দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

কর ফাঁকি দিতে এক কোম্পানির পণ্য অন্যটিতে স্থানান্তর

বাটারফ্লাই ম্যানুফ্যাকচারিং

রহমত রহমান: দেশে বাটারফ্লাই গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বাটারফ্লাই ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড। অভিনব কৌশলে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে কর ফাঁকি দিয়ে আসছে বলে জানা গেছে। ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি পণ্য উৎপাদনের পর মার্কেটিং কোম্পানিকে ‘চুক্তি ছাড়াই কারখানা মূল্যে’ সরবরাহ করত। নিজেদের মধ্যে পণ্য আদান-প্রদানের কারণে ডিস্ট্রিবিউটর বা পরিবেশক পর্যায়ে উৎসে আয়কর আদায় করা হতো না। এ প্রক্রিয়ায় ফাঁকি দেয়া হয়েছে প্রায় শতকোটি টাকার রাজস্ব।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা যায়, ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৮-১৯ করবর্ষ পর্যন্ত ছয় বছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৯৭ কোটি ৭৮ লাখ ৫১ হাজার ৪২ টাকার উৎসে কর ফাঁকি দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে অভিনব কৌশলে এ ফাঁকি দিলেও তা কারও নজরে আসেনি। সম্প্রতি এনবিআরের তথ্যের ভিত্তিতে কর অঞ্চল-৮ বাটারফ্লাই ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের আয়কর নথি পুনরায় বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি ধরা পড়ে। পরে ফাঁকি দেয়া রাজস্ব পরিশোধ ও এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে প্রতিষ্ঠানকে নোটিস দেয়া হয়েছে।

এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, উল্লিখিত সময়ে করের সার্কেল অফিসে দায়িত্ব পালনকারী অ্যাসেসমেন্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে গেছেন কিনা, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

অন্যদিকে বাটারফ্লাই ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির বিরুদ্ধে ১৭৫ কোটি টাকা বিনিয়োগের তথ্য গোপন করেও কর ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই অভিযোগে প্রতিষ্ঠানকে নোটিস জারি করা হয়েছে। এছাড়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠান বাটারফ্লাই মার্কেটিং কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে। এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) প্রায় ৪৮ কোটি টাকা ভ্যাট (সুদ প্রায় ১৪ কোটি ৭২ লাখ) ফাঁকি উদঘাটন করে।

এ বিষয়ে গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ মান্নান আয়কর ফাঁকির বিষয়টি প্রথমে অস্বীকার করেন। পরে অফিস চলাকালে ফোন দিতে বলেন। কয়েকদিন ধরে অফিস সময়ে ফোন, খুদেবার্তা দেয়া হলেও তিনি জবাব দেননি। সর্বশেষ গতকাল ফোন দেয়া হলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমি জানি না। আমাকে দয়া করে আর বিরক্ত করবেন না।’ তবে গ্রুপের একজন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা উচ্চ আদালতে গিয়েছি। এখনও সমাধান হয়নি।

আয়কর অধ্যাদেশের ৫৩(ই) ধারা অনুযায়ী, ডিস্ট্রিবিউটর বা পরিবেশক বা অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে পণ্য বিক্রি করা হলে পণ্য বিক্রয়কালে নির্দিষ্ট হারে উৎপাদনকারী কোম্পানির উৎসে কর কাটা বাধ্যতামূলক। ওই উৎসে কর ২১ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়ার বিধান রয়েছে।

এনবিআর সূত্রে জানা যায়, অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৯ সালের ২৫ জুন কোম্পানির প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন করেন আয়কর কর্মকর্তারা। পরিদর্শনে কর্মকর্তারা দেখতে পান, প্রতিষ্ঠানটি কখনোই উৎসে কর কর্তন করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়নি। এর কারণ হিসেবে বলা হয়, উৎপাদনকারী কোম্পানি বিপণনকারী কোম্পানির কাছে কারখানা মূল্যে পণ্য বিক্রি করে, এক্ষেত্রে উভয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চুক্তি হয় না। অথচ ১৯৩০ সালের পণ্য বিক্রয় আইন অনুযায়ী, এক প্রতিষ্ঠান তার অন্য প্রতিষ্ঠানে পণ্য স্থানান্তর মানে পণ্যের মালিকানা সম্পূর্ণরূপে স্থানান্তরিত হওয়া। আর ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান দুটিও আলাদা সত্ত্বা।

এ পরিপ্রেক্ষিতে কর কর্মকর্তারা ২০১২-১৩ থেকে ২০১৭-১৮ করবর্ষ পর্যন্ত আয়কর রিটার্নের সঙ্গে জমা দেয়া অডিট রিপোর্ট নিরীক্ষা করেন। এতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ৬ বছরে ৫৯ কোটি ৩৮ লাখ ৬১ হাজার ৪৩৫ টাকা উৎসে কর জমা দেয়নি। আর নির্ধারিত সময় উৎসে কর জমা না দেয়ায় ২ শতাংশ সরল সুদ যুক্ত হয়েছে, ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত যার পরিমাণ ৩৮ কোটি ৩৯ লাখ ৬০৭ টাকা। ফলে সর্বমোট ফাঁকি দেয়া করের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৭ কোটি ৭৮ লাখ ৫১ হাজার ৪২ টাকা। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যা, বক্তব্য ও প্রমাণাদি চেয়ে ২০২০ সালের ১২ অক্টোবর ঢাকার কর অঞ্চল-৮ থেকে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর নোটিস দেয়া হয়। ২১ অক্টোবরের মধ্যে নোটিসের জবাব দিতে বলা হয়।

সূত্রমতে, বাটারফ্লাই গ্রুপ শুরুতে ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী আমদানি করত। এলজি ও হাইসেন্স ব্র্যান্ডের সামগ্রী বিদেশ থেকে আমদানির পর নিজস্ব চ্যানেলে তা বিক্রি করত। পরে ইকোপ্লাস নামে স্থানীয় ব্র্যান্ড চালু করে।

এনবিআর সূত্রে জানা যায়, বাটারফ্লাই ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির কারখানা ময়মনসিংহের ভালুকায়। এখানে এসি, ফ্রিজ, টিভি, ওয়াশিং মেশিন, ওভেন, ফ্যান, ইলেকট্রিক আয়রন ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স বানানো হয়। এ কারখানা স্থাপনে বিনিয়োগের প্রকৃত তথ্য গোপন করে আবার কর ফাঁকি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কারখানা নির্মাণে ২০১৩-১৪ করবর্ষে মোট ১৭৫ কোটি ৭১ লাখ বিনিয়োগ করা হয়। কাঁচামাল ক্রয়, প্লান্ট ও মেশিনারিতে বিনিয়োগের বিপরীতে ২ কোটি ১৬ লাখ টাকা উৎসে কর হিসেবে পরিশোধ করার কথা থাকলেও রিটার্নে ৮০ লাখ ৩৭ হাজার টাকা প্রদর্শন করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিনিয়োগের প্রকৃত চিত্র গোপনের জন্য ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর একই করাঞ্চল থেকে ব্যাখ্যা, বক্তব্য ও প্রমাণাদি চেয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দেয়া হয়।

অন্যদিকে বাটারফ্লাই গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বাটারফ্লাই মার্কেটিং লিমিটেডের ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটন করে সিআইসি। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ৬২ কোটি ৯০ লাখ ৬১ হাজার ২৪৫ টাকার (ভ্যাট ৪৮ কোটি ১৭ লাখ ৮৭ হাজার ৭০৬ টাকা ও সুদ ১৪ কোটি ৭২ লাখ ৭৩ হাজার ৫৩৯ টাকা) ভ্যাট ফাঁকির মামলা করে সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)। পরে ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেট দাবিনামা জারি করে। বাটারফ্লাই মার্কেটিং লিমিটেড ২০০৮-০৯ থেকে ২০১১-১২ পর্যন্ত বিভিন্ন সেবার বিপরীতে প্রকৃত বিক্রয় তথ্য গোপনের মাধ্যমে এ ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে বলে অভিযোগ সূত্রে জানা যায়। ২০১৭ সালে দাবিনামা চূড়ান্ত করা হয়। পরে প্রতিষ্ঠান ফাঁকি দেয়া ভ্যাট পরিশোধ না করে ট্রাইব্যুনালে আপিল করে। ট্রাইব্যুনাল এনবিআরের পক্ষে রায় দেয়ার পর প্রতিষ্ঠান ভ্যাটের টাকা পরিশোধ করে বাটারফ্লাই। কিন্তু সুদের টাকা পরিশোধ করেনি। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানকে দাবিনামা জারি করা হয়। তবে দায় স্বীকার করে প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে টাকা জমা দিয়েও পরবর্তী সময়ে তা ফেরত নিতে কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেনদরবার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এজন্য একজন ভ্যাট পরামর্শকের সঙ্গে ৩ কোটি টাকার চুক্তি করে বলে লিখিত অভিযোগ রয়েছে।

বাটারফ্লাই গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাজারে এলজি ব্র্যান্ডের পণ্য আমদানি করে বাজারজাত করছে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দিয়ে এসব পণ্য খালাস হয়। তবে এসব পণ্য মিথ্যা ঘোষণায় খালাস করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের একজন ডেপুটি কমিশনারকে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এ অনিয়ম তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সূত্রমতে, চট্টগ্রাম কাস্টমস অন্যান্য ব্র্যান্ডের পণ্যের ক্ষেত্রে ৩০ ডলার করে মূল্য পুনর্নির্ধারণ করলেও বাটারফ্লাইয়ের পণ্যের দাম নির্ধারণ করে ১৮ ডলার করে। সুইং হেড মেশিন রিনউন ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে ৩০ ডলার নির্ধারণ করা হলেও বাটারফ্লাইয়ের ক্ষেত্রে তা ১৮ ডলার ও ২০ ডলারে শুল্কায়ন করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে সরকারের, অন্যদিকে অন্য ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..