প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

কাঁচামাল ঘোষণায় আসে অন্য পণ্য অনিয়মে জড়িত ৯২ প্রতিষ্ঠান

চট্টগ্রাম কাস্টমসের প্রতিবেদন

রহমত রহমান: রফতানিকে উৎসাহ দিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বন্ড সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু সেই সুযোগের অপব্যবহার থেমে নেই। বন্ড সুবিধার কাঁচামাল আমদানি করে সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ হরহামেশাই শোনা যাচ্ছে। কিন্তু নতুন করে যোগ হলো প্রাপ্যতা বা ঘোষণাবহির্ভূত এবং ঘোষণার অতিরিক্ত কাঁচামাল আমদানি। এছাড়া বন্ডের কাঁচামাল ঘোষণায় আমদানি হয়েছে অন্য পণ্য।
এক বছরে ৯২টি প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানিতে এমন অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ। কাস্টমস আইন ও বন্ড লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন করায় এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১৫ কোটি টাকার শুল্ককর ও প্রায় দুই কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুই বন্ড কমিশনারেটকেও সুপারিশ করেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, বন্ডের বেশিরভাগ কাঁচামাল চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ দিয়ে খালাস হয়। শতভাগ রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠান হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দ্রুত কাঁচামাল খালাসে কাস্টমসকে তাগাদা দেওয়া হয়। কাস্টমসও চেষ্টা করে এসব কাঁচামাল দ্রুত খালাস করে দিতে। কিন্তু বিপত্তি বাধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে। তাগাদা দেওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বন্ড সুবিধার অনিয়ম পাওয়া গেছে। কাস্টম হাউজ গত বছরের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত এমন ৯২টি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে। অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে গত ৩১ জুলাই চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম এনবিআর চেয়ারম্যানকে প্রতিবেদন দিয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্ড লাইসেন্সধারী বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আমদানি করা পণ্য চালানে প্রায়ই বন্ড লাইসেন্সে প্রাপ্যতা ও ঘোষণাবহির্ভূত বা ঘোষিত পরিমাণের অতিরিক্ত পণ্য পাওয়া গেছে। মিথ্যা ঘোষণার এসব পণ্য আটক ও খালাস স্থগিত করা হয়। আমদানিকারকরা স্বীকারও করেন। পরে ন্যায় নির্ণয়ের মাধ্যমে জরিমানা ও শুল্ককর পরিশোধ করার ভিত্তিতে খালাস দেওয়া হয়। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত এমন ৯২টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা ও অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হলো। অনিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারকে প্রতিবেদনের কপি পাঠানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গাজীপুরের কাশিমপুর পূর্ববাগবাড়ী এলাকার এএমএইচ অ্যাপারেল লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ পলিস্টার কাপড় ঘোষণা দিয়ে আমদানি করেছে জর্জেট কাপড় (পাতলা রেশমি কাপড়)। প্রতিষ্ঠানটি ২৮ হাজার ৫০০ কেজি ও ২৬ হাজার ৫২৪ কেজি শতভাগ পলিস্টার কাপড় ঘোষণা দিয়ে চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি পৃথকভাবে বি অব এন্ট্রি দাখিল করে। কিন্তু কায়িক পরীক্ষায় পলিস্টার কাপড় নয়, পাওয়া যায় ঘোষণাবহির্ভূত জর্জেট কাপড় (পাতলা রেশমি কাপড়)। বন্ড সুবিধার পণ্য না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে শুল্কায়ন করা হয়। প্রথম চালানের পণ্যের মূল্য প্রায় ৮৫ লাখ টাকা ও শুল্ককর প্রায় ৭০ লাখ টাকা। দ্বিতীয় চালানের পণ্যমূল্য সাড়ে ৭৯ লাখ টাকা ও শুল্ককর ৬৫ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি অপরাধ স্বীকার করায় ন্যায় নির্ণয়ের আবেদন করা হয়। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানকে প্রথম চালানে ১৫ লাখ ও দ্বিতীয় চালানে ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। শুল্ককর ও জরিমানা পরিশোধ করলে পণ্য খালাস দেওয়া হয়।
আনোয়ার গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হোসেন ডায়িং অ্যান্ড প্রিন্টিং মিলস লিমিটেড। সোডা অ্যাশ ঘোষণা দিয়ে চলতি বছরের ১১ মার্চ বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়। বন্ড লাইসেন্সে প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি ৮৪ হাজার কেজি সোডা অ্যাশ আমদানি করে। অপরাধ স্বীকার করায় ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একইভাবে গাজীপুরের এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড কাস্ট লেদার ঘোষণা দিয়ে চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে। কায়িক পরীক্ষায় ফিনিশিং ফ্রেশ স্পিøন্ট লেদার পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠান দোষ স্বীকার করায় ছয় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
এদিকে ঢাকার পাকিজা নিট কম্পোজিট লিমিটেড প্রাপ্যতার অতিরিক্ত আমদানি করেছে। পাঁচ লাখ ১৩ হাজার কেজি ডাই সোডিয়াম সালফেট অ্যানহাইড্রেড ঘোষণা দিয়ে চলতি বছরের ২৭ মে বি অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের দাখিল করা কাগজপত্র অনুযায়ী প্রাপ্যতার অনেক বেশি কেমিক্যাল প্রতিষ্ঠানটি আমদানি করেছে। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে সাড়ে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মতো গত এক বছরে ৯২টি প্রতিষ্ঠান ঘোষণাবহির্ভূত, ঘোষণা ও প্রাপ্যতার অতিরিক্ত এবং প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কাঁচামাল আমদানি করে রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। ৯২টি প্রতিষ্ঠানের ১৫ কোটি ছয় লাখ টাকার শুল্ককর উদ্ঘাটন ও দুই কোটি ১১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
অনিয়মের সঙ্গে জড়িত অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো গাজীপুরের এআরএইচ নিট কম্পোজিট, ক্রসলাইন নিট ফেব্রিক্স, জায়ান্ট গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ, জিএমএস কম্পোজিট নিটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি, ড্রাইড কম্পোজিট টেক্স, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি, বেনাল পলি অ্যান্ড পেপার স্যাক, নিট বাজার, সেলফ ইনোভেটিভ, স্প্যারো অ্যাপারেল, ইন্টারন্যাশনাল ট্রিমাইনস অ্যান্ড লেভেল বিডি, ডিভাইন ফেব্রিক্স, ইকোটেক্স, জাবের অ্যান্ড জোবায়ের ফেব্রিক্স, হ্যান্ডিক্রাফট বিউটি অ্যান্ড ফ্যাশনস, আলিমা টেক্সটাইল, বিএইচটি ইন্ডাস্ট্রিজ, বিজি কালেকশন, তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল, রয়াল ফুটওয়্যার, মাহমুদ ওয়াশিং প্লান্ট, নাইস কটন, মেগা ওয়াশিং অ্যান্ড ডায়িং, তালহা ফেব্রিক্স, এনএজেড বাংলাদেশ, মম ট্রিমস, সেলিম ট্রেডিং কোম্পানি, সাভারের ডিজাইনার ফ্যাশন, ডিইপিজেডের প্যাডডকস জেনস, ফ্যাক্সার বিডি, রিং সাইন টেক্সটাইল, নারায়ণগঞ্জের এইচএসকে বিডি, ইউনিকম টেক্সটাইল মিলস, মাহিন ডিজাইয়ান, চট্টগ্রামের গার্মেন্টস হোম, সুফী অ্যাপারেল, ঢাকার বড় মগবাজারের গ্রীন ওয়ার্ল্ড ফ্যাশনস, ঢাকার আনলিমা টেক্সটাইল, এ টেক্স ইন্টারন্যাশনাল, বেঙ্গল লেদার কমপ্লেক্স, লন্ড্রি ইন্ডাস্ট্রিজ, এপেক্স ইয়ার্ন ডায়িং, মীম এক্সেসরিজ, ভুলুনা ট্যানারি, সেলিনা এক্সেসরিজ, ম্যাগপাই কম্পোজিট টেক্সটাইল, বি বাড়ীয়ার সার্ক গার্মেন্টস এক্সেসরিজ, রাইডার লেদার ব্যাগস অ্যান্ড লাগেজ ফ্যাক্ট, ময়মনসিংহের সুপ্তি সোয়েটার, অ্যাপারেলস ওয়েট প্রোসিং, এইচডব্লিউএ ওয়েল টেক্সটাইল, ওরিয়ন নিট টেক্সটাইলস, নরসিংদীর সাম রেক ডায়িং, ময়মনসিংহ এগ্রো, মুন্সীগঞ্জের ওয়েলপ্যাক পলিমার, নারায়ণগঞ্জের এন জেড ফেব্রিক্স, প্লাম্মি ফ্যাশনস, ইউনাইটেড কালারস, নায়াগ্রা এক্সেসরিজ, নেটকো গ্লোবাল প্যাকেজিং, হুন শিন টেক্সটাইল, টাঙ্গাইলের ইউনিগ্লোরি বটন, চট্টগ্রামের ইউনেসকো টি অ্যান্ড এ, কুমিল্লার সুন হো। তবে এক প্রতিষ্ঠানের একাধিক চালানে অনিয়ম পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ট্যাগ »

সর্বশেষ..