প্রচ্ছদ শেষ পাতা

কর্মী বদলির নির্দেশনা মানছে না রাকাব

শেখ শাফায়াত হোসেন:রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) ঊর্ধ্বতন মুখ্য কর্মকর্তা মো. মাহমুদ হুসাইন সিরাজগঞ্জের সয়দাবাদ শাখা থেকে ঢাকার করপোরেট অফিসে বদলি হয়ে এসেছিলেন ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর। অর্থাৎ ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ওই কর্মকর্তা একটি শাখায় কাজ করছেন, যা ব্যাংকের বদলি নীতিমালার বিরোধী। ব্যাংকের বদলি নীতিমালা অনুযায়ী, এক শাখায় একজন কর্মকর্তা তিন বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করতে পারেন না।

কেবল মাহমুদ হুসাইন নয়, রাকাবের ঢাকা করপোরেট শাখায় ২৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ৮-১০ কর্মী রয়েছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে ওই শাখায় কর্মরত আছেন।

জানা গেছে, রাকাবের ঊর্ধ্বতন মুখ্য কর্মকর্তা জুলিয়া খাতুন ৯ বছর ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা করপোরেট শাখায় কাজ করছেন। ২০১০ সালের ১৫ এপ্রিল তিনি পাবনার ঈশ্বরদী শাখা থেকে বদলি হয়ে ঢাকা করপোরেট শাখায় আসেন।

রাকাবের মুখ্য কর্মকর্তা ওয়াসিমা ওহাব ঢাকা করপোরেট শাখায় কাজ করছেন ছয় বছর পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে। ২০১৩ সালের ২ মে ওই কর্মকর্তা সিরাজগঞ্জ শাখা থেকে ঢাকা করপোরেট শাখায় বদলি হয়ে আসেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এক শাখায় বেশিদিন কাজ করলে ব্যাংক কর্মকর্তাদের অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে বলেই ব্যাংকের এক শাখায় তিন বছরের বেশি কোনো কর্মকর্তাকে না রাখার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের (বিআরপিডি) ২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর জারিকৃত এক সার্কুলারে বলা হয়, ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকসহ শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তিন বছর পরপর বদলির ব্যবস্থা করতে হবে।

এক্ষেত্রে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক বা সমমর্যাদার কর্মকর্তা এবং বিশেষ কর্মোদ্দেশ্যে বা বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য হবে না বলেও বিআরপিডির ওই সার্কুলারে বলা হয়।

সার্কুলারটি সরকারি-বেসরকারি, বাণিজ্যিক-বিশেষায়িত সব ব্যাংককে মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু সার্কুলার জারির এক বছর হতে চলেছে, তিন বছরের বেশি সময় ধরে এক শাখায় থাকা কর্মীদের বদলি করেনি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংক রাকাব।

প্রাপ্ত তথ্যে আরও দেখা যায়, রাকাবে কর্মরত মুখ্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ব্যাংকটির ঢাকা করপোরেট শাখায় কাজ করছেন প্রায় আট বছর পাঁচ মাস ধরে। ২০১১ সালের ৩০ মে তিনি গোবিন্দগঞ্জ শাখা থেকে ওই শাখায় বদলি হয়ে আসেন। একইভাবে দেখা যায়, ব্যাংকটির মুখ্য কর্মকর্তা মো. শাহজাহান তাহের প্রায় চার বছর দুই মাস, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান পাঁচ বছর দুই মাস ধরে ওই ঢাকা করপোরেট শাখায় কর্মরত রয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে কর্মকর্তার পাশাপাশি কর্মচারীদের বদলির বিষয়েও একইভাবে তিন বছরের ওই নির্দেশনা পরিপালন করতে বলা হলেও রাকাবের ঢাকা করপোরেট অফিসে পিয়ন (অফিস সহায়ক) পদে মো. ওসমান গনি ২৫ বছর, গাড়িচালক পদে মো. শাহ আলম ১৭ বছর সাত মাস, প্রহরী পদে মো. বেলাল হোসেন ১১ বছর দুই মাস ও মো. মামুন ছয় বছর এক মাস ধরে কাজ করছেন।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অনিয়মের ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এক শাখায় দীর্ঘদিন কাজ করছেন এমন কর্মীদের একটি অংশ অনিয়মের সঙ্গে জড়াচ্ছেন। এর মধ্যে খোদ রাকাবের সিরাজগঞ্জের বেলকুচি শাখায় ডেটা এন্ট্রি হাফিজুর রহমান একজন। ওই কর্মী ব্যাংকটির ৯৭ লাখ টাকা তছরুপের অভিযোগে অভিযুক্ত। তিনি ওই শাখায় ছিলেন প্রায় আট বছর।

তবে গবেষকরা এক শাখায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করাকেই অনিয়মে জড়ানোর একমাত্র কারণ বলে মনে না করলেও এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা পরিপালনের পরামর্শ দিচ্ছেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক এবং পরিচালক (প্রশিক্ষণ) ড. শাহ মো. আহসান হাবীব শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এ বিষয়ে দেশে কোনো গবেষণা নেই। তবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর মানসিকতা রয়েছেÑএমন কর্মকর্তাদের একই শাখায় অনেক দিন ধরে কাজ করার সুযোগ দিলে তারা অনিয়মে জড়িয়ে পড়তে পারে। এক্ষেত্রে ঢালাওভাবে বলার সুযোগ নেই যে, ব্যাংকের একই শাখায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করলে তিনি অনিয়মে জড়িয়ে পড়বেনই। তবে যেহেতু বাংলাদেশ ব্যাংক বদলির বিষয়ে তিন বছরের একটি নির্দেশনা দিয়েছে, সেহেতু ব্যাংকগুলোকে ওই নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করা উচিত।’

রাকাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ ইদ্রিছ বলেন, ‘মাত্র এক মাস হয়েছে আমি ব্যাংকটিতে এসেছি। কর্মীদের কে কোন শাখায় কতদিন ধরে আছে সেটা জানার জন্য আমি ঢাকা করপোরেট অফিসসহ সব অফিসেরই জনবলের তালিকা সংগ্রহ করছি। যদি দেখি কেউ তিন বছরের বেশি এক শাখায় আছে, তবে তাকে বদলির ব্যবস্থা করা হবে।’

সর্বশেষ..