ে যাবে। ২৫০ কোটি টাকার প্রজেক্ট। কাজ শুরুর পর চার বছরের মধ্যে শেষ করতে পারবো।’

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী শেয়ার বিজকে বলেন, ‘কর্ণফুলীর দখল-দূর্ষণ ও নাব্য সংকট নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও চিন্তিত। আমরা নিয়মিত বৈঠক ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিষয়টি সরকারকে জানাচ্ছি। আশা করি, দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাবে।’