সারা বাংলা

কারখানার বর্জ্যে ফসল ও জনস্বাস্থ্য হুমকিতে

ইমতিয়াজ উল ইসলাম, সাভার: সাভারের আশুলিয়ায় একটি গার্মেন্ট কারখানার কেমিক্যালমিশ্রিত বর্জ্যরে পানি সরাসরি আবাদি জমিতে ফেলায় বোরো মৌসুমে ব্যাপক লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন কয়েকশ কৃষক। আইন অমান্য করে বছরের পর বছর কেমিক্যালমিশ্রিত পানি ফসলি জমিতে প্রবেশ করায় মাটির উর্বরতা হারিয়ে যাচ্ছে। মারাত্মক দূষণের কবলে খালের মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে। সার্বিক প্রভাবে হুমকিতে পড়ছে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ। স্থানীয় কৃষক ও এলাকাবাসী বারবার প্রতিকার চাইলেও উপজেলা কৃষি বিভাগসহ স্থানীয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় টনক নড়েনি কারখানা কর্তৃপক্ষের।

আশুলিয়ার শিমুলিয়া ইউনিয়নের গোহাইলবাড়ী মেশিনপাড় এলাকায় জিটিএ স্পোর্টস লিমিটেড নামে একটি ডায়িং কারখানার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষক ও এলাকাবাসী।

স্থানীয় কৃষক মোনতাজ মণ্ডল অভিযোগ করে বলেন, এ বছর বোরো মৌসুমে দেড় বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন তিনি। কিন্তু ওই কারখানার ডায়িংয়ের ময়লাযুক্ত পানি সরাসরি ক্ষেতে প্রবেশ করায় তাদের ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জমির উপরিভাগের অধিকাংশ কাদার সঙ্গে কেমিক্যাল বর্জ্য মিশে মাটির উর্বরতা হারিয়ে যাচ্ছে। শুরুতে ধানের গোছা মোটা ও সবুজ দেখালেও বৈশাখ-জৈষ্ঠ মাসে সামান্য বৃষ্টিতেই ধান ঝরে যায়। পাশাপাশি ক্ষেতে প্রচুর পরিমাণে পোকামাকড়ের আক্রমণে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তারা। উপজেলা কৃষি অফিস ও বাজার থেকে কেনা কীটনাশনক প্রয়োগ করেও কোনো ফল মিলছে না। এছাড়া দুর্গন্ধযুক্ত কাদামাটির আধিক্যের কারণে গবাদিপশু দিয়ে ক্ষেতে হালচাষসহ স্বাভাবিক কাজ করা তাদের জন্য দুরূহ হয়ে পড়েছে। কারখানা কর্তৃপক্ষ, উপজেলা কৃষি অফিস ও প্রভাবশালীদের কাছে তারা অনেকবার বলেও কোনো প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পাঁচ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করে বিপাকে পড়া কৃষক আমান উল্লাহ আমান জানান, জিটিএ কারখানা কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বিষাক্ত কেমিক্যালমিশ্রিত পানি ছেড়ে দেওয়ায় তাদের শত শত বিঘা কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে। আট-দশ বছর আগেও বোরো মৌসুমে তারা বিঘাপ্রতি ৩০-৪০ মণ ধান পেতেন। কিন্তু কয়েক বছর ধরে বিঘাপ্রতি তারা মাত্র সাত-আট মণ ধান পাচ্ছেন। লোকসানের কারণে অনেকেই চাষাবাদ বাদ দিয়ে দিনমজুরের কাজ করছেন। কিন্তু তার মতো অনেকেই অন্য পেশায় দক্ষতা না থাকায় ক্ষতির মুখে বাধ্য হয়েই চাষাবাদ করছেন। এ বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ তার।

এলাকাবাসী আবদুল খালেক ও সুলতান মিয়া জানান, একসময় এই খালে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ এখানে মাছ ধরত। কিন্তু কারখানার বিষাক্ত কেমিক্যালমিশ্রিত পানির কারণে মাছ তো দূরের কথা, খালে এখন কোনো জলজ প্রাণীও চোখে পড়ে না।

তবে জিটিএ স্পোর্টস লিমিটেড কারখানার এইচআর ম্যানেজার মতিউর রহমান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তারা কারখানার কেমিক্যালমিশ্রিত বর্জ্য ইটিপির মাধ্যমে শোধন করেই নির্গত করছেন বলে দাবি করেন তিনি। যদিও কারখানার পেছনের অংশে বিরাট একটি পুকুরে জমিয়ে রাখা দুর্গন্ধযুক্ত কালো পানির ব্যাপারে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফি মোহাম্মদ তারেক বলেন, কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ফসলি জমি থেকে খাদ্যচক্রের বিষক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের সৃষ্টি করে। তাই সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, কেমিক্যালমিশ্রিত বর্জ্য ইটিপিতে শোধনের পরই যাতে শিল্প কারখানাগুলো তা পরিবেশে ছাড়ে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। এমনকি যেসব কারখানা তা অমান্য করে পরিবেশ দূষণ করবে, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে সাাভার উপজেলা কৃষি অফিসার নাজিয়াত আহমেদ শিমুলিয়া ইউনিয়নের ওই গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

অপরদিকে গার্মেন্ট কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে পরিবেশ অধিদপ্তরের বিধি অনুযায়ী এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও আশুলিয়া সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাজওয়ার আকরাম সাকাপি ইবনে সাজ্জাদ।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..