প্রচ্ছদ শেষ পাতা

কর দিয়ে পার পাচ্ছে আপন জুয়েলার্স!

রহমত রহমান: মানি লন্ডারিং আইনে পাঁচ মামলা চলমান। জব্দ রয়েছে সাড়ে ১৩ মণ স্বর্ণ ও ৪২৭ গ্রাম হীরা। মামলার তদন্ত করছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। আর অবৈধ সম্পদ অর্জন খতিয়ে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কিন্তু নামমাত্র আয়কর দিয়েই পার পেয়ে যাচ্ছে আলোচিত আপন জুয়েলার্স! অবৈধ স্বর্ণ ও হীরা বৈধ করতে গত ২৩ জুন স্বর্ণমেলার প্রথম দিন আপন জুয়েলার্সের পক্ষ থেকে ১৪ কোটি ১৪ লাখ ৪৪ হাজার ৪৬০ টাকা আয়কর পরিশোধ করা হয়। মামলা চলমান থাকার পরও কীভাবে অবৈধ স্বর্ণ ও হীরা বৈধ হবে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে আপন জুয়েলার্স কর্তৃপক্ষ বলছে, গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পর কর জমা দিয়েছে।
সূত্র জানায়, সরকার স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের অবৈধ স্বর্ণ ও হীরা বৈধ করতে করছাড় দেয়। পরে ৩০ জুন পর্যন্ত সুযোগ দিয়ে এনবিআর এসআরও জারি করে। ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে তিন দিনব্যাপী স্বর্ণমেলার আয়োজন করা হয়েছে। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া গত রোববার মেলার উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চেয়ারম্যানের হাতে আপন জুয়েলার্সের মালিক গুলজার আহমেদ কর প্রদানের চেক হস্তান্তর করেন। এ সময় দিলদার আহমেদ সেলিম এবং আজাদ আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। এ বিষয়ে গুলজার আহমেদ বলেন, আমাদের অনেক স্বর্ণ জব্দ অবস্থায় আছে। সেগুলোসহ আপন জুয়েলার্সের সব স্বর্ণের ওপর কর দেওয়া হয়েছে। এখন কিছু আইনি প্রক্রিয়া আছে। এটি শেষ হলে জব্দ হওয়া স্বর্ণ আমরা ফেরত পাব।
এনবিআরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে বলেন, আপন জুয়েলার্স সরকারের উচ্চ মহল থেকে ইঙ্গিত পাওয়ার পর বৈধ করতে কর জমা দিয়েছে। এনবিআর থেকে আশ্বাস পেয়েছে কি না, আমার জানা নেই। কী পরিমাণ স্বর্ণ ও হীরার জন্য কর জমা দিয়েছে আইনি বিধিনিষেধের কারণে বলব না। স্বর্ণমেলা শেষ হওয়ার পর দেখা যাবে। তবে শুল্ক গোয়েন্দার মান্ডি লন্ডারিং আইনে করা মামলা চলমান রয়েছে। এ বিষয়ে এনবিআর পরে সিদ্ধান্ত নেবে।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, স্বর্ণ জব্দ করার পর আপন জুয়েলার্স কর্তৃপক্ষ এ স্বর্ণের বৈধ কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। ফলে মামলা হয়েছে। মামলা চলমান। স্বর্ণ ও হীরা জব্দ রয়েছে। কর দিলে সে স্বর্ণ ও হীরা কীভাবে বৈধ হবে? এছাড়া জব্দ করা অবৈধ স্বর্ণ ও হীরা বৈধ করার সুযোগ দিলে ভবিষ্যতে অনেকেই এ সুযোগের অপব্যবহার করবে। তবে এ বিষয়ে এনবিআর সিদ্ধান্ত নেবে।
সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ২৮ মার্চ রাতে রাজধানীর বনানীর দ্য রেইনট্রি হোটেলে আপন জুয়েলার্সের মালিক অন্যতম স্বত্বাধিকারী দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী। ওই ঘটনার ভিডিওচিত্র ধারণ করে সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন। আরেক ধর্ষক হিসেবে নাঈম আশরাফের নাম প্রকাশিত হয়। অপর সহযোগী আবুল কালাম আজাদ হলো সাফাতের দেহরক্ষী। ধর্ষণের ঘটনায় ৬ মে দুই ছাত্রী পাঁচ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বনানী থানায় মামলা করেন। পরে শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা অভিযান চালায় আপন জুয়েলার্সের শোরুমে। অবৈধ উল্লেখ করে আটক করা হয় প্রায় সাড়ে ১৩ মণ স্বর্ণ ও ৪২৭ গ্রাম হীরা। পরে গ্রাহকরা কাগজপত্র দেখিয়ে দুই কেজি ৩৩০ গ্রাম স্বর্ণ অধিদফতর থেকে নিয়ে যান। বাকি স্বর্ণের কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেনি আপন জুয়েলার্স কর্তৃপক্ষ।
সূত্র আরও জানায়, আপন জুয়েলার্স কর্তৃপক্ষকে যথেষ্ট সময় দেয় শুল্ক গোয়েন্দা। কিন্তু যেসব কাগজপত্র চাওয়া হয়েছিল সেগুলো তারা দাখিল করতে ব্যর্থ হয়। এ কারণে স্বর্ণগুলো অবৈধ বলে ধরে নেয়। যেসব কাগজপত্র দাখিল করা হয়েছে, সেসব যাচাই করে দেখা গেছে সবই ভুয়া। আয়কর এবং ভ্যাট বিবরণ অনুযায়ী তাদের মজুদকৃত স্বণের্র পরিমাণ একেবারে কম। আপন জুয়েলার্সে যে পরিমাণ স্বর্ণ পাওয়া গেছে তার মাত্র দুই ভাগ আয়কর নথি এবং ভ্যাট স্টেটমেন্টে উল্লেখ করা আছে। পরে চোরাচালানের মাধ্যমে প্রায় ১৫ মণ স্বর্ণ ও হীরা আনা এবং এসব মূল্যবান সামগ্রী কর নথিতে গোপন রাখায় আপন জুয়েলার্সের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ১২ আগস্ট মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে পাঁচটি মামলা করা হয়। রাজধানীর গুলশান, ধানমন্ডি, রমনা ও উত্তরা থানায় এসব মামলা করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। এর মধ্যে গুলশান থানায় দায়ের করা হয়েছে দুটি মামলা। এনবিআরের নির্দেশে এসব মামলা করা হয়।
অপরদিকে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ, তার ভাই গুলজার আহমেদ ও আজাদ আহমেদকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। দুদক বিষয়টি তদন্ত করছে।

 

সর্বশেষ..