মত-বিশ্লেষণ

কাজের মাধ্যমে বেঁচে থাকবেন অনুপ্রেরণাদায়ী উদ্যোক্তা ফিরোজ আলম

আবুল কাসেম হায়দার: স্নেহভাজন ছোটভাই, আমাদের প্রেরণার উৎস ও ইয়ুথ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরোজ আলম ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর দিল্লির এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। মানুষ মরণশীল। সবাইকে অনন্তের ডাকে সাড়া দিতে হবে। তবুও কারও মৃত্যু হƒদয়কে বিদীর্ণ করে। দীর্ঘ ৩৫ বছরের ব্যবসায়িক সহযাত্রী ফিরোজ আলম আমাদের জন্য তেমনই একজন।

মৃত্যুর পর কারও অবদান নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা করলে পরকালে পরম করুণাময় তাকে ভালো রাখেন এ বিশ্বাস থেকে ফিরোজ আলমকে নিয়ে কিছু স্মৃতিচারণা করছি।

১৯৮৪ সালে এক সন্ধ্যায় ফিরোজ আলম আমার কল্যাণপুরের দুই রুমের বাসায় ক্যাপমাথায় হঠাৎ গিয়ে হাজির। অনেক বছর পর দেখা। আমি পূর্ব সন্দ্বীপ হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, ফিরোজ ও মঞ্জু সপ্তম শ্রেণির। ১৯৬৯ সালে আমি দক্ষিণ সন্দ্বীপ হাই স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় পাস করি। দীর্ঘদিন দেখা হয়নি। পূর্ব সন্দ্বীপ হাই স্কুলে তখন বিজ্ঞান বিভাগ ছিল না। বিজ্ঞানে পড়ার জন্য আমি তখন দক্ষিণ সন্দ্বীপ হাই স্কুলে ভর্তি হলাম।

সে যাহোক, আমার বাসায় কিছুক্ষণ অবস্থানের পর ফিরোজ কোনো ভূমিকা ছাড়াই বললেন, ‘আপনার দুটি ছবি দিন। গার্মেন্ট করব। আপনি সঙ্গে থাকবেন।’ আমি বললাম, ‘আমার তো গার্মেন্ট করার মতো এত টাকা নেই।’ তিনি বললেন, ‘টাকা লাগবে না। শুধু ছবি দিন।’ আমি আর কথা না বলে দুই কপি ছবি তাকে দিলাম।

কয়েক দিন পর ফিরোজের দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী ২৯নং এয়ারপোর্ট রোডে গেলাম। সেখানে গার্মেন্ট করার জন্য বাড়ি ভাড়া নিয়ে অবকাঠামো তৈরির কাজ চলছে। ছোট্ট একটি রুমে ফিরোজ বসা। আলাপ হলো। ওপরে গিয়ে দেখলাম ভবনের দেয়াল ভেঙে ফ্লোর তৈরির কাজ চলেছে। ফিরোজ বললেন, ‘প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি করতে দিয়েছি।’ আমরা চারজনÑফিরোজ আলম, রেজ্জাকুল হায়দার মঞ্জু, মোস্তানছের বিল্লাহ আর আমি। প্রজেক্ট প্রোফাইল যিনি তৈরি করে দিলেন, তিনি ফিরোজকে বললেন, ‘হায়দার ভাই থাকায় আমি কোনো সম্মানী নেব না।’ আমাকে এমন সম্মান দেখানোয় আমার প্রতি ফিরোজের আরও বেশি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস জš§াল।

যথারীতি প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি করে আমরা ঋণের জন্য ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের লোকাল অফিসে জমা দিলাম। আমি ও ফিরোজ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচয় করে ব্যবসার প্রথম কাজ শুরু করলাম। আমাদের প্রজেক্ট কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করল। ব্যাংকঋণ পেয়ে এলসি করার উদ্যোগ নিলাম। চারজন অতি কষ্টে মাত্র পাঁচ লাখ টাকা মূলধন জোগাড় করে ইয়ুথ গার্মেন্টস লিমিটেড গঠন করে ১৯৮৪ সালে ব্যবসা শুরু করলাম। আমি কোম্পানির চেয়ারম্যান, ফিরোজ ম্যানেজিং ডাইরেক্টর এবং মোস্তানছের বিল্লাহ ও রেজ্জাকুল হায়দার মঞ্জু ডাইরেক্টর।

ফিরোজের জš§ ১৯৫৬ সালের ৩০ এপ্রিল চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায়। তিনি পূর্ব সন্দ্বীপ হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। চট্টগ্রামে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেশ কিছু দিন ফিরোজ ও মঞ্জু চাকরি করেন। পরবর্তী সময়ে দুজনেই অধিক অর্থ উপার্জনের লক্ষ্যে জার্মানিতে পাড়ি জমান। কয়েক বছর জার্মানিতে সপরিবারে থেকে দেশে ফিরে চট্টগ্রামে ব্যবসা করেন। দেওয়ানহাটে টায়ার-টিউবের ব্যবসা দিয়ে ফিরোজের ব্যবসার যাত্রা। ওই ব্যবসায় ফিরোজের মন ভরেনি। রপ্তানিমুখী ব্যবসা মাথায় নিয়ে ফিরোজ ঢাকায় চলে আসেন। এর পরের কাহিনি আগেই বলা হয়েছে। কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও আত্মবিশ্বাস ফিরোজকে অনেক এগিয়ে নেয়।

প্রচারবিমুখ ফিরোজ আলম কাজপাগল। কাজ ছাড়া এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট করতেন না। জীবনকে সুন্দর ও উপভোগ করার আকাক্সক্ষা বা ভোগবাদ তাকে কখনও আকৃষ্ট করতে পারেনি; সরল জীবনযাপন ছিল মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত।

ব্যবসার শুরু থেকে একই কক্ষে দুজন দু’টেবিলে বসতাম। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত একই কক্ষে বসে সব ব্যবসার শলাপরামর্শ করে এগিয়ে গিয়েছি। ইয়ুথ টাওয়ারে আসার পর নিজস্ব ভবনে বসার জন্য সবার আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা হয়। তাও সবাই একই ফ্লোরে। দিনশেষে এক রুমে একত্র হয়ে নানা গল্প ও সামাজিক আলাপে সময় কাটাতাম।

১৯৯০ সাল থেকে আমাদের পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ইয়ুথ গার্মেন্টসের দেওয়ান মডার্ন গার্মেন্টস, চৌধুরী অ্যাপারেল স্থাপন করি। ফতুল্লায় দেওয়ান মডার্ন গার্মেন্টসের পাশে প্যানোরমা প্রিন্টার্স নামে একটি প্যাকেজিং কারখানা স্থাপন করি। এরপর পাশেই ইউনিকম টেক্সটাইল স্থাপন করা হয়। সব প্রকল্প ফিরোজ আলমের চিন্তা, চেষ্টা ও পরিকল্পনায় এগিয়ে চলে। ২০০২ সালে টাঙ্গাইলে মির্জাপুর উপজেলার গড়াইয়ে সুতা তৈরির কারখানা ইয়ুথ স্পিনিং মিল স্থাপন করি। এর আগে মির্জাপুরে শুরু করি তোয়ালে কারখানা সাউথ ইস্ট টেক্সটাইল মিল। তোয়ালে রপ্তানি করি। পরে এ কারখানা পিনাকি গার্মেন্টসের মনির সাহেবের কাছে হস্তান্তর করি।

ফিরোজ আলম সব সময় নতুন প্রজেক্ট করার চিন্তা করতেন। তৈরি পোশাক ও বস্ত্র থেকে তার দৃষ্টি যায় কোমল পানীয় উৎপাদনে। লন্ডনের বিখ্যাত কোম্পানি ভার্জিনের অনুমোদন নিয়ে দেশে আমরা ভার্জিন কোল্ড ড্রিংক প্রথমে পিইটি ও ক্যানে বাজারজাত করি। প্রথম দুই বছর আমরা এই কোম্পানি থেকে যথেষ্ট মুনাফা করি। তিন-চার বছর পর মুনাফা কমে যায়। প্রায় ১৬ কোটি টাকা লোকসান দিয়ে এটি বিক্রি করে ফেলি। 

এরপর ফিরোজ আলম নিট কম্পোজিট ফ্যাক্টরি স্থাপনে মনোযোগী হলেন। আবু খায়ের মো. সাখাওয়াতের রবিন টেক্স (বিডি) লিমিটেডের সঙ্গে আমরা ৫০ শতাংশ শেয়ারের একটি কম্পোজিট কারখানা স্থাপন করি। ফিরোজের একক চেষ্টায় রপ্তানি শুরু। সাখাওয়াতের সঙ্গে একত্রে চলতে না পেরে ওই ফ্যাক্টরি ছেড়ে দিই। দ্রুত ফিরোজ আলম টাঙ্গাইল কমফিট কম্পোজিট নিট কারখানা স্থাপন করেন। খুব কম সময়ের মধ্যে এ কারখানাকে উৎপাদন করে রপ্তানিতে নিয়ে যাওয়া তারই কৃতিত্ব।

ব্যবসার উন্নতির পাশাপশি আমরা সমাজকল্যাণমূলক কাজেও হাত দিই। দেড় কোটি টাকা অনুদান দিয়ে বারডেমে ইয়ুথ ফাউন্ডেশন কিডনি ও লিভার ট্রান্সপ্লান্ট স্থাপনে সহযোগিতা করি। ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টসহ বেশ কয়েকটি জাতীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান ফিরোজ আলমের একান্ত বুদ্ধি ও পরামর্শে আমরা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হই।

২০০৪ সাল থেকে আমাদের পরবর্তী প্রজš§ ব্যবসায় এগিয়ে আসতে থাকে। কোম্পানির কলেবরও বেশ বৃদ্ধি পায়। তাই নিজেদের আস্থা ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ফিরোজ আলমের প্রস্তাবে কোম্পানির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসে। ফিরোজ আলম, রেজ্জাকুল হায়দার মঞ্জু ও আনিস সালাউদ্দিন আহমেদ ইয়ুথ গার্মেন্টস, কম্পোজিট নিট তথা গার্মেন্টস সেক্টরের দায়িত্ব নেন। আমি, মোস্তানছের বিল্লাহ, আফজালুর রহমান ও হেলাল উদ্দিন ইয়ুথ স্পিনিং মিলসের মালিকানা নিই। নূর উদ্দিন দেওয়ান, গিয়াসউদ্দিন দেওয়ান ও আশরাফ উদ্দিন দেওয়ান ইউনিকম টেক্সটাইলের মালিকানা নেন। ভাগাভাগির সময় ফিরোজ আলম শাহজীবাজার পাওয়ার কোম্পানি লি. নেওয়ার শর্ত দেনÑএ প্রস্তাব আমরা মেনে নিইনি। কথা ছিল নতুন কোনো পরিচালক নিলে আমাদের নেওয়ার চেষ্টা করা হবে, কিন্তু পরে তা আর হয়নি। নতুন দুই পরিচালক নিয়ে ফিরোজ আলম পাওয়ার কোম্পানির উৎপাদনে যান। আমরা পরবর্তী সময়ে তার এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কোনো কথা বলিনি।

যাহোক, অতীতকে ভুলে গিয়ে সুন্দর, স্বচ্ছ ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য চিন্তা নিয়ে একের পর এক ফিরোজ আলমের একান্ত চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি, শাহজীবাজার পাওয়ার কোম্পানি, মিডল্যান্ড পাওয়ার, জেনিথ লাইফ ইন্স্যুরেন্স, পেট্রোম্যাক্স এলপিজি-সহ বৃহৎ আকারের শিল্পপ্রতিষ্ঠান।

জীবনের শেষপ্রান্তে এসে সন্দ্বীপে সমাজকল্যাণের কাজে মনোযোগ দেন ফিরোজ। স্থাপন করেন স্বর্ণদ্বীপ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে মা ও শিশুদের জন্য হাসপাতাল। বর্তমানে রেজ্জাকুল হায়দার মঞ্জুর চেষ্টায় এটি সুচারুভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

আমাদের কেন্দ্রীয় অফিস ইয়ুথ টাওয়ার চৌধুরী অ্যাপারেল লি.। আমরা চারজন মালিক। আমাদের অহংকার ফিরোজ আলম। তার অক্লান্ত চেষ্টা, পরিশ্রম ও মেধায় আজ আমাদের এই অর্জন। আল্লাহপাক তাকে বেহেশতের সুউচ্চ স্থান দান করুনÑএ কামনা করি।

দেশের অর্থনীতিতে তার যে অবদান, তা চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার সরাসরি পরিচালিত শিল্পকারখানায় হাজার হাজার নারী-পুরুষ নিয়োজিত আছে।

দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস ও লিভারের রোগে ফিরোজ অসুস্থ থাকলেও সব সময় বলতেন, ‘আমি ভালো আছি।’ নিকটতম সহকর্মী ও বন্ধুবান্ধব কাউকেই শরীরের খারাপ অবস্থার কথা বলেননি। অবস্থা খুবই খারাপ হওয়ার পর ২০১৯ সালের জুনে বাল্যবন্ধু রেজ্জাকুল হায়দার মঞ্জুর কাছে অসুখের কথা বলেন। মঞ্জু ব্যবস্থা গ্রহণে দ্রুত এগিয়ে আসেন। লন্ডন ও সিঙ্গাপুরে বিভিন্ন সময়ে ফিরোজ চিকিৎসা নেন। ফিরোজ ছিলেন অসম্ভব ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, আত্মবিশ্বাসী, উদ্যোমী ও সাহসী পুরুষ। জীবনযুদ্ধের শেষ সময়ে এসেও সাহস তাকে এগিয়ে নেয়। আবারও সুস্থ হয়ে কর্মজীবনে ফিরে আসার আত্মবিশ্বাস ফিরোজকে অনেক বেশি বলিষ্ঠ, সক্রিয় ও সুস্থ রাখে। আমাদেরও বিশ্বাস ছিল ফিরোজ আবারও সুস্থ হয়ে ফিরে এসে দেশ ও মানুষের কল্যাণে অনেক বেশি কাজ করার সুযোগ পাবেন; কিন্তু আল্লাহর বিধান, যা হওয়ার তা-ই হলো। জীবনকে মানুষের জন্য সব সময় বিলিয়ে দেওয়া মানুষটি আজ আমাদের মধ্যে নেই কোনোক্রমেই তা যেন বিশ্বাস করতে পারছি না। ফিরোজ দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন তার সৃষ্টিশীল কর্মের জন্য।

ফিরোজের পূর্বপুরুষেরা জমিদার ছিলেন। সেই আভিজাত্যের রক্ত ফিরোজের মধ্যে ছিল। উঁচু মন, সুন্দর জীবন, বড় চিন্তা ও নতুন কিছু করার মধ্যে ফিরোজের আনন্দ ছিল। তাই দেখা গেছে, শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, নিজের বাড়িঘর তৈরিÑসব ক্ষেত্রে তার সৌন্দর্যবোধ ও আভিজাত্য ফুটে উঠেছে।

ফিরোজ আলমের অকাল মৃত্যুতে ইয়ুথ পরিবারে বড় শূন্যতা সৃষ্টি হলো। এটি কোনোদিনই পূরণ করা সম্ভব নয়। সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে। আল্লাহ তায়ালা পরকালে ফিরোজ আলমকে ভালো রাখুন। 

সাবেক সহসভাপতি, এফবিসিসিআই, বিটিএমইএ, বিজিএমইএ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইয়ুথ গ্রুপ

ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..